""

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার কারণ কী?


সচিব চাকমা
সিনিয়র সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)


সাম্প্রতিক সময়ে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি দাঙ্গার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পর্কে আলোচনা আবার সামনে চলে এসেছে। জাতীয় পরিসরে এই আলোচনা একটি সত্যকেই প্রতিফলিত করে। আর তা হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও পাহাড়ে অশান্তি বিরাজ করা। এই জ্বলজ্বল বাস্তবতা অনেক আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীদেরকেও এটা স্বীকার করতে বাধ্য করেছে যে, “শান্তিচুক্তিতে ক্রুটি থাকায় পাহাড়ে সমস্যা দূর হচ্ছে না।” অথচ এই বুদ্ধিজীবীরাই প্রথমদিকে চুক্তির উচ্চসিত প্রশংসা করেছিলেন।

অনেকে বলার চেষ্টা করেন যে, পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে শান্তি আসেনি। আসলে তারা বিষয়টিকে উল্টো করে দেখছেন। সত্য হলো, পার্বত্য চুক্তিতে অন্তর্নিহিত গলদ থাকার জন্য এই চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি এবং হচ্ছে না। চুক্তির দুর্বলতা তুলে ধরে ইউপিডিএফ-সহ অনেক মহলের পক্ষ থেকে সমালোচনা করা হলেও, কেউ চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দেয়নি। শুধু তাই নয়, ইউপিডিএফ চুক্তি বাস্তবায়নে চুক্তি স্বাক্ষরকারী উভয় পক্ষকে সহযোগিতা করার প্রস্তাবও দিয়েছিল। কিন্তু তা সত্বেও একদিকে সরকার যেমন চুক্তি বাস্তবায়নে কাজ করেনি, অন্যদিকে তেমনি জেএসএসও চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করেনি। এতে তারা উভয়ে লাভবান হয়েছে: আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন না করেও আন্দোলনের চাপ থেকে বেঁচে গেছে, আর জেএসএস নেতারা আঞ্চলিক পরিষদে তাদের গদি রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু জেএসএস নেতারা আঞ্চলিক পরিষদে বহাল তবিয়তে থাকেন। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে গণ আন্দোলনে গেলে জেএসএস নিশ্চিতভাবেই আঞ্চলিক পরিষদে তাদের পদ-পদবি ধরে রাখতে পারতেন না। তবে সেটা না গেলেও তা জনগণের জন্য লাভই হতো, কারণ আন্দোলনের চাপে সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হতো। তাই দেখা যায় চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন না হলে তাতে বরং সরকার ও জেএসএস নেতাদের উভয়ের হীন কায়েমী স্বার্থ রক্ষা হয়।

চুক্তিতে স্বাক্ষর করছেন আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ও সন্তু লারমা,  ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭। সংগৃহিত ছবি

পার্বত্য চুক্তি যে ব্যর্থ হয়েছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো মূলতঃ দুটি। এক, গত ২৭ বছরেও এই চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়া। দুই, চুক্তি-উত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিককালের দাঙ্গা। কিন্তু এই চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার কারণ কী?

পার্বত্য চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো এই যে, চুক্তির একটি পক্ষ আওয়ামী লীগ স উদ্দেশ্য নিয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। এর প্রমাণ খোদ পার্বত্য চুক্তিতে খুঁজে পাওয়া যাবে। জেএসএস সদস্যদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের তালিকা প্রদান ও অস্ত্র জমাদানের সুনির্দিষ্ট তারিখ বা সময় উল্লেখ করা হলেও, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। চুক্তিতে এটি একটি বড় ধরনের দুর্বলতা এবং এই দুর্বলতা বা গলদ হলো সরকারের স উদ্দেশ্য না থাকারই প্রতিফলন।

চুক্তির আরও একটি বড় দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায় ভূমি ও সেটলার সমস্যার ক্ষেত্রে। এই দুই সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে গণ্য করে তার রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা না করে তাকে আইনী কাঠোমোর মধ্যে ফেলে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলেই আজ ভূমি ও সেটলার সমস্যার সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না এবং ভূমিকে কেন্দ্র করে দাঙ্গাসহ বহুবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়ে চলেছে।

জেএসএস নেতাদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, সেটলারদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য সরকারের সাথে মৌখিক চুক্তি হয়েছে। কিন্তু সরকার পক্ষ তা অস্বীকার করে। চুক্তির পক্ষগুলোর মধ্যে স উদ্দেশ্য থাকলে অলিখিত চুক্তি হতো না। মূলতঃ চুক্তিটি পড়লে বোঝা যায় সেটলার পুনর্বাসনের বিষয়টি একটি স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে মনে করে তাকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ এটা জানা কথা যে, কোন সমস্যাকে, তা যতই স্পর্শকাতর হোক, তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কোন সমাধান নয়। বরং তাতে সমস্যা আরো বেড়ে যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি তার সেরা দৃষ্টান্ত। চুক্তির পক্ষগুলোর মধ্যে স উদ্দেশ্য থাকলে তারা ভূমি ও সেটলার ইস্যুগুলো পুরোপুরি এড্রেস করতেন।

চুক্তির আরও কয়েকটি ধারা উল্লেখ করে চুক্তির পক্ষগুলোর স উদ্দেশ্য না থাকার প্রমাণ দেয়া যেতে পারে। তবে লেখাটি দীর্ঘ না করে এবার অন্য দৃষ্টান্ত দিয়ে তা দেখানো যাক। চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি অস্ত্র সমর্পন অনুষ্ঠানে চুক্তি স্বাক্ষরকারী একটি পক্ষ সরকারের নেতারা বক্তব্য দিলেন, অথচ অন্য পক্ষ জনসংহতি সমিতিকে কোন বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি। এটা ছিল অত্যন্ত অপমানজনক, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

মিত্র দেশগুলোর সাথে জাপানের এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজ ইউএসএস মিসৌরীতে। উক্ত অনুষ্ঠানে মিত্র দেশগুলোর পক্ষ থেকে বক্তব্য দেয়া হলেও, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মামোরা সিগেমিতসুকে কোন বক্তব্য দিতে দেয়া হয়নি। তিনি নীরবে জাহাজে এসে চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করেন এবং নীরবে চলে যান। চুক্তি করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের স উদ্দেশ্য থাকলে অস্ত্র সমর্পন অনুষ্ঠানে জেএসএস নেতাকে তার বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া হতো এবং তাকে দিয়ে অমর্যাদাকরভাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে একে-৪৭ রাইফেল তুলে দিয়ে physical show of surrender করানো হতো না।

অথচ আমাদের পাশের দেশ ভারতে ২০১৫ সালের ৩ আগস্ট নাগা বিদ্রোহী দল এনএসসিএনের সাথে সে দেশের সরকারের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে থুইঙ্গালেং মুইভাকে বেশ মর্যাদা দেয়া হয় এবং তাকে তার বক্তব্য দিতে আহ্বান করা হয়। কাজেই দেখা যায় কোন চুক্তি সফল হওয়ার পেছনে চুক্তির পক্ষগুলোর intension একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচার্য বিষয়। গত ২৭ বছরে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের মোটেই honest intension ছিল না। সন্তু লারমা একবার যথার্থই বলেছেন, তাদের অস্ত্রগুলো কেড়ে নেয়ার জন্যই সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। তবে তিনি চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এটা বুঝতে পারলে ভালো করতেন। মোট কথা, যে চুক্তি স উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয় না, সেই চুক্তিতে দুর্বলতা ও গলদ থাকতে বাধ্য এবং সেই চুক্তি যে বাস্তবায়িত হবে না তা বলাই বাহুল্য।

পার্বত্য চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার কারণ শুধু যে চুক্তিতে ও চুক্তি-স্বাক্ষরকারী পক্ষগুলোর উদ্দেশ্যের মধ্যে নিহিত তাই নয়, এই চুক্তি সফল না হওয়ার জন্য তাদের ফ্যাসিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণও বিরাটভাবে দায়ি। কোন চুক্তি সবাই এক বাক্যে মেনে নেবে তা আশা করা যায় না। কোন কোন মহল থেকে তার সমালোচনা হতেই পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় দেখা যায়, চুক্তির পক্ষগুলো এই স্বাভাবিক বিষয়কে মেনে নিতে পারেনি এবং চুক্তির সমালোচকদের একটি অংশকে (অর্থা ইউপিডিএফ-কে) “চুক্তি বিরোধী” আখ্যায়িত করে তাদের ওপর অবর্ণনীয় দমনপীড়ন চালানো হতে থাকে, যা এখনও পর্যন্ত অব্যাহত আছে। অথচ তারা যদি গণতান্ত্রিক মানসিকতা দেখাতেন এবং চুক্তির সমলোচনাকে ইতিবাচকভাবে দেখতেন, তাহলে আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য রকম হতো। ভারতের মিজোরাম চুক্তি সফল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এমএনএফ) নেতাদের গণতান্ত্রিক মানসিকতা।

যাই হোক, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতায় ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি অনেকে পুনর্মূল্যায়ন করতে উদ্যোগী হবেন তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে স ও মহ উদ্দেশ্য নিয়ে চুক্তি করতে হবে। পার্বত্য-চুক্তি পরবর্তী ২৭ বছরের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস এই কথার যথার্থতাকে তুলে ধরে। এ কারণে আজ নতুন করে রাজনৈতিক সংলাপের দাবি ও নতুন একটি চুক্তির কথা জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। (সমাপ্ত)

* লেখাটি ইউপিডিএফের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে নেওয়া। 



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







Post a Comment