ঢাকা প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
রবিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬
খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে ভূমি বেদখলের উদ্দেশ্যে আব্দুল বাশির গং কর্তৃক বিমল
ত্রিপুরাকে হত্যা এবং বান্দরবানের আলীকদমে ম্রোদের ওপর হামলাকারী কুখ্যাত ডাকাত জাফর
আলম গংদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে ঢাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বৃহত্তর পার্বত্য
চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), ঢাকা মহানগর শাখা।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি ২০২৬) বিকাল ৪টায় এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে
এই বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে পিসিপি’র ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক বাহাদুর ত্রিপুরার সভাপতিত্বে
ও দপ্তর সম্পাদক অংচালা মারমার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সভাপতি
অমল ত্রিপুরা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সদস্য রূপসী চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের
সভাপতি জিকু ত্রিপুরা, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাকা নগর শাখার সভাপতি তৈয়ব আলী, গণতান্ত্রিক
ছাত্র কাউন্সিলের সংগঠক রাকিব মাহমুদ, বিপ্লবী যুব-আন্দোলনের সমন্বয়ক নাঈম উদ্দীন।
সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিল (বিএমএসসি)।
সমাবেশে অমল ত্রিপুরা বলেন, গনণঅভুত্থানের মাধ্যমে ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী
সরকার গঠিত হলেও এ সরকার পূর্ববর্তী শাসকদের নীতিতে শাসনকার্য পরিচালনা করছে। পার্বত্য
চট্টগ্রামে ফ্যাসিস্টদের দোসরদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, বরং তাদেরকে আরো সংগঠিত
করেছে। ফলে ইউনুস সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার এক মাসের মধ্যে পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক হামলা
ঘটেছে। আর সেই হামলায় খাগড়াছড়ি রাঙামাটিতে সেটলার হামলা ও সেনাবাহিনীর গুলিতে পাহাড়ি
জনগোষ্ঠীর মানুষ মারা গেছে। সেই সাম্প্রদায়িক হামলার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও
সেই তদন্ত কমিটি এখনো পর্যন্ত তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ করেনি।
তিনি আরো বলেন, সামনে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন হতে হচ্ছে। এই নির্বাচনের
আড়ালে পাহাড়ে কোন ঘটনা সংঘটিত করা হয় কিনা, সমতলে কোন মন্দির কিংবা গীর্জায় কোন হামলা
ঘটে কিনা সে নিয়ে আমাদের দুঃচিন্তায় থাকতে হয়। তিনি সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নির্বাচনের
আড়ালে যদি পাহাড়িদের ওপর সহিংতা করা হয়, জমি দখল করা হয় তাহলে পাহাড়-সমতলের আন্দোলনকারী
সংগঠনগুলো তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবে।
তিনি ইউনুস সরকারকে একজন ‘সেটলার বান্ধব’ আখ্যায়িত করে বলেন, গণঅভ্যুত্থানে
জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। কিন্তু ইউনুস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের
পর সেটলার বাঙালিরা পাহাড়িদের ওপর একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা-হত্যাকাণ্ড সংঘটিত
করতেও তার কোন বিচার করা হয়নি।
তিনি দাবি জানিয়ে বলেন, খাগড়াছড়িতে বিমল ত্রিপুরাকে হত্যা ও আলীকদমে ম্রোদের
ওপর হামলাকারী সকলকে অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
জিকো ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ে ভূমি বেদখল হওয়ার পিছনে সেনাবাহিনী সেটলারদের
ইন্ধন দিয়ে থাকে, যার কারণে সেটলার বাঙালিরা ভূমি বেদখল করতে সাহস পায়।
তিনি আরো বলেন, পাহাড়ে বিমল ত্রিপুরা মারা গেছে তাতে সরকারের কোন মাথাব্যাথা
হচ্ছে না। যদি বিমল ত্রিপুরার জায়গায় একজন সেটলার বাঙালি মারা যেত তাহলে এতক্ষণে
পাহাড়ে আগুন জ্বলত, পাহাড়িদের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হত, সরকারের বিভিন্ন বাহিনী
তৎপর হয়ে উঠতো। মারা যাওয়া ব্যক্তি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর হওয়ায় তার কোনো কিছুই
হচ্ছে না। কয়েকজনকে গ্রেফতার দেখানো হলেও দেখা যাবে কিছুদিনের মধ্যেই আসামিরা ছাড়া
পেয়ে যাবে।
রূপসী চাকমা বলেন, হত্যা-গুম-খুন ও ভূমি বেদখলের ঘটনাগুলো বেড়েই চলেছে।
গত ১৪ জানুয়ারি কমলছড়িতে যে ঘটনাটি ঘটেছে এটা কোন নতুন ঘটনা নয়, এর আগে আমরা অনেক
ঘটনা দেখেছি। পার্বত্য চট্টগ্রামে এ যাবত অনেক গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এর মাধ্যমে মপাহাড়ে
অনেক জমি দখল হয়ে গেছে। আমরা এখনো সেই একই কায়দায় ভূমি বেদখলের ঘটনা চলমান দেখেছি।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী জাতিসত্তাগুলো নিজস্ব
ভাষা, সংস্কৃতি, অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে যখন প্রতিবাদ করতে
নামে তখনই রাষ্ট্রীয় বাহিনী ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’সহ নানা তকমা লাগিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটনায়।
তিনি বিমল ত্রিপুরা হত্যাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান ভূমি বেদখল, সাম্প্রদায়িক
হামলা-হত্যা বন্ধ করার দাবি জানান।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের সমন্বয়ক নাঈম উদ্দীন বলেন, পাহাড়কে ঘিরে যে
ব্যবসায়িক মুনাফা চক্র তা আজকের নয়। সেটা ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে ৭১ পূর্ববর্তী
বা পরবর্তী সময়ে চলমান রয়েছে। এক সরকার গেছে, আরেক সরকার এসেছে, তারা পাহাড়ে শান্তি
ফিরিয়ে আনাসহ নানা কথা বলেছে, কিন্তু দিন শেষে এই শাসকশ্রেণিরা পাহাড়কে ঘিরে কেবলমাত্র
তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে পর্যটনের নামে পাহাড়িদের উচ্ছেদ, রাবার কোম্পানির নামে গ্রামকে
গ্রাম উজাড় করতে আমরা দেখেছি। লোগাং, নান্যাচর, লংগদুসহ বিভিন্ন স্থানে তারা গণহত্যা
চালিয়েছে। সেসব গণহত্যার এখনো কোন বিচার হয়নি। একটি জাতিসত্তাকে উচ্ছেদ করে সেখানে
পর্যটন করবেন, ব্যবসা করবেন তা হতে পারে না।
তিনি আরো বলেন, শেখ মুজিব থেকে শুরু করে জিয়া, এরশাদ, খালেদা. হাসিনা থেকে
শুরু করে বর্তমান অন্তর্বতীকালীন সরকারও দিনশেষে শাসকশ্রেণির খাও খাও নীতি। তারা দীর্ঘমেয়াদি
পরিকল্পনা করে পাহাড়ে সেটলার বাঙালি পুনর্বাসন করেছে।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনী যখন বাঙালিদের আক্রমণ করে তখন সেনাবাহিনী খারাপ,
আর সেনাবাহিনী যখন পাহাড়িদের ওপর আক্রমণ করে, সেনা ক্যাম্প বসায় তখন দেয়া যায় উগ্র
বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো বলে পাহাড়ে বেশি বেশি সেনা ক্যাম্প স্থাপন করো।
তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সকল জায়গায় উগ্রবাঙালি জাতীয়তাবাদী
চেতনা শেখানো হয়। এই উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মোকাবেলা করুন। কারণ এই উগ্র বাঙালি
জাতীয়বাদ নাৎসিবাদ কিংবা জায়নবাদ থেকে ব্যতিক্রম কোন জিনিস নয়।
তিনি দেশের বিদ্যমান যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা তার বিরুদ্ধে নিপীড়িত পাহাড়ি ও
নিপীড়িত বাঙালি জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সংগঠক রাকিব মাহমুদ বলেন, রাষ্ট্র খুব সচেতনভাবে
তার নাগরিকদের মধ্যে বিভিন্ন পক্ষ তৈরি করে রাখে। ফলে যখন বিমল ত্রিপুরা মারা যায়,
যখন কারখানার শ্রমিক মারা যায় কিংবা যখন কোন ধর্মীয় সংখ্যালঘুর মানুষ মারা যায় তখন
রাষ্ট্র চুপ থাকে।
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাকা নগর শাখার সভাপতি তৈয়ব আলী পার্বত্য চট্টগ্রামে
পাহাড়ি হত্যার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, পাহাড়ে সেটলার বাঙালি কর্তৃক পাহাড়িদের ওপর
হত্যাকাণ্ড নতুন কোন বিষয় না, দীর্ঘদিন ধরে এটা চলে আসছে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো
এখনো বহাল আছে বলেই আমরা প্রতিনিয়ত এই হত্যাকাণ্ডগুলো দেখছি।
তিনি আরো বলেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সামনে নির্বাচন হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানে
আমাদের প্রত্যাশা ছিল সকল শ্রেণির মানুষের মুক্তি, স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও গণতান্ত্রিক
অধিকারগুলো ভোগ করার সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু আমরা পাহাড়-সমতলে এর কোন পরিবর্তন দেখতে
পাই না।
তিনি বলেন, পাহাড় ও সমতলের সংকট অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পাহাড়ে সংকট তৈরি হলে
তা সমতলেও সংকট তৈরি করবে।
পাহাড়ে সেটলার বাঙালি কর্তৃক পাহাড়িদের ওপর হামলা, হত্যা, অগ্নিসংযোগের
ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেটলার কর্তৃক পাহাড়িদের ওপর বার বার হত্যাকাণ্ড কিংবা হামলা,
আগুনে পোড়ানোর ঘটনাগুলো ঘটছে, এমনকি সেখানে গণহত্যার মতোও ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। কিছুদিন
আগেও আমরা দেখেছি পাহাড়ে কী ভয়ঙ্কর নিপীড়ন চালিয়েছে সেটলার বাঙালিরা। আর সেই নিপীড়নকে
বৈধ করার জন্য “বিচ্ছিন্নতাবাদী’ সহ নানা বিষয় নিয়ে আসা হয়েছিল।
তিনি পাহাড়িদের ওপর নিপীড়নের জন্য ৭১’র পর থেকে গঠিত ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রীয়
কাঠামো ও উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দায়ি করেন এবং বলেন, পাহাড়ে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদকে
ব্যবহার করে সেটলার বাঙালিদের বসতিস্থাপন করা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়িদের
জমি দখল করা। তারই অংশ হিসেবে ১৪ জানুয়ারি আমবাগান দখল করতে গিয়ে আব্দুল বাশির গংরা
একজন পাহাড়ি শ্রমিককে হত্যা করেছে।
তিনি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পাহাড়ে উগ্র বাঙালি
জাতীয়তাবাদী ও ফ্যাসিস্ট নীতি বহাল রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি পাহাড় ও সমতলের নিপীড়িত জনগণের মুক্তির প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই
করার আহ্বান জানান।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বাহাদুর ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ে যখন সেটলাররা ছিল না তখন পাহাড়িরা শান্তিতে বসবাস করেছে। কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর সমতল থেকে লক্ষ লক্ষ সেটলার বাঙালিকে পাহাড়িদের জায়গায় পুর্নবাসন করার ফলে তারা প্রতিনিয়ত পাহাড়িদের জায়গা বেদখল করে আসছে। কিন্তু প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেয়নি। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে প্রশাসন সেটলারদের সহযোগিতা করে যাচ্ছে। তিনি প্রশাসনের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
তিনি আরো বলেন, পাহাড়ে সেটলার পুর্নবাসনকারী দল বিএনপি আর ওয়াদূদ ভূঁইয়া
একজন সাম্প্রদায়িক হামলার নেতৃত্ব প্রদানকারী। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি পাহাড়ের
একটি পক্ষ বিএনপিকে নির্বাচনে বিজয়ী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা ভুলে গেছে ওয়াদূদ
ভূঁইয়া খাগড়াছড়িতে এমপি থাকাকালীন মহালছড়িতে পাহাড়িদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা
হয়েছে।
তিনি বলেন, ভাইবোন ছড়ায় ত্রিপুরা মেয়ে ধর্ষণের কোন সুষ্ঠু বিচার পায়নি।
ধর্ষকরা এখন মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালায় মারমা কিশোরী ধর্ষণের
প্রতিবাদে ছাত্ররা যখন রাস্তায় নেমেছে তখন উল্টো পাহাড়িদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ত্যাগ
দিয়ে সেনাবাহিনী ও সেটলাররা মিলে গুইমারায় মারমাদের ওপর হামলা চালিয়ে তিনজন মারমা
যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে।
বাহাদূর ত্রিপুরা আরো বলেন পাহাড়ে যেসব ঘটনা গুলো ঘটছে তা কোন বিচ্ছিন্ন
ঘটনা নয়, তার একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। এর পিছনে সরকার সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের একটি
হাত রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে পাহাড়িদের নির্মূল করা।
তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে পাহাড়ি জনগণকে প্রকৃত বন্ধুকে চিনতে হবে। আগামী
১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের মাধ্যমে প্রকৃত শত্রুকে পরাজয় করতে হবে।
তিনি কমলছড়িতে বিমল ত্রিপুরাকে হত্যা ও বান্দরবানে ম্রোদের ওপর হামলাকারীদের
বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।




