সুনয়ন চাকমা, সাবেক সভাপতি, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ
এবারের নির্বাচনে জুম্ম রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও বাস্তবসম্মত
কৌশল ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি আসনেই সব দল মিলে কমন বা অভিন্ন প্রার্থী দেয়া। বস্তুতঃ দেশে-বিদেশে
জুম্মদের শুভাকাঙ্ক্ষী–সমর্থকরাও তাই চেয়েছিলেন। ইউপিডিএফ তাতে সম্মত হয়েছিল এবং সেজন্য
তারা কোন দলীয় প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড় করায়নি।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ইউপিডিএফ ও জেএসএস জোট বাঁধলে নির্বাচনে ভালো
ফল পাওয়া যায়। এটা খুবই স্বাভাবিক। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জেএসএস (সন্তু) প্রার্থী উষাতন
তালুকদার ইউপিডিএফের সমর্থন নিয়ে জয়যুক্ত হয়েছিলেন।
এবারের নির্বাচনে যদি তিন আসনে অভিন্ন প্রার্থী দাঁড় করানো যেতো, তাহলে
জেতার সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত প্রবল। অথচ সেটা না করে জেএসএস সন্তু গ্রুপ বিএনপিকে বিনা
শর্তে সমর্থন দিয়ে বসল। এর অর্থ হলো নিজের দলীয় শক্তিকে (জাতীয় শক্তির একাংশও বোঝায়)
এমন এক দলের কাছে বিকিয়ে দেয়া, যে দল পার্বত্য চট্টগ্রামকে (সন্তু গ্রুপের ভাষায়) মুসলমান
অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করতে চায়।
কোন বিবেচনায় সন্তু গ্রুপ বিএনপিকে বিনা শর্তে কিছু টাকার বিনিময়ে সমর্থন
দিল? তারা যদি জুম্ম জাতীয় স্বার্থকে বিবেচনা করত, তাহলে বিএনপিকে তারা এভাবে সমর্থন
দিত না। তারা বিবেচনা করেছে ব্যক্তিগত ক্ষমতার স্বার্থ ও আর্থিক লাভ। সেটা কী? তারা হিসেব করে দেখেছে,
এবং সাধারণভাবে সবার ধারণা, আগামী নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করবে। তাই
সন্তু গ্রুপ যদি বিএনপিকে তুষ্ট না করে তাহলে তারা আঞ্চলিক পরিষদের গদি হারাতে পারে।
সেই বিবেচনা থেকে তারা তিন জেলায় বিএনপির প্রার্থীকে নির্বাচনে সমর্থন দিচ্ছে। (খাগড়াছড়ির
আসনে সমীরণ দেওয়ানকে অবশ্যই বিএনপির প্রার্থী মনে করতে হবে। কারণ তিনি এখনও বিএনপিতে
আছেন, পদত্যাগ করেননি।)
সন্তু গ্রুপ যদি ব্যক্তিগত ক্ষমতার স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে জাতীয় বৃহত্তর
স্বার্থকে প্রাধান্য দিত, জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিত, তাহলে তিন আসনে ইউপিডিএফসহ
অন্যান্য জুম্ম দলগুলোর সাথে মিলে অভিন্ন প্রার্থী দাঁড় করাত। এতে অভিন্ন প্রার্থীরা
সহজেই জিততে পারত। এমনকি বান্দরবানে পাহাড়ি ভোটার কিছু কম হলেও সেখানেও সেটলার ভোটগুলো
নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি হলে অভিন্ন প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা ছিল। বিশেষ পরিস্থিতির
কারণে সেখানে সন্তু গ্রুপ তাদের দলীয় নেতাকে অভিন্ন প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানোর প্রস্তাব
করলে ইউপিডিএফ ও জেএসএস (এম. এন. লারমা) নিশ্চয়ই মেনে নিত। তাই বলা যায়, অভিন্ন প্রার্থী
দিয়ে তিনটি আসনে জেতার সুযোগ হাতছাড়া করলো সন্তু গ্রুপ।
এভাবে জেএসএস সন্তু গ্রুপ বার বার একই ভুল করে চলেছে। তারা ২০০১ সালের নির্বাচন
বর্জন ও প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে সেই নির্বাচনে তারা আওয়ামী লীগের পরাজয় আঁচ
করতে পেরে বিএনপির সাথে গোপনে আঁতাত করেছিল। সন্তু লারমা সে সময় বিএনপির সেক্রেটারী
জেনারেল মান্নান ভূঁইয়ার সাথে দেখা করে রাঙ্গামাটি আসনে বিএনপি প্রার্থী মনি স্বপন
দেওয়ানকে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং খাগড়াছড়িতে নির্বাচন বয়কটের নামে প্রসিত খীসাকে ঠেকিয়ে
পরোক্ষভাবে কাজ করে ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে জেতানোর অঙ্গীকার করেছিলেন।
বস্তুত: সন্তু গ্রুপ ১৯৯১ সাল থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কখনো আওয়ামী লীগ,
কখনো বিএনপির লেজ ধরে চলেছে। এভাবে জেএসএস সন্তু গ্রুপ জুম্মদেরকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে
যোগ দিতে প্রকারান্তরে উৎসাহিত করেছে। জেএসএস সন্তু গ্রুপের এটা একটা মস্ত বড় ভুল।
যে বাঁধ তারা খুলে দিয়েছে, সেটা এখন আর বন্ধ করা যাচ্ছে না। জুম্মরা সামান্য সুবিধার
জন্য আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং এমনকি জামায়াতে ইসলামী দলে যোগ দিচ্ছে।
সন্তু বাবুরা যদি ব্যক্তিগত সুবিধা ও ক্ষমতার জন্য আওয়ামী লীগ, বিএনপিকে সমর্থন দিতে
পারেন, তাহলে কিছু সুবিধার জন্য অন্যরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জামায়াতে যোগ দিলে বা
ভোট দিলে, তাতে সন্তু গ্রুপ তাদেরকে কোন যুক্তিতে ও কোন নৈতিক শক্তিতে বাধা দেবে?
সন্তু গ্রুপ আন্দোলনের নামে জুম্ম জাতির যে অনিষ্ট করে চলেছে তা ভাবলে অবাক
হতে হয়। কেউ কি নিজের কষ্টার্জিত ধান অন্যের গোলায় তুলে দেয়? সন্তু গ্রুপ তো সেটাই
করছে। নিজেদের ভোট, নিজেদের শক্তি বিনা শর্তে কখানো আওয়ামী লীগের, কখনো বিএনপির নির্বাচনী
গোলায় তুলে দিচ্ছে। আর এতে করে সন্তু গ্রুপের নেতারা সরকারের আনুকূল্যে সুস্বাদু খাবারে
উদর পূর্তি করলেও আমরা তথা সাধারণ জনগণ উপোষ করে মরে যাচ্ছে। তাই আমরা যদি উপোষে মরতে
না চাই, তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই সন্তু গ্রুপের নেতৃত্বকে পরিত্যাগ করতে হবে। তাদের কথায়
চলা বন্ধ করতে হবে। এছাড়া আমাদের বাঁচার আর কোন গতি নেই। সন্তু গ্রুপের স্বার্থ আর
জনগণের স্বার্থ এক নয়। তাই আগামী নির্বাচনে সন্তু গ্রুপের কথায় তাদের সমর্থিত প্রার্থীকে
অবশ্যই ভোট দেবেন না। জাতীয় স্বার্থকে সবার আগে স্থান দিন। জাতি বাঁচলে আপনি বাঁচবেন।
জাতীয় অস্তিত্ব না থাকলে, আপনারও কোন অস্তিত্ব থাকবে না।
২৬.০১.২০২৬
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
