২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক হামলা, খুন, গ্রেপ্তার, ধর্ষণ,
নির্যাতনসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিনিধি, সিএইচটি
নিউজ
সোমবার, ৫ জানুয়ারি ২০২৬
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর মানবাধিকার পরিবীক্ষণ
সেল ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ
করেছে।
আজ সোমবার (৫ জানুয়ারি ২০২৬) ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ থেকে সংবাদ
মাধ্যমে প্রদত্ত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়।
এতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উল্লেখ করে বলা
হয়, ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ওপর ৩টি সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে। সেনাবাহিনী,
জেএসএস (সন্তু), ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী ও অজ্ঞাত দুর্বৃত্তের হাতে বিচার বহির্ভুত হত্যার
শিকার হয়েছেন ১৩ জন, হত্যা চেষ্টার শিকার হয়েছেন নারী-শিশুসহ ৬ জন, শারীরিক নির্যাতনের
শিকার হয়েছেন ১১০ জন। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক-গ্রেপ্তার হয়েছেন ১০৪ জন, হয়রানিমূলক
তল্লাশির ঘটনা ঘটেছে ২৪৯টি বাড়িতে, ধর্মীয় পরিহানির ঘটনা ঘটেছে ৮টি; গণতান্ত্রিক অধিকার
হরণের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৬টি; জেএসএস সন্তু
গ্রুপ ও ঠ্যাঙাড়ে দুর্বৃত্তদের হাতে অপহরণের শিকার হয়েছেন ৭১ জন, সেটলার দ্বারা সহিংস
ঘটনা ঘটেছে ৭টি ও ভূমি বেদখল বা বেদখল চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে ৩টি। ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতার
শিকার হয়েছেন ২৩ জন নারী। কারাগারে মৃত্যু হয়েছে তিন জনের।
এছাড়া বছর জুড়ে বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে ইউপিডিএফকে টার্গেট করে অন্তত ৮৯টি সেনা অভিযান চালানো হয়েছে এবং অভিযানকালে ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানসহ শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি, ঘরবাড়িতে তল্লাশিকালে ঔষধ, নগদ অর্থ ও গৃহস্থালির সরঞ্জাম লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিপোর্টে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী ও কার্যকরভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধের
জন্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিতব্য আগামী সরকারের কাছে ৭ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়েছে।
সুপারিশগুলো হলো:
১) পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে
সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং এ লক্ষ্যে স্বায়ত্তশাসন বা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে এজেন্ডা
হিসেবে গ্রহণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম-ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু করা।
২) ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার ও ড. ইউনূসের
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলা, খুন ও ধর্ষণসহ সকল মানবাধিকার
লঙ্ঘনের ঘটনা জাতিসংঘের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং তার দেয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে
দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা।
৩) পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান সেনা অপারেশনের
নামে নিরীহ জনগণকে হয়রানি, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার-আটক ও তল্লাশির নামে লুটপাট বন্ধ
করা; অঘোষিত সেনাশাসন তুলে নিয়ে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা।
৪) সমতল জেলা থেকে নিয়ে আসা সেটলারদেরকে তাদের
আদি জেলায় ফিরিয়ে নিয়ে অথবা সমতলে কোন বিশেষ শিল্পাঞ্চলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
৫) সংবিধানে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীগুলোর আত্মপরিচয়
ও ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করা।
৬) ইউপিডিএফসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রিয়াশীল
রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দমনপীড়ন বন্ধ করা এবং তাদেরকে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থায়
কার্যক্রম পরিচালনার অধিকার প্রদান করা; এসব দলগুলোর বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মিথ্যা
মামলা ও হুলিয়া তুলে নেয়া।
৭) ধর্মীয় পরিহানি বন্ধ করা এবং পর্যটনের
নামে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অপবিত্রতা রোধ করা।
ইউপিডিএফের রিপোর্টের ভূমিকায় বলা হয়, “বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বকোণে এক
দশমাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামে পাঁচ দশকের অধিক সময় ধরে চলছে অলিখিত সামরিক
শাসন। সেনাবাহিনীই এখানে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং সবকিছুর ওপর রয়েছে তাদের একচ্ছত্র
নিয়ন্ত্রণ। দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জনগণের
ওপর রাষ্ট্রীয় দমন নীতির কোন পরিবর্তন হতে দেখা যায় না। গত বছর ৫ আগস্ট সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন
সরকার গঠিত হলে আশা করা হয়েছিল যে, পাহাড়ের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে কিছুটা হলেও ইতিবাচক
পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু জনগণের সেই আশা যে অপরিপক্ষ ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের পরবর্তী
ঘটনাবলী তা দেখিয়ে দিয়েছে।”
ড. ইউনূস সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ও পাহাড়ি
জনগণের মানবাধিকার ছিল না অভিযোগ করে রিপোর্টে বলা হয়, “তার সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের
সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার বিয়ষক হাইকমিশনকে
জড়িত করলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে সে ধরনের কোনকিছু করেননি। ফলে তার দায়িত্ব
নেয়ার পর দেড় মাস যেতে না যেতেই সেখানে পাহাড়িরা প্রথম বড় ধরনের সাম্প্রদয়িক হামলার
শিকার হয়। ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি সদর ও রাঙামাটি শহরে
সংঘটিত উক্ত হামলায় চার পাহাড়ি মারা যান, আরও বেশ কয়েকজন আহত হন এবং তাদের কয়েকশত ঘরবাড়ি
ও দোকানপাট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঘটনা তদন্তের জন্য সরকার কমিটি গঠন করলেও তার রিপোর্ট
আজও প্রকাশ করেনি এবং হামলার সাথে জড়িত কোন সেটলার ও সেনা সদস্যের বিচার হয়নি।”
রিপোর্টে বলা হয়, “কিছু মহলে লিবারেল বলে পরিচিত ইউনূস সরকার পূর্ববর্তী
সরকারসমূহের চালু করা বিচারহীনতার সংস্কৃতি অনুসরণ করছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার
পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং তা আরও খারাপ
হতে থাকে। যার একটি প্রমাণ হলো, এ বছর ২৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির গুইমারার রামেসু
বাজারে সেনাবাহিনী ও সেটলারদের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলা, যেখানে তিন পাহাড়ি যুবক প্রাণ
হারান, বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন এবং শতাধিক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে যায়। দেশের
মানবাধিকার কর্মীরা উক্ত হামলার জন্য স্পষ্টভাবে সেনাবাহিনীকে দায়ি করেছে। কিন্তু তারপরও
এর কোন বিচার হয়নি, এমনকি হামলাকারীরা ঘটনার সময় তোলা ভিডিওতে চিহ্নিত হলেও তাদের একজনকেও
গ্রেপ্তার করা হয়নি। বরং উক্ত হামলার দায় মিথ্যাভাবে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট
বা ইউপিডিএফের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান ও দমনপীড়ন শুরু
করে দেয়, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।”
নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের সমালোচনা করে উক্ত রিপোর্টে বলা হয়,
“বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষত ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রিত এলাকায়
সেনাবাহিনী ও বিজিবির (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) নিরবচ্ছিন্ন অভিযানের কারণে মানবাধিকার
পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। সেনা ও বিজিবি সদস্যরা কোন কোন জায়গায় অস্থায়ী ক্যাম্প
ও চেকপোস্ট নির্মাণ করেছে, টহল ও তল্লাশির নামে নিরীহ পাহাড়িদেরকে হয়রানি, নির্যাতন,
ভয়ভীতি প্রদর্শন, অহেতুক জিজ্ঞাসাবাদ, বিনা কারণে আটক ও অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী লুট
করছে। অপারেশনের সময় স্কুল ও বৌদ্ধ বিহার দখল এবং কৃষকের ধানের খেত নষ্ট করে দেয়ার
অভিযোগও রয়েছে।”
রিপোর্টে জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, “পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য প্রধানত নিরাপত্তাবাহিনী
ও বহিরাগত সেটলাররা দায়ি হলেও, জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা) ও সেনাবাহিনীর সৃষ্ট ও
মদদপুষ্ট ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীগুলোও এর সাথে জড়িত রয়েছে। যখন বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনী
পাহাড়ি জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগ্রামরত ইউপিডিএফকে
দমনের জন্য এইসব সংগঠনকে ব্যবহার করে, তখন তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি খাটো করে
দেখার কোন সুযোগ নেই।
“পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা) ও ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীগুলোর
বিরুদ্ধেও গত বছর খুন, অপহরণসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। জেএসএস ও
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঘোষিত লক্ষ্য একই: ইউপিডিএফকে নির্মূল করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের
জন্য তারা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করছে বলে অভিযোগ
রয়েছে। জেএসএস সদস্যদের দেয়া মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কয়েকজন নিরীহ পাহাড়ি সেনাবাহিনীর
নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে রিপোর্টে জানা গেছে। জেএসএসের সদস্যরা সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের
আশেপাশে অবস্থান করে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে থাকে। কাউখালিতে সাধারণ জনগণ এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের
কাছে স্মারকলিপি প্রদান ও সমাবেশ করলেও সরকার কিংবা নিরাপত্তা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে
কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে সেনা অপারেশনের সময় সামরিক পোষাক পরে
মুখ ঢাকা অবস্থায় প্রায়শঃ জেএসএস সন্তু গ্রুপ ও ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর সদস্যরা থাকে বলে
অভিযোগ পাওয়া যায়।”
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশাল সামরিক-আধাসামরিক বাহিনীর উপস্থিতি, বহিরাগত
সেটলারদের আগমন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পাহাড়ি-বিদ্বেষী বৈরী নীতি এই অঞ্চলে মানবাধিকার
লঙ্ঘনের ক্ষেত্রকে তৈরি করে মন্তব্য করে ইউপিডিএফ মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেলের রিপোর্টে
বলা হয়, “ন্যায্য অধিকারের দাবিতে গড়ে ওঠা পাহাড়ি জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনের
জন্য ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী গঠন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতিকে
আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। কাজেই যে সমস্ত বিষয় বা উপাদান মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য
দায়ি সেগুলো দূরীভূত না করে এই পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে না।”
পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধে ড. ইউনূস সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করে পরিবীক্ষণ সেল বলেছে, “জুম্ম জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও ড. ইউনূস সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে অঘোষিত সেনাশাসন তুলে নিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির কোন উদ্যোগ আজ পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যে নতুন সরকার গঠিত হবে তার নীতি ও পদক্ষেপের ওপর ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করছে। তবে যেহেতু অতীতে যেসব দল বাংলাদেশ শাসন করেছে, সেই দলগুলোই মূলতঃ সামনের নির্বাচনের পর সরকার গঠন করবে এবং যেহেতু তাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত নীতি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা করা যায়, তাই ড. ইউনূস-পরবর্তী নতুন সরকারের আমলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি আশা করা যায় না। এই অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধের জন্য দেশের গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল দল, সংগঠন, মানবতাবাদী, মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার সংগঠন, ব্যক্তি এবং জাতিসংঘসহ বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ বিশেষভাবে প্রয়োজন।”
রিপোর্টে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে
পার্বত্য চট্টগ্রামে যে রূপে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে সেগুলো হলো: সাম্প্রদায়িক
হামলা-অগ্নিসংযোগ, বিচার বহির্ভূত হত্যা, বিনা ওয়ারেন্টে আটক-গ্রেপ্তার, শারীরিক নির্যাতন,
বাড়িঘরে তল্লাশি, লুটপাট, হয়রানি, নারী নির্যাতন, ভূমি বেদখল, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ,
সেনা অভিযানের নামে আতঙ্ক সৃষ্টি ইত্যাদি।
সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “২০২৫ সালে পার্বত্য
চট্টগ্রামে সেনা-সেটলার কর্তৃক খাগড়াছড়ি সদর, গুইমারা ও বাঘাইছড়িতে পাহাড়িদের ওপর ৩টি
সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে। গুইমারা রামেসু বাজারে ২৮ সেপ্টেম্বর সংঘটিত হামলায়
সেনাবাহিনীর নির্বিচার গুলিতে আখ্র মারমা, আথুইপ্রু মারমা ও থৈইচিং মারমা নামে তিন
জন পাহাড়ি যুবক নিহত ও অর্ধ শতাধিক আহত হন। সেটলারদের দেয়া আগুনে পাহাড়িদের শতাধিক
ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে যায়। হামলাকারীরা সে সময় ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।
এই হামলার প্রতিবাদে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশে-বিদেশে বিক্ষোভ সংগঠিত হলেও ঘটনায় জড়িতদের
বিরুদ্ধে কোন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ঘটনা তদন্তে সরকার কমিটি গঠন করলেও তার রিপোর্ট
প্রকাশ করেনি।
“গুইমারা হামলার একদিন আগে খাগড়াছড়ি শহরেও উগ্র সেটলাররা সেনাবাহিনীর সদস্যদের
উপস্থিতিতে ও প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারা জারি থাকার সময় পাহাড়িদের ওপর হামলা চালায়।
এতে বেশ কয়েকজন পাহাড়ি গুরুতর আহত হয় এবং পাহাড়িদের বাড়িঘর ও দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়।
২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালায় এক মারমা কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে গড়ে
ওঠা আন্দোলনের সময় খাগড়াছড়ি ও গুইমারা হামলা দু’টি সংঘটিত হয়েছিল।”
নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরে রিপোর্টে
বলা হয়েছে, “বরাবরের মতো ২০২৫ সালেও যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে তার সিংহভাগের
দায় হলো নিরাপত্তা বাহিনীর। তাদের হাতে বিচার বহির্ভুত হত্যার শিকার হয়েছেন ৫ জন। খাগড়াছড়ি,
রাঙামাটি ও বান্দরবানে এই হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়। বন্দুক হামলা ও গাড়ি চাপায় জখম
বা হত্যা চেষ্টার শিকার হয়েছেন ৩ ব্যক্তি; নির্বিচার আটক ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন
ইউপিডিএফ সদস্যসহ অন্তত ১০৪ জন। এদের মধ্যে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ও হয়রানি শেষে
৬৪ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়, ২ জন জামিনে (শর্ত সাপেক্ষে) মুক্তি পান, বাকীদের মিথ্যা মামলা
দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
“নিরাপত্তাবাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের অধিকাংশই
নিরীহ জনসাধারণ; শারীরিক নির্যাতন ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন অন্তত ৮০ জন, যাদের মধ্যে
নারী, কিশোরও রয়েছেন; তল্লাশির ঘটনা ঘটেছে ৭৮টি স্থানে অন্তত ২৪৯টির অধিক বাড়িঘর ও
দোকানে। তল্লাশিকালে সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে নগদ অর্থসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র লুট করে
নেয়ার অভিযোগ রয়েছে; ধর্মীয় পরিহানির ঘটনা ঘটেছে ৮টি স্থানে, হয়রানিমূলক ঘটনা ঘটছে
৬টি এবং গণতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ৪টি, যার মধ্যে খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়ায়
৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশে সেনা হামলা, লাঠিচার্জসহ
শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা রয়েছে।
“এছাড়া দুটি স্থানে ‘অস্ত্র উদ্ধার’ নাটক, রাঙামটির সাজেকে বাড়ি ও শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান নির্মাণে বাধা-ভাঙচুর এবং বছর জুড়ে অন্তত ৮৯টি স্থানে বিশেষত ইউপিডিএফের
সাংগঠনিক এলাকায় সেনা অভিযান-তৎপরতা চালিয়ে জনমনে ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে। এ সময় বৌদ্ধ
বিহার এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ী ক্যাম্প বানিয়ে সেনা সদস্যদের অবস্থানের
ফলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার
চেঙ্গী ইউনিয়নের জগপাড়ার পাশে সমিতি আমবাগানে ও লোগাং ইউনিয়নের চাম্মে আদাম এলাকায়
এখনো দু’টি অস্থায়ী ক্যাম্পে সেনাবাহিনী অবস্থান করে এলাকায় অভিযানের নামে জুলুম-নিপীড়ন
চালিয়ে যাচ্ছে।”
রিপোর্টে হেফাজতী মৃত্য ও অবৈধ কারাদণ্ডাদেশ বিষয়ে বলা হয়েছে, “২০২৫ সালে
চট্টগ্রাম কারাগারে বম জাতিসত্তার তিন কারাবন্দির মৃত্যু হয়েছে। নির্যাতন, সুচিকিৎসার
অভাব ও কারা কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে তাদের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একে কাঠামোগত
হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করেছেন মানবাধিকর কর্মি ও সংগঠনগুলো।”
অপরদিকে, ক্যাঙ্গারু কোর্টের মাধ্যমে ইউপিডিএফের অন্যতম সংগঠক মাইকেল চাকমাকে
মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় তার অনুপস্থিতিতে ও সাক্ষ্যগ্রহণ ছাড়া প্রহসনমূলক বিচারে ৮
বছরের কারাদণ্ডাদেশ প্রদান করা হয়েছে। মাইকেল চাকমা হাসিনার শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রামে
মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের
৬ আগস্ট পর্যন্ত ‘আয়নাঘর’ খ্যাত রাষ্ট্রীয় গোপন বন্দিশালায় আটক ছিলেন। ২৪’র জুলাই গণঅভ্যুত্থানে
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৭ আগস্ট ২০২৪ তিনি মুক্তি পান।”
বনবিভাগ কর্তৃক সংঘটিত ঘটনাও তুলে ধরা হয় রিপোর্টে। এতে বল হয়, “গত বছর
সরকারের বনবিভাগ কর্তৃক ২টি স্থানে পাহাড়িদের জায়গা বেদখল করে বাগান সৃজনের চেষ্টা
করা হয়। এর মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার নয়াপড়া ইউনিয়নের কইয়া ঝিড়ির
মেনথক ও কাইংওয়াই ম্রো পাড়ায়। সেখানে বনবিভাগের লোকজন ম্রো জুমচাষী ও বাগানচাষীদের
সৃজিত ১,২০০ কলাগাছ এবং ৩০০টির মতো উচ্চফলনশীল পেঁপে গাছ কেটে দেয় ও জুমের ধান নষ্ট
করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অপর ঘটনাটি ঘটে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার খেদারমারা ইউনিয়নের
দক্ষিণ পাবলাখালী গ্রামে। সেখানে বনবিভাগের লোকজন পাহাড়িদের ভোগদখলীয় জায়গায় গাছের
চারা রোপনের মাধ্যমে জমি বেদখল করতে গেলে স্থানীয়রা তাদের বাধা দেয় ও প্রতিবাদ জানায়।
তারা বনবিভাগের এই চারা রোপনকে পাহাড়িদের জায়গা বেদখল ও তাদেরকে উচ্ছেদ করার পাঁয়তারা
বলে অভিযোগ করেন।”
সেটলার বাঙালিদের দ্বারা সংঘটিত সহিংস ঘটনা বিষয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে,
“পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটলার বাঙালিরা প্রায়শ সহিংস উপায়ে পাহাড়িদের ভূমি বেদখল করে
থাকে। এক্ষেত্রে তারা সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা লাভ করে। ফলে তারা নির্বিঘ্নে
এ ধরনের ঘটনা সংঘটিত করতে সাহস পায়। ২০২৫ সালে ৩টি স্থানে ভুমি বেদখল বা বেদখল চেষ্টার
তথ্য পাওয়া যায়।
“এছাড়া সেটলারদের বিরুদ্ধে পাহাড়িদের বাড়িতে হামলা-অগ্নিসংযোগ,অপহরণ, মারধর,
হয়রানিসহ আরো অন্তত ৮টি সহিংস ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি
২০২৫ রামগড়ে মধ্য রাতে ললিত চাকমা নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে হামলা ও আগুন লাগিয়ে দিয়ে
পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা, ১৭ ফেব্রুয়ারি নান্যাচরের বগাছড়িতে এক ব্যক্তির বাড়িতে অগ্নিসংযোগ,
১২ মে রাঙামাটি শহরে প্রান্তর চাকমা নামে এক পাহাড়ি যুবকের ওপর হামলা, ১২ জুন রাঙামাটির
কাউখালীতে কল্পনা অপহরণ দিবসের সমাবেশে ঢাকা থেকে অংশগ্রহণকারী তিন অতিথি বক্তা অলিউর
সান, নূজিয়া হাসিন রাশা ও মার্জিয়া প্রভা’র ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।”
জেএসএস (সন্তু)-এর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “সন্তু
লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) বা সংক্ষেপে জেএসএসের
বিরুদ্ধেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। জেএসএস আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতায় থাকা সত্বেও
সশস্ত্র দল পরিচালনা করে, যা ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির সাথে এক সাক্ষাতকারে স্বয়ং দলটির
প্রধান সন্তু লারমা স্বীকার করেছেন। জেএসএস পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি জানালেও
সেই দাবি আদায়ে আন্দোলন না করে বরং ঘোষণা দিয়ে জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলনরত
ইউপিডিএফকে নির্মূলের কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। ফলে এই দলটির দ্বারা অনিবার্যভাবে
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে।”
রিপোর্টে ২০২৫ সালে সন্তু লারমার জেএসএসের বিরুদ্ধে এক নারীসহ ৫ ব্যক্তিকে
হত্যা, নারী-শিশুসহ ৩ জনকে জখম, ৩০ জনকে অপহরণ, ২৭ জনকে শারীরিক নির্যাতন ও ২ বৌদ্ধ
ভিক্ষুকে হেনস্তার অভিযোগ করা হয়েছে। অপহৃতদের মধ্যে রাঙামাটি শহর থেকে অপহরণের পর
নিখোঁজ হওয়া কলেজ ছাত্র আলোড়ন চাকমাসহ ৪ জনের খোঁজ এখনো মেলেনি।
এছাড়া সন্তু গ্রুপের সদস্যরা ৩৩ জনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনতাই, সেনাবাহিনীর সহযোগীতায় খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও রাঙামাটির ঘাগড়া, বাঘাইছড়ি, বন্দুকভাঙাসহ বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে জনমনে ভীতি সঞ্চার এবং সাজেকের উদয়পুর বাজার থেকে বাঘাইহাট ও মাজলং এলাকার জুম্ম দোকানদারদের উচ্ছেদ এবং এলাকার জনগণকে উক্ত বাজারে যেতে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছে বলেও রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে চলমান সেনা অভিযানে সন্তু গ্রুপ সেনাবাহিনীকে তথ্য সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করছে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
রিপোর্টে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের
তথ্যও তুলে ধরে বলা হয়, “পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মদতপুষ্ট ‘নব্যমুখোশ’সহ
বিভিন্ন ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। তারা খুন, অপহরণ, হামলা, চাঁদাবাজি
ও সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে ভীতি সঞ্চারসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত করে থাকে।
“২০২৫ সালে এসব ঠাঙাড়ে বাহিনীর হাতে ১ ব্যক্তি খুন, ৪১ জন অপহরণ ও ১ জন
মারধরের শিকার হয়েছেন। তারা দুইবার শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা ও বাধা প্রদান করে। প্রথমবার
৫ আগস্ট ২০২৫ খাগড়াছড়ি সদরের চেঙ্গী স্কোয়ারে ইউপিডিএফের আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে অংশগ্রহণকারী
জনতার ওপর ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র হামলা চালায়। এতে পূর্ণমুখী চাকমা (৫৩) নামে
এক নারী গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।
এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-ছিনতাইয়ের ৪টি ঘটনায় ও ৫টি সশস্ত্র তৎপরতার
ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মানিকছড়ি-গুইমারা উপজেলা সীমান্তবর্তী তবলা পাড়ায় ৬
জন সশস্ত্র ঠ্যাঙাড়ে স্থানীয় ইউপিডিএফ নেতাদের ওপর হামলা করতে গেলে জনগণ প্রতিরোধ গড়ে
তোলে এবং তাদেরকে অস্ত্রসহ আটক করে। এ খবর জানতে পেরে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত
হয় এবং জনগণের কাছ থেকে তাদেরকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ জনতা এ সময় তীব্র প্রতিরোধ
গড়ে তুললে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ ও ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে
সন্ত্রাসীদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়। উক্ত ঠ্যাঙাড়েদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে ব্যাপক
বিক্ষোভ হলেও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।”
অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত কর্তৃক সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরে উক্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, “২০২৫ সালে অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত কর্তৃক এক নারীসহ দুই ব্যক্তি নিহত হন। দু’টি ঘটনাই ঘটেছে বান্দরবান জেলায়। কী কারণে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তা জানা যায়নি, তবে এ ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে।”
নারীর ওপর সহিংস ঘটনাও গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়েছে রিপোর্টে। এতে বলা
হয়, “আলোচ্য বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে কমপক্ষে ২৩ জন নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন। এর
মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১ জনকে, ধর্ষণ চেষ্টার
শিকার হয়েছেন ৫ জন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১০ জন। এসব ঘটনার মধ্যে দুটিতে সেনা
সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
“ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাটি ঘটে ৫ মে বান্দরবানের থানচিতে। চিংমা খেয়াং নামে
ওই নারীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হলেও অপরাধীদের
গ্রেপ্তার করা হয়নি। এছাড়া ২৭ জুন খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়ায় ৮ম শ্রেণির এক ত্রিপুরা কিশোরী
সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হলেও ঘটনাটি সে সময় প্রকাশ পায়নি। মানসিক বিষন্নতায় ভুগে কয়েকদিন
পর বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেই কেবল তার ধর্ষণের ঘটনাটি জানাজানি হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর
খাগড়াছড়ি সদরের সিঙ্গিনালায় ৮ম শ্রেণিতে পড়ুয়া মারমা কিশোরী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার
হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ দেখা দেয় এবং সেটা দমনের জন্য সেনাবাহিনী
ও সেটলাররা খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলা চালায়।”
প্রকাশিত রিপোর্টে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সংঘটিত একটি ঘটনার তথ্য তুলে
ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, “২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে রাজধানী ঢাকায় ‘স্টুডেন্টস
ফর সভারেন্টি’ নামে একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি কর্তৃক পাহাড়ি শিক্ষার্থীসহ সমতলের
জাতিসত্তার জনগণের ওপর একটি হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৫ জনের অধিক আহত হন। পার্বত্য
চট্টগ্রামের সেটলারদের অনেকে ওই হামলায় জড়িত ছিলেন। পুলিশ হামলায় জড়িত কয়েকজনকে গ্রেফতার
করলেও পরে তারা সবাই জামিনে মুক্তি পান বলে জানা যায়।”
* পুরো রিপোর্টটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
