""

রাবিতে পিসিপি’র বৈ-সা-বি পরবর্তী পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত

ঐতিহ্যকে ধারণ করেই পাহাড়ের জাতিগত সংস্কৃতিকে বিকশিত করতে হবে : সোহেল চাকমা


রাবি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) “বৈ-সা-বি” পরবর্তী পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), রাবি শাখা। এতে সাংবাদিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

“ঐক্য-ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার হোক সম্মিলিত চেতনায়” এই স্লোগানে শনিবার (২৫ এপ্রিল ২০২৬) রাবি’র ‘বধ্যভূমিতে’ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সোহেল চাকমা। তিনি ঐতিহ্যকে ধারণ করে পাহাড়ের জাতিগত সংস্কৃতিকে বিকশিত করার আহ্বান জানান। 

পিসিপি রাবি শাখার সভাপতি উজানী চাকমা'র সভাপতিত্বে ও সাংগঠনিক সম্পাদক মিশুক চাকমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর রাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক খন্দকার শাহরিয়ার আলিফ ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সদস্য শ্রেয়সী রায় উদীপ্তি। এছাড়া সংহতি জানিয়ে এতে উপস্থিত ছিলেন পিসিপি'র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ক্যাচিংহ্লা মার্মা ও মহামনি চাকমা।

অনুষ্ঠানে ছাত্রনেতা সোহেল চাকমা বলেন, তৎকালীন এরশাদ সরকারের সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভয়াবহ অরাজক পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল। পাহাড়ি জনগণের ওপর কঠোর নজরদারী ও নিষ্ঠুর দমন-পীড়নে পাহাড় ছিল উত্তপ্ত। চারিদিক ধরপাকড় ও অরাজক পরিস্থিতিতে পাহাড়ি জনগণ ঐক্যবদ্ধ হতে পারছিলো না। ঠিক তখনই ১৯৮৪ সালে ছাত্র সমাজ ‘বৈ-সা-বি'র ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে তুলেছিল।

বিশেষ করে ১৯৯২ সালে ১০ এপ্রিল লোগাঙ গণহত্যার ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে খাগড়াছড়ির সর্বস্তরের জনগণ বিঝুর দিনে পাহাড়ে রান্না করা ঐতিহ্যবাহী ‘পাজন’ চেঙ্গী নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে প্রতিবাদ জানায় ও রাজপথে নেমে আসে। তখন থেকে ‘বৈসাবি’ শব্দটি পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহের ঐক্যবদ্ধ চেতনার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, বৈ-সা-বি পাহাড়িদের স্বতন্ত্র কোন নাম নয়, এটি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ চেতনা থেকে জন্ম নেয়া শব্দ, যা পাহাড়িদের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও জাতীয় মুক্তির আন্দোলন জোরদারের ইঙ্গিত দেয়। সুতরাং, ‘বৈসাবি’ শুধুমাত্র উৎসব নয়, এটি জাতিগত ঐক্যের চেতনার জন্ম দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের মননশীলতার সুন্দরতম বহিঃপ্রকাশ। এই মননশীলতা তৈরী হয় মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তির যৌথ সম্মিলনে। আমরা শুধুমাত্র নাচ-গান, পোশাক পরিচ্ছদের মাধ্যমে সংস্কৃতিকে রুপায়িত করার চেষ্টা করি না। মানুষের সংস্কৃতির একটা উন্নত রুপ হচ্ছে তার চিন্তার মধ্যে থাকে। উন্নত সংস্কৃতি তখনই প্রতিফলিত হয় যখন সমাজে কিংবা জাতিতে উন্নত কর্ম একটা মানুষের মধ্যে থাকে। চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং সংস্কৃতিগত পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল বলে বর্তমান বিশ্বে চীনারা উন্নত জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সেজন্য আমাদেরকেও সমাজ ও জাতির প্রয়োজনেই সংস্কৃতিকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে অনুশীলন করতে হবে। সংস্কৃতি শুধুমাত্র উদযাপন কিংবা উপভোগের বিষয় নয়, এটি উন্নত রুচিবোধের পরিচায়ক এবং মনস্তাত্বিক পরিবর্তন ও বহিঃপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। সেজন্য ঐতিহ্যকে ধারণ করে জাতিগত সংস্কৃতিকে বিকশিত করতে হবে।

পাহাড়িদের ওপর রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বৈষম্য ও শোষণহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। কিন্তু বৈষম্য দূর হয়নি, শোষণ-বঞ্চনা শেষ হয়ে যায়নি। সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও জাতিগত বৈষম্য ও শিক্ষকদের সংকীর্ণ মনোভাব এবং পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের সাথে দ্বৈত আচরণ আমরা দেখতে পাই। যার অন্যতম দৃষ্টান্ত হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্মারকলিপি, আবেদনপত্র দেয়া হলেও পাহাড়িদের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈ-সা-বি'তে পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের জন্য ছুটি বরাদ্দ না রাখা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও রাষ্ট্রীয়ভাবে পাহাড়িদের উৎসবে কোন ছুটি ঘোষণা করা হয়নি। এখন বিএনপি সরকারও পাহাড়িদের প্রতি ন্যূনতম দায়িবদ্ধতা দেখাতে পারেনি। বৈ-সা-বি উৎসব উদযাপনে জাতীয়ভাবে ছুটি ঘোষণা না করে স্পষ্টই বৈষম্য এবং সংকীর্ণতা।বাংলাদেশকে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে জাতিগত নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে এবং সকল প্রকার বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে পাহাড়-সমতলে ঐক্যবদ্ধ লড়াই জোরদার করতে হবে।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনাকালে মিশুক চাকমা ‘বৈ-সা-বি’ শব্দের প্রেক্ষাপট ও উৎপত্তি নিয়ে তুলে ধরে বলেন, ‘জুম্ম শব্দটি যেমন আমাদের কালেকটিভিজমকে নির্দেশ করে তেমনি “বৈসাবি” শব্দটিও আমাদের কালেক্টিভিজমের নির্দেশক। জাতিগতভাবে স্ব স্ব জাতিতাত্ত্বিক পরিচয় থাকার পরও আমরা জুম্ম পরিচয়কে ব্যবহার করি  আমাদের ঐক্য ও সংহতির জন্য। তাহলে আমাদের প্রধান উৎসবে ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজম এনে সেই ঐক্য-সংহতিতে কেন প্রভাব ফেলব’।

অনুষ্ঠানে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাংগঠনিক সম্পাদক শাহরিয়ার আলিফ তার বক্তব্যে বলেন, ‘বৈসাবি উৎসবে আদিবাসীদের কোন ছুটি থাকে না। এইবছর মানববন্ধন করে উপাচার্য বরবার স্মারকলিপি দিলেও কর্ণপাত করা হয়নি। আগের বছরও পিসিপির পক্ষ থেকে গণস্বাক্ষরসহ বন্ধের জন্য স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছিলো কিন্তু প্রশাসন আদৌ এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয় কিনা জানা নেই’।

তিনি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে শিকার জুম্মদের পাশে থাকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সদস্য শ্রেয়সী রায় উদীপ্তি বলেন, বাঙালিরা আদিবাসীদের উপর জুলুম করছে এবং তাদেরকে পাহাড় থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করছে। তাই সবাইকে মিলেমিশে এসব প্রতিহত করার আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে উজানী চাকমা উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানান। তিনি জুম্ম শিক্ষার্থীদের সমতলের যেকোন ন্যায্য দাবিতে সহযোগিতা ও পিসিপি’র অংশগ্রহণের আশ্বাস দিয়ে আগামীতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। 

এছাড়া অনুষ্ঠানে আরও সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক সংগঠন লোকায়ন এর সাধারণ সম্পাদক মহুয়া জেবা মল্লিকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবারের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল ত্রিপুরা।

আলোচনা সভায় থাকতে না পরলেও শেষের দিকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মো. আমিরুল ইসলাম কনক।



আলোচনা শেষে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থী ও অতিথিদের পরিবেশন করা হয় ঐতিহ্যবাহী পাজন। এছাড়াও বিনি চালের পায়েস, তরমুজ ও শরবত ইত্যাদি পরিবেশন করে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়।

অনুষ্ঠানে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং রাবি জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবার ও সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments