""

চবিতে শহীদ মিটন স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট-এর ফাইনাল ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সম্পন্ন


 

চবি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে(চবি) আয়োজিত ‘শহীদ মিটন স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬’-এর ফাইনাল খেলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ শনিবার (২৭ জুন ২০২৬) বিকেল ৪টায় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সোহেল চাকমা, সহ-সাধারণ সম্পাদক নিউটন চাকমা, সাংগঠনিক সম্পাদক রোনাল চাকমা। এছাড়াও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেম ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরাম চট্টগ্রাম মহানগর শাখার প্রতিনিধি দীপেন বিকাশ ত্রিপুরা, বম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি লালত্লান সাং বম, বাংলাদেশ চাক স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মংকিউ চাক, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি জশদ জাকির, অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হলের ভিপি রিপুল চাকমা প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন পিসিপি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ভুবন চাকমা।

টুর্নামেন্ট আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক সুদর্শন চাকমার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন পিসিপি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দপ্তর সম্পাদক ক্যাচিংহ্লা মারমা। এতে অন্যান্যের মধ্যে আরো বক্তব্য দেন ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরামের প্রতিনিধি দীপেন বিকাশ ত্রিপুরা, বম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহ- সভাপতি লালত্লান সাং বম, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি জশদ জাকির, অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হল সংসদের ভিপি রিপুল চাকমা, পিসিপি'র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রোনাল চাকমা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী।


প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন,  বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখি। পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা যেমন শিক্ষায়, তেমনি খেলাধুলাতেও কৃতিত্বের পরিচয় দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এ টুর্নামেন্টের খেলোয়াড়রা বিশ্ববিদ্যালয়, দেশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিনিধিত্ব করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি টুর্নামেন্টের শৃঙ্খলা ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের সুন্দর আয়োজনে পাশে থাকার প্রত্যাশা করেন। তিনি বিজয়ী ও রানার্স-আপ উভয় দলকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।

স্বাগত বক্তব্যে ক্যাচিংহ্লা মারমা বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জাতিসত্তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করতেই এ টুর্নামেন্টের আয়োজন। এই আয়োজনে তিনি রানার্স-আপ দল হিল অ্যাটাকার (২৫-২৬)-এর প্রশংসা করে বলেন, নবীনরা দারুণ খেলেছে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো করবে। হিল গ্ল্যাডিয়েটরসকেও চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় অভিনন্দন। ভবিষ্যতেও আশা করি এই টুর্নামেন্টের ধারাবাহিক আয়োজন হবে।

টিএসএফ প্রতিনিধি দীপেন বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে সুন্দর একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানাই। এ ধরনের আয়োজন পারস্পরিক পরিচয় ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করবে এবং আমাদের ঐক্য-সংহতি বজায় রাখতে সহায়ক হবে।

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর আহ্বায়ক জশদ জাকির বলেন, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয় এটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদের ভাষাও বটে। লাতিন আমেরিকার ফুটবল সংস্কৃতিতে এর প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেন, কোন কার্ড ছাড়াই চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স-আপ—উভয় দলই অত্যন্ত ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশে খেলেছে, যা প্রশংসার দাবিদার। পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় অংশগ্রহণ এবং শহীদ মিটন চাকমার আদর্শ ধারণের আহ্বান জানান।

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হলের ভিপি রিপুল চাকমা বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যে মূল্যবোধ ও চিন্তা ধারণ করি, ভবিষ্যতে পাহাড়েও তার প্রতিফলন ঘটবে। তাই নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ নয়, বরং ঐক্য বজায় রেখে দেশ ও পাহাড়ের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, শহীদ মিটন চাকমার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা না হলেও ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিবাদী ছাত্রনেতা। পাহাড়ের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁর আত্মত্যাগ বর্তমান প্রজন্মকে স্মরণ রাখতে হবে।

বম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি লালত্লান সাং বম বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা অত্যন্ত প্রয়োজন। খেলাধুলা মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। পাহাড় ও সমতলের শত শত শিক্ষার্থীর মধ্যে মেলবন্ধন গড়ে তুলতে এ টুর্নামেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ছাত্রনেতা রোনাল চাকমা বলেন, শহীদ মিটন চাকমা ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী, বিনয়ী, সৎ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও আমাদের সহযোদ্ধা। তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থ ও আরাম-আয়েশের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বে নিপীড়িত-বঞ্চিত জুম্ম জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা, সততা, সাহসিকতা এবং সংগ্রামী চেতনা আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান জুম্ম প্রজন্মের দায়িত্ব শহীদ মিটন চাকমার আত্মত্যাগকে শুধু স্মরণ করা নয়, তাঁর আদর্শ, নৈতিকতা, সততা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাকে নিজেদের জীবনচর্চায় ধারণ করা। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংগঠন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলে জাতির কল্যাণে ভূমিকা রাখা।

শহীদ মিটন চাকমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় উপায় হলো শিক্ষিত, সচেতন ও সংগঠিত একটি দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, ফুটবল নিছক কোনো খেলা নয়। পাহাড়ের দুর্গম জনপদের এক কিশোরী রিতুপর্ণা চাকমা যে দেশকে চ্যাম্পিয়ন করবেন এবং দেশের জন্য সম্মান ও মর্যাদা বয়ে আনবেন সেটা কেউ ভাবেনি। রুপনা চাকমা যে দেশের হয়ে গোলরক্ষক হবেন এবং আত্ন পরিচয় তুলে ধরবেন সেটাও আমরা ভাবিনি। ফুটবল শেখায় পর্যাপ্ত সুযোগ- সুবিধার অভাবের মাঝেও স্বপ্ন দেখার সাহস করতে হয়। স্বপ্ন দেখলে বিজয়ী হওয়া যায়। আমাদেরও বিজয় অর্জনের জন্য সাহসী হতে হবে।

তিনি আজ থেকে ৩০ বছর আগে অপহৃত কল্পনা চাকমা'কে উদ্ধারের দাবিতে আন্দোলনে আত্মাহুতি দেয়া বীর শহীদ রূপন এবং গুমের শিকার হওয়া সমর-সুকেশ-মনোতোষদের স্মরণ করেন এবং অপহরণ, খুন ও গুমের ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচারের দাবি করেন।

সভাপতির বক্তব্যে ভূবন চাকমা বলেন, শহীদ মিটন চাকমা আমাদের গর্ব। তিনি ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার পথ বেছে না নিয়ে নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছেন। তাঁর আদর্শ ধারণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃতিত্ব অর্জনকারী পাহাড়ি ক্রীড়াবিদদের উদাহরণ তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও নেতৃত্বে আরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

শহীদ মিটন চাকমা স্মৃতি টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচে হিল অ্যাটাকার (২৫-২৬) ও হিল গ্ল্যাডিয়েটর (২২-২৩) মুখোমুখি হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ ম্যাচে হিল গ্ল্যাডিয়েটর ২-০ গোলে জয়ী হয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। রানার্স-আপ হয় হিল অ্যাটাকার।

এবারের টুর্নামেন্টে উশৈচিং চৌধুরী সর্বোচ্চ গোলদাতা ও ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়, বেন্ডিকাম বম সেরা গোলরক্ষক এবং জয় বাবু ত্রিপুরা ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট নির্বাচিত হন।

খেলা শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় প্রক্টর চ্যাম্পিয়ন দলকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ও মেডেল তুলে দেন। রানার্সআপ ট্রপি তুলে দেন পিসিপি'র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সোহেল চাকমা। এই সময় অন্যান্য অতিথিবৃন্দ পর্যায়ক্রমে চ্যাম্পিয়ন ও রার্নাসআপ টিম এবং খেলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রেফারিবৃন্দকে মেডেল দিয়ে অভিনন্দন ও সম্মাননা জানান। এই সময় টুর্নামেন্টের ফাইনালে উপস্থিত থাকা শত পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছাস ও আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়।








সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।


 





0/Post a Comment/Comments