![]() |
সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত ঘটনাবলীর কিছু চিত্র। |
ডেস্ক রিপোর্ট, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
গত জুন মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচার বহির্ভুত হত্যা, অন্যায় গ্রেফতার-আটক,
খুন, অপহরণ, ভূমি বেদখল, নারীর ওপর সহিংসতা-সহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে
এসেছে ইউপিডিএফের মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেলের মাসিক রিপোর্ট “পরিবীক্ষণ”-এ।
গত ২ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত এ রিপোর্টে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের
বিষয়ে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় বাহিনী বিশেষত সেনাবাহিনীর মানবাধিকার
লঙ্ঘন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের দ্বারা বিচার বহির্ভুত হত্যা, অন্যায় গ্রেফতার,
বেআইনি তল্লাশি, হয়রানি যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মূলত এ ধরনের ঘটনার বিচারহীনতা
পার্বত্য চট্টগ্রামে অব্যাহত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে
কাজ করে। সে কারণে দেশে সরকার বদল হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে দমন-পীড়ন নীতির কোন পরিবর্তন
হয় না, মানবাধিকার লঙ্ঘনও বন্ধ হয় না।
গত জুন মাসে সেনাবাহিনী কর্তৃক ইউপিডিএফের এক কর্মীকে বিচারবহির্ভুতভাবে
হত্যা, ইউপিডিএফ সদস্যসহ অন্তত ২৩ জনকে গ্রেফতার-আটক, দুই ব্যক্তিকে শারীরিক নির্যাতন
ও এক ব্যক্তির বাড়িতে হয়রানিমূলক তল্লাশি চালানো হয়েছে। এছাড়া স্কুলে যাওয়ার পথে এক
পাহাড়ি শিক্ষক তল্লাশি-হয়রানির শিকার হয়েছেন।
বিচার বহির্ভুত হত্যার ঘটনাটি ঘটে গত ২৪ জুন খাগড়াছড়ির রামগড়ে। ঐদিন সেনাবাহিনীর
সদস্যরা ববিন ত্রিপুরা নামে এক ইউপিডিএফ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে।
গ্রেফতার ও আটক হওয়া ২৩ জনের মধ্যে বান্দরবানের রুমায় ১৩ ত্রিপুরা গ্রামবাসী
ও ইউপিডিএফের ১০ নেতা-কর্মী রয়েছেন। এদের মধ্যে গত ২৪ জুন রামগড়ে ইউপিডিএফ সদস্য মংসানু
মারমা ও ২৬ জুন ইউপিডিএফের গুইমারা ইউনিটের সমন্বয়ক ঝিমিত চাকমাকে গুলি করে হত্যা চেষ্টার
পর আহত অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়।
উক্ত ২৩ জনের মধ্য থেকে ইউপিডিএফের এক সাবেক কর্মীকে মহালছড়ি সেনা জোন থেকে
মুক্তি দেওয়া হলেও ৯ ইউপিডিএফ নেতা-কর্মীকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় কারাগারে প্রেরণ
করা হয়েছে। তবে বান্দরবানের রুমায় গত ৯ জুন অজ্ঞাত এক বাঙালি ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের
ঘটনায় বিজিবির হাতে আটক হওয়া ১৩ গ্রামবাসীর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এছাড়া খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে ৮টি সেনা অভিযান বা
টহল পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানের সময় সাজেকের ভূয়োছড়িতে সাধারণ জনগণের খেতের ফসল
ও পুকুরের মাছ লুট করা, দীঘিনালায় বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (কুটির) নির্মাণে বালু উত্তোলনে
বাধাদান এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ে অবস্থান করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যঘাত সৃষ্টির
অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও খাগড়াছড়ির পানছড়িতে গ্রামবাসীদের জায়গা দখল করে ৩টি স্থানে ক্যাম্প
স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি’র বিরুদ্ধে।
জেএসএস (সন্তু)-এর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরে রিপোর্টে
বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার নেতৃত্বে পরিচালিত
‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা পিসিজেএসএস খুন, অপহরণসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের
সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। ইউপিডিএফকে নির্মূল করার লক্ষ্যে বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
ও সন্তু গ্রুপের মধ্যে গোপন আঁতাত রয়েছে বলে জানা যায়। তাদের এই আঁতাতের প্রতিফলন ঘটে
দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে মাঠ
পর্যায়ে ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা ও সেনাবাহিনী কর্তৃক পিসিজেএসএসের
সশস্ত্র সদস্যদের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে।
গত জুন মাসে পিসিজেএসএস বা জেএসএস (সন্তু)-এর সশস্ত্র সদস্যদের হাতে সুজন
চাকমা নামে ইউপিডিএফের এক সদস্য খুন, দুই নারী অপহরণ ও রতন ত্রিপুরা নামে এক ব্যক্তি
শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। খুনের ঘটনাটি ঘটে গত ২৪ জুন দীঘিনালায়, অপহরণের ঘটনাটি
ঘটে গত ২৮ জুন রাঙামাটির কাউখালীতে এবং নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৭ জুন খাগড়াছড়ির
পানছড়িতে।
এছাড়া রাঙামাটির কাউখালীতে এক শিক্ষিকাকে চিকিৎসায় যেতে সন্তু গ্রুপের সন্ত্রাসীদের
বাধা প্রদান এবং সাজেকে তাদের যোগসাজশে কয়েকজন জুম্ম ব্যবসায়ীর আনুমানিক ৩৫০ মণের অধিক
শুকনো হলুদ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রিপোর্টে ভূমি বেদখল সংক্রান্ত ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, পার্বত্য
চট্টগ্রামে বহিরাগত সেটলার ও ভূমিদস্যু কর্তৃক পাহাড়িদের জায়গা-জমি বেদখল একটি নিয়মিত
ঘটনা। গত জুন মাসে বান্দরবানের লামা ও খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে ভূমি বেদখল সংক্রান্ত দুটি
ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়।
২১ জুন লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ায় ভূমি বেদখলের
উদ্দেশ্যে মো. বজলুর রহমানের নেতৃত্বে বহিরাগত বাঙালিরা ত্রিপুরা পাড়াবাসীদের ওপর হামলা
চালায়। হামলাকারীরা পাড়াবাসীদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে। হামলায় একই পরিবারের
শিমন ত্রিপুরা, সইততি ত্রিপুরা ও গুদাইচন্দ্র ত্রিপুরাসহ আরও কয়েকজন আহত হন বলে অভিযোগ
পাওয়া যায়।
মূলত উক্ত তিন ত্রিপুরা পাড়াবাসীর দীর্ঘ ২০-২২ বছর ধরে ভোগদখল করা জমি সম্প্রতি
মো. বজলুর রহমান নিজের সম্পত্তি বলে দাবি করে। এ নিয়ে একাধিক সালিশ ˆবঠকে দলিলপত্র
সাপেক্ষে ত্রিপুরা পাড়াবাসীরা জমির মূল মালিক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও বজলুর রহমান
জোর করে উক্ত জমিতে ঘর নির্মাণ শুরু করে। এতে জমির মালিক তিন ত্রিপুরা পাড়াবাসী বাধা
দিতে গেলে উক্ত হামলা চালানো হয় বলে জানা গেছে।
উক্ত হামলা ও ভূমি বেদখলের বিরুদ্ধে বান্দরবানে বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা বিক্ষোভ
করলেও হামলাকারী বজলুর রহমান গংদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের খবর পাওয়া যায়নি।
অপর ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ জুন খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার যোগ্যছোলা ইউনিয়নের
গঞ্জপাড়া এলাকায়। এতে উগ্যজাই মারমা (৩০) নামে এক পাহাড়িকে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে জখম
করা হয়।
জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও
পাহাড়ি-বাঙালি মুরুব্বীদের উপস্থিতিতে সালিশ ˆবঠকের সময় সীমানার পাশে দুটি সেগুন গাছ
নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মো. জীবন মাষ্টার ও তার ছেলে মো. সজীব উগ্যজাই মারমার
ওপর হামলা চালায় ও ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। পরে স্থানীয়রা উগ্যজাই মারমাকে উদ্ধার
করে মানিকছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে চিকিৎসা করেন। এ ঘটনায়ও হামলাকারীদের
বিরুদ্ধে আইনগত কোন পদক্ষেপের গ্রহণের খবর পাওয়া যায়নি।
নারীর ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে
নারীর ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। গত জুন মাসে এ ধরনের তিনটি ঘটনার তথ্য
পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দু’টি ধর্ষণ ও একটি শ্লীলতাহানির ঘটনা রয়েছে|
গত ১৩ জুন খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলাধীন কুকিছড়া এলাকার এক মারমা নারীকে
চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে নিয়ে গিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের
অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযুক্তদের মধ্যে প্রধান আসামিও মারমা সম্প্রদায়ের। এলাকাবাসী ম্রাসা
মারমা নামে অভিযুক্তদের একজনকে আটক করে পুলিশের নিকট সোপর্দ করেছে।
অপর ঘটনায় এক মানসিক ভারসাম্যহীন বাঙালি নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভধারণ
করার অভিযোগ ওঠে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার ছোট মেরুং এলাকার মো. আশ্রাফ উদ্দীন নামের
এক ভিডিপি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
গত ১৮ জুন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর খাগড়াছড়ি জেলা কমান্ড্যান্ট
মো. ইব্রাহিম খলিল স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর সাথে অনৈতিক
ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ছোট মেরুং ০৬ নং হিল ভিডিপি
প্লাটুনের নায়েক মো. আশ্রাফ উদ্দীনকে বাহিনীর সকল কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়রা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীর বিচার ও শাস্তির দাবি করলেও অভিযুক্ত
ভিডিপি কর্মকর্তাকে গ্রেফতার বা বিচারের আওতায় আনা হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি।
শ্লীলতাহানির ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ জুন। খাগড়াছড়ি সদরের চেঙ্গী স্কোয়ার এলাকায়
‘পাগল’ সেজে থাকা এক ব্যক্তি (বাঙালি) দ্বারা এইচএসসি পরীক্ষার্থী এক পাহাড়ি নারী শিক্ষার্থী
এ ঘটনার শিকার হন। ওই শিক্ষার্থী নিজে তার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ঘটনাটি জানিয়ে বলেন,
‘ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের বিদায় অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে তিনি এই অনাকাঙ্ক্ষিত
ঘটনার মুখে পড়েন। অভিযুক্ত ব্যক্তি তাকে ‘ব্যাড টাচ’ বা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করে।’
তাৎক্ষণিকভাবে ওই শিক্ষার্থীর বন্ধুরা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কিছু উত্তম-মধ্যম দিলেও তার
বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
