![]() |
| সেনাবাহিনী নাটক সাজিয়ে অপহৃত ফেরদৌস চাকমাকে (গোল চিহ্নিত) “উদ্ধার” দেখিয়ে তোলা ছবি। |
সাজেক প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
রাঙামাটির সাজেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সাথে যোগসাজশ করে
সেনাবাহিনী অপহৃত ফেরদৌস চাকমাকে উদ্ধারের নাটক সাজিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের
সত্যতাকে আরো বেশি স্পষ্ট করেছে সেনাবাহিনীর প্রচারিত সংবাদকে জেএসএস সমর্থিত বিভিন্ন
ফেসবুক পেইজে শেয়ার করার মাধ্যমে।
বর্তমানে ভুক্তভোগী ফেরদৌস চাকমাকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ‘এরিয়া
বন্দি’ করে রেখেছে বলে জানা গেছে।
গত ৩ আগস্ট সাজেক পর্যটন থেকে সংঘটিত অপহরণ ঘটনাটি প্রকাশ পায় ৬ আগস্ট তারিখে।
জানা গেছে, ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর থেকে সেনাবাহিনীর মধ্যে
তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
এরই অংশ হিসেবে গতকাল (৭ আগস্ট) সকাল ১০টার সময় অপহৃত ফেরদৌস চাকমার স্ত্রী
যতনা চাকমা ও তার শ্বশুর মনি চাকমা মাচলং থানায় মামলা করতে যাওয়ার পথে বাঘাইহাট জোনের
গোয়েন্দা শাখায় (এফএস) দায়িত্বরত মো. হুমায়ুন ও মো. জসিম তাদেরকে উজোবাজারে আটকিয়ে
মামলা করতে বাধা প্রদান করেন।
এ সময় মো. হুমায়ুন অপহৃত ফেরদৌস চাকমার স্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন যে, তার স্বামী
দু-এক দিনের মধ্যে বাড়িতে ফিরে আসবে। তিনি তাদের সামনে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র
কমান্ডার বিক্রম চাকমার সাথে মুঠোফোনে কথা বলে ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চান এবং বিক্রম
চাকমাকে লোকদেখানো বকা দেন।
এই মামলা করতে বাধা দেওয়ার খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার
ঘন্টাখানিক পর ‘সেনাবাহিনী ফেরদৌস চাকমাকে নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে’ বলে তাদের অনুগত কতিপয় নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে ছবিসহ খবর প্রকাশ করা হয়। মূলত এটি ছিল জেএসএসের সাথে বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটি
নাটক। সেনাবাহিনীর নির্দেশনা অনুসারে অপহরণকারী জেএসএস সন্ত্রাসীরা ফেরদৌস চাকমাকে
তার বাড়িতে নিয়ে রাখে। কারণ এলাকাটি তাদের নিয়ন্ত্রিত। আর সেনাবাহিনী নাটকের স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী সেখানে গিয়ে ফেরদৌস চাকমাকে উদ্ধার দেখিয়ে ছবি তোলে। এটাই হচ্ছে মূল কাহিনী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অপহৃত ফেরদৌস চাকমার বাড়ি জেএসএস সন্তু গ্রুপের
নিয়ন্ত্রিত ছোট কংলাক পাড়ায়। তিনি ২০২৪ সালে বাঘাইহাটের ডাবে বাইবাছড়া গ্রামের মনি
চাকমার মেয়ে যতনা চাকমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের এক বছর পর সন্তান প্রসবের
সময় এলে তার স্ত্রী নিজের বাবার বাড়িতে চলে যায়। এরপর স্ত্রীর সন্তান জন্মদান পরবর্তী
ফেরদৌস চাকমা সন্তানের কজোইপানি (আশীর্বাদ) অনুষ্ঠানে শ্বশুর বাড়িতে যেতে চাইলে জেএসএসের
সশস্ত্র সদস্যরা তাকে বাধা প্রদান করে। কিন্তু তিনি স্ত্রী ও সন্তানের মায়ায় চুপিসারে
(এক প্রকার পালিয়ে) নিজ বাড়ি থেকে তার শ্বশুর বাড়িতে চলে যান। এরপর থেকে জেএসএস সন্তু
গ্রুপের সশস্ত্র লোকজন তাকে “ইউপিডিএফের কাছে তাদের তথ্য সরবরাহের’ অভিযোগ করে মোবাইলে
কল করে নানা হুমকি প্রদর্শন করতে থাকে। এমতাবস্থায় ভয়ে তিনি বাড়িতে ফিরে না গিয়ে শ্বশুর
বাড়িতে অবস্থান করতে থাকেন। পরে স্ত্রী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সাথে আলোচনা করে গত
২ আগস্ট থেকে সাজেক পর্যটনে “Same Place Restaurant’ নামের একটি রেস্টুরেন্টে ৯ হাজার
টাকা বেতনে চাকরি নেন। ওই রেস্টুরেন্টে কাজ করার সময় ৩ আগস্ট জেএসএসের একদল সদস্য সশস্ত্র
অবস্থায় মোটর সাইকেলযোগে এসে তাকে অপহরণ করে উদয়পুরে নিয়ে যায়। ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়ে
রাখা হলেও ৬ আগস্ট তা প্রকাশ পায়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উদয়পুর ও কংলাক এলাকাটি জেএসএস
(সন্তু)-এর সশস্ত্র সদস্যরা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। তাদেরকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সহযোগিতা
প্রদান করা হয় বাঘাইহাট সেনা জোন থেকে। অপহরণকারী জেএসএসের সশস্ত্র কমান্ডার বিক্রম
চাকমার সাথে বাঘাইহাট জোনের এফ.এস মো. হুমায়ুনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। যার কারণে জেএসএস-কে
অপহরণের ঘটনা থেকে দায়মুক্ত রাখতে সেনাবাহিনী অপহৃতকে উদ্ধারকর্তা হিসেবে হাজির হয়েছে।
তবে এটি ছিল মূলত জেএসএসের সাথে সেনাবাহিনীর একটি বোঝাপড়া। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ
মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার কারণে সেনাবাহিনী চাপের মধ্যে পড়ে জেএসএসের সশস্ত্র কমান্ডার
বিক্রমের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে এই উদ্ধার নাটকটি সাজিয়েছে।
এদিকে, গতকাল (৭ আগস্ট) সন্ধ্যার সময় জেএসএসের সশস্ত্র দলের সদস্য পরিবর্তন
চাকমা ভুক্তভোগী ফেরদৌস চাকমার শ্বশুর মনি চাকমাকে মোবাইলে কল করে জানায় যে, “দুলাভাই,
তোমার মেয়ের জামাই ফেরদৌস চাকমা আর বাঘাইহাটে আসবে না। তাকে এরিয়া বন্দি করে রাখা হয়েছে।
তাদের পরিবারের সকলের ফোন হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। যদি বিশেষ কারণে তোমার মেয়ে তার স্বামীর
সাথে যোগাযোগ করতে চায় তাহলে এই নাম্বারে (01540709710) যোগাযোগ করতে পারবে।”
পরিবর্তন চাকমার বাড়ি গঙ্গারামের ভিতর রেতকাবা গ্রামে। তার পিতার নাম করাল্যা
চাকমা (বৈদ্য)। বর্তমানে তিনি স্ত্রী-পুত্রসহ ছোট কংলাক পাড়ায় বসবাস করছেন বলে জানা
গেছে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন অপহৃত ফেরদৌস চাকমাকে “উদ্ধারের” এই
নাটিকীয় ঘটনাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। বর্তমানে সেনাবাহিনী ও
জেএসএস(সন্তু)-এর মধ্যে যে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অন্যায়-অবিচার সংঘটিত হচ্ছে তা আবারো
প্রমাণ হয়েছে এ ঘটনার মাধ্যমে। এতে একদিকে জেএসএস যেমন সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল
করার অপচেষ্টা চালিয়েছে, অন্যদিকে সেনাবাহিনী অপহরণকারী জেএসএসের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের
রক্ষা করেছে। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী জেএসএস সন্ত্রাসীদেরকে আবারো অপহরণ, খুন, গুম করার
লাইসেন্স দিয়েছে!
এদিকে, এলাকাবাসী কথিত ‘উদ্ধার’ নাটক বাদ দিয়ে অবিলম্বে ফেরদৌস চাকমাকে
অপহরণের সাথে জড়িত জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র কমান্ডার বিক্রম চাকমাসহ তার সহযোগীদের
আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
