চবি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শাখার ২২তম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সুদর্শন চাকমা সভাপতি, মহামনি চাকমা সাধারণ
সম্পাদক ও ক্যাসিংহ্লা মারমা সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন।
“জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের দাবি মেনে নাও” এই স্লোগানে আজ শুক্রবার (২১ আগস্ট ২০২৬) সকাল ১১ টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ভবনে এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
পিসিপি’র চবি শাখার সভাপতি ভূবন চাকমার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন
চাকমা'র সঞ্চালনায় কাউন্সিল অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি সমর
চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক সোহেল চাকমা, পিসিপি’র সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ইউপিডিএফ সংগঠক
সুনয়ন চাকমা এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা।
পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের দলীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে
কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। এরপর শোক প্রস্তাব পাঠ করেন পিসিপি চবি শাখার সদস্য মহামনি
চাকমা।
শোক প্রস্তাব পাঠ শেষে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে
আত্মবলিদানকারী সকল শহীদদের স্মরণে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
কাউন্সিল অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন পিসিপির চবি শাখার দপ্তর সম্পাদক ক্যাচিংহ্লা মারমা।
তিনি বলেন, জুম্ম জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও প্রাণের দাবি ‘পূর্ণস্বায়ত্তশাসন’
অর্জনের লক্ষ্যে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ আজও নিরন্তর লড়াই করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায়
পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত সকল অন্যায়-নিপীড়নের বিরুদ্ধে পিসিপি চবি শাখা তাদের আপসহীন
সংগ্রাম জারি রেখেছে। আজকের এই কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে আমাদের মুক্তির সংগ্রাম আরও বেগবান
ও গতিশীল হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অব্যাহত গুম, খুন, নিপীড়ন, অত্যাচার এবং শাসকগোষ্ঠী
কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া সেনাশাসনের বিরুদ্ধে পিসিপি'র লড়াই চলবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত
করেন।
ছাত্রনেতা সমর চাকমা বলেন, বর্তমানে এক দেশে দুই নীতি চলমান। সমতলে এক নীতি,
আর পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সরকার জাতিগত নিধন ও নিপীড়নের নীতি বাস্তবায়ন করছে। পার্বত্য
চট্টগ্রামে আজও ভূমি, শিক্ষা এবং নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ২০১১ সালে স্বৈরাচারী হাসিনা অগণতান্ত্রিকভাবে সংবিধানে
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের স্বতন্ত্র পরিচয়কে অস্বীকার
করে তাদের জোরপূর্বক 'বাঙালি' জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দিয়েছেন। যার বিরুদ্ধে পাহাড়ি ছাত্র
পরিষদ সবসময় প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭০০-এর অধিক জুম্ম শিক্ষার্থী
অধ্যয়ন করছেন, তারা পাহাড়ের লড়াই-সংগ্রামে এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম,
যদি তারা নিঃসংকোচে আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নাম
ভাঙিয়ে অনেক সংগঠন গড়ে উঠলেও প্রকৃত লড়াই-সংগ্রাম ও অন্যায়ের প্রতিবাদের ময়দানেই পিসিপি-কে
চেনা যায়। অতীতের ভুলভ্রান্তি শুধরিয়ে পাহাড়ের নিপীড়িত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে
আরও সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি ছাত্রসমাজের কাছে আহ্বান জানান।
ইউপিডিএফ সংগঠক সুনয়ন চাকমা বলেন, বর্তমান সংকটময় সময়ে
ছাত্রসমাজকে সকল দোলাচল ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব এড়িয়ে পাহাড়ের গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে
স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে হবে। জাতির সূর্যসন্তানেরা কখনো সংগ্রামবিমুখ হয় না; বরং
অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তারা সর্বদা বুক চিতিয়ে সামনে এগিয়ে আসে।
তিনি উল্লেখ করেন, ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ কখনো অন্যায়ের
কাছে মাথা নত করেনি। ব্রিটিশ আমল থেকে আজ অবধি মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার গৌরবোজ্জ্বল
ইতিহাস জুম্মদের রয়েছে। পাহাড়ের জনগণের সামনে অধিকার আদায়ের সুযোগ বারবার এলেও সঠিক
নেতৃত্বের অভাবে তা হাতছাড়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ইউপিডিএফ প্রকৃত আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছে বলেই রাষ্ট্রযন্ত্র
তাদের ওপর বর্বরোচিত দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। ঠিক একইভাবে পাহাড়ের লড়াই-সংগ্রামে সামনের
সারিতে থাকায় পিসিপিকেও নানাভাবে দমন করা হচ্ছে। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনের
বৃহত্তর লড়াইয়ের জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। পাহাড়ে নিয়মিত নারী ধর্ষণ, নির্যাতন এবং অধিকারকামী জনগণকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও ধরপাকড় করা হচ্ছে। দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক অন্যায়ভাবে জারি করা ১১ দফা নির্দেশনা আজও বলবৎ রয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরেও পাহাড়ে ন্যক্কারজনক সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে। পুরো দেশে পরিবর্তনের হাওয়া লাগলেও পাহাড়ের বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। যতদিন পূর্ণস্বায়ত্তশাসন অর্জনের মধ্য দিয়ে জুম্ম জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায় না হয়, ততদিন পিসিপি'র পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য তিনি নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে ভুবন চাকমা বলেন, শাসকগোষ্ঠী পাহাড়ের
লড়াই-সংগ্রামকে দমন করার হীন উদ্দেশ্যে ছাত্রসমাজের মধ্যে একটি সুবিধাবাদী ধারার সৃষ্টি
করেছে। বিগত চাকসু নির্বাচনেও এই সুবিধাবাদী অংশটি ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য
লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিতে লিপ্ত হয়েছিল। তারা কেবল নাচ-গান ও সস্তা বিনোদনের মাধ্যমে
ছাত্রসমাজকে প্রকৃত লড়াই থেকে বিমুখ করে রাখার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ
করে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের ভাষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
চালু করা হয়নি। অতীশ দীপঙ্কর হলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য প্রাপ্য ৬০ শতাংশ আসন সঠিকভাবে
বণ্টন করা হচ্ছে না, বৈসাবি উৎসবে ছুটি মঞ্জুর করা হয় না এবং চাকসুতে জাতিসত্তা বিষয়ক
কোনো পদ রাখা হয়নি। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, শাসকগোষ্ঠী পাহাড়েও নীরব শিক্ষা-নিধন চালাচ্ছে।
বর্তমানে সাজেক কলেজে পাঠদানে বাধা দিয়ে সেনাবাহিনী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অর্জনের মৌলিক
অধিকারে নগ্ন হস্তক্ষেপ করছে। তিনি সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে পাহাড়ের নিপীড়িত মানুষের
অধিকার আদায়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান করেন।
কাউন্সিলের দ্বিতীয় অধিবেশনে চবি শাখার বিগত বছরের সাংগঠনিক
প্রতিবেদন পেশ করা হয়।
এরপর পুরাতন কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি ঘোষণা ঘোষণা করা হয়। কাউন্সিল
অধিবেশনে উপস্থিত সকল প্রতিনিধির সর্বসম্মতিক্রমে সুদর্শন চাকমাকে সভাপতি, মহামনি চাকমাকে
সাধারণ সম্পাদক এবং ক্যাচিংহ্লা মারমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ২৭ সদস্যবিশিষ্ট নতুন
কমিটি গঠন করা হয়।
নবগঠিত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ
সম্পাদক সোহেল চাকমা।
শপথ গ্রহণ শেষে নবগঠিত কমিটির নেতৃত্বে এবং উপস্থিত নেতৃবৃন্দের
অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য শুভেচ্ছা মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি চাকসু ভবন থেকে শুরু হয়ে
ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বুদ্ধিজীবী চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।
কাউন্সিল অধিবেশন থেকে সরকারের প্রতি চার দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো
হলো:
১. অবিলম্বে সাংবিধানিক গ্যারান্টিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে
পূর্ণস্বায়ত্তশাসন দাও!
২. পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেনা-গোয়েন্দা নজরদারি বন্ধ
কর!
৩. পিসিপি’র শিক্ষা সংক্রান্ত ৫ দফা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন কর!
৪. পাহাড় থেকে সেনাশাসন তুলে নাও, গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত কর!
এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকটও ৫ দফা দাবি জানানো হয়েছে।
সেগুলো হলো:
১. সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের ভাষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
চালু কর।
২. অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হল ও নবাব ফয়জুন্নেছা হলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী
এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের জন্য ৬০ শতাংশ আসন বরাদ্দ যথাযথভাবে নিশ্চিত
কর।
৩. বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর সঠিক ইতিহাস সম্বলিত
বই-পুস্তক সংরক্ষণ ও অধ্যয়নের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
৪. হলের খাবারের মান উন্নয়ন কর এবং আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান কর।
৫. পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে ছুটির তালিকা
প্রণয়ন করতে হবে।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।


