""

সাজেক কলেজকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছে সেনাবাহিনী!


বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে এলাকাবাসী নিজেদের অর্থায়নে নির্মিত সাজেক কলেজ পরিচালনা কার্যক্রম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছে বাঘাইহাট জোনের সেনাবাহিনী। বর্তমানে জোন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন লে. কর্নেল মো. তারেকুল ইমরান, পিএসসি।

ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জোনের সেকেন্ড ইন কমান্ড (টু-আইসি) মো. সালমান সিদ্দিক-কে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি করার দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায় কলেজের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম চালু করা যাবে না এবং চলমান মামলার আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত সোমবার (১০ আগস্ট) সাজেক থানার ওসির মাধ্যমে এবং টু-আইসি মো. সালমান সিদ্দিক নিজেই কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বাবুধন চাকমাকে মোবাইলে কল করে এমন হুমকি প্রদান করেছেন বলে জানা গেছে।

বাবুধন চাকমাকে কল করে টু-আইসি জানতে চান ‍‌“কার অনুমোদনে কলেজের শ্রেণিকক্ষে ক্লাসের কার্যক্রম শুরু করেছেন?” তার প্রশ্নের উত্তরে বাবুধন চাকমা বলেন, “গত ২৬ মার্চ কলেজে মহান স্বাধীনতা দিবস পালনের সময় আপনি বলেছিলেন দুই মাস পর কলেজে ক্লাস শুরু করা যাবে। কোন মামলার জটিলতা থাকবে না।”

বাবুধন চাকমা টু-আইসিকে আরো বলেন, ‘সাজেক কলেজ পরিচালনা করার মতো এলাকায় যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি রয়েছেন। তাই আপনি কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব নেবেন না। আপনাকে সম্মানের সহিত বলছি জনগণের মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে অহেতুক অপ্রিয় হতে যাবেন না।’

তখন টু-আইসি বাবুধন চাকমাকে হুমকিমূলকভাবে বলেন, “আপনারা সেনা প্রশাসনের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন। মামলার ফাইলপত্র রেডি আছে। শুধুমাত্র মামলার আইনি প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।”

বাঘাইহাট জোনের টু-আইসি মো. সালমান সিদ্দিক

এর আগে গত ৬ আগস্ট সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে এক আলোচনা সভায় কলেজ পরিচালনার পর্ষদের কাছে বাঘাইহাট জোনের ফিল্ড সিকিউরিটি (এফএস) মো. হুমায়ুন তিনটি দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো- ১.  জোনের টু-আইসিকে সাজেক কলেজ পরিচালনার পর্ষদের সভাপতি করতে হবে; ২. সাজেক কলেজে নিয়োগ করা শিক্ষকদের বাতিল করে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে ও ৩. কলেজ নির্মাণে সকল খরচ, নির্মাণের আর্থিক উৎস ও হিসাব জোনে প্রতিবেদন দিতে হবে।

এর মধ্যে ৩ নং দাবি অনুসারে গত ৮ আগস্ট কলেজ পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে জোনে প্রয়োজনীয় হিসাবপত্র জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।  

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে এলাকাবাসী নিজেদের অর্থায়নে ‘সাজেক কলেজ’ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সাজেকের দরিদ্রপীড়িত শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা প্রদানের পথ সুগম করা।

কিন্তু কলেজ নির্মাণ কাজ চলার মাঝপথে সেনাবাহিনী বনবিভাগকে ব্যবহার করে কলেজ নির্মাণ কাজে বাধা দেওয়া শুরু করে। ১৩ জুন ২০২৫ তারিখে বনবিভাগের লোকজন গিয়ে নির্মাণাধীন কলেজের সামনে খুঁটির ওপর সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়ে দেন। সাইনবোর্ডে লেখা হয় “এটি সরকারের সংরক্ষিত বনভূমি। সংরক্ষিত বনভূমিতে সরকারের অনুমতি ব্যতীত যেকোন স্থাপনা নির্মাণ আইনগত দন্ডনীয় অপরাধ। এ স্থানে যেকোন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা হল - আদেশক্রমে বিভাগীয় বনকর্মকর্তা পা: চ: উ: বনবিভাগ, রাঙ্গামাটি”।

এরপর থেকে চলছে একের পর এক বাধাদানের প্রচেষ্টা। কখনো সেনাবাহিনী সরাসরি, কখনো বনবিভাগের লোকজনকে দিয়ে কলেজ নির্মাণে বাধাদানের ঘটনা ঘটছে। এরই অংশ হিসেবে মাঝে মাঝে রাতের অন্ধকারে নির্মাণাধীন কলেজ রুমে ঢুকে সেনাবাহিনী তল্লাশিও চালিয়েছে। এমতাবস্থায় কলেজটি নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়।

এলাকাবাসী কলেজ নির্মাণে বাধাদানের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করেন, জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কাছে ধর্ণা দেন। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেন। কিন্তু কোনকিছুতেই বাধা দূর করা যায়নি।

তবে বাধার মধ্যেও কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেন এলাকাবাসী। সাজেক ইউপি চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমাকে সভাপতি করে কলেজ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে শিক্ষক নিয়োগ ও ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু বাধার কারণে কলেজের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব না হওয়ায় কলেজের বাইরে একটি ঘরে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়।

এমতাবস্থায় কলেজ পরিচালনা পর্ষদ গত ১০ আগস্ট থেকে কলেজের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ বিষয়টি জানতে পেরে ঐদিন সকালে প্রথমে সেনাবাহিনী ও বনবিভাগের লোকজন উজোবাজারে অবস্থান নিয়ে কলেজের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ রাখতে বলেন। এরপরও শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে কলেজের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে থাকলে দুপুর ১২টার সময় আবারো সাজেক থানার পুলিশ ও বনবিভাগের লোকজন (কর্মকর্তাসহ) কলেজে গিয়ে বাধা প্রদান করেন। এতে সেখানে উপস্থিত কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বাবুধন চাকমা, কলেজের অধ্যক্ষ সুমন চাকমাসহ এলাকার জনগণ বাধাদানের প্রতিবাদ জানান এবং পাল্টা যুক্তি দিয়ে পুলিশ ও বনবিভাগের আপত্তি খন্ডন করলে তারা কোন সুদুত্তর দিতে না পেরে ফিরে যান।

এদিকে এই বাধাদানের ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন দেখা দেয়, সাজেকে যদি পর্যটন-রিসোর্ট, মসজিদ, নির্মাণ করা যায় তাহলে কলেজের মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা যাবে না কেন? সাজেকবাসীকে উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখতেই কী কলেজের কার্যক্রম চালু করতে দেওয়া হচ্ছে না?

কিন্তু বাঘাইহাট জোনের সেনাবাহিনী টু-আইসি মো. সালমান-কে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি করার দাবিতে অনড় থাকায় জটিলতা কাটছে না।

গতকাল (১০ আগস্ট) সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জলও কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি সাজেক ইউপি চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমাসহ অন্যান্য সদস্যদের পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, “চলমান মামলার আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হলে কোন ছাত্র, শিক্ষক কলেজে আসতে পারবে না। তখন আমার করার কিছু থাকবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশের কোন ক্ষমতা নেই। বরং সেনাবাহিনীর সাথে বোঝাপড়া করাই আপনাদের বুদ্ধিমানের কাজ হবে।”  

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সেনাবাহিনী সাজেক কলেজটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে তারা এলাকার জনপ্রতিনিধি ও মুরুব্বীদেরকে মামলার ভয়সহ নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। তবে, প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, বাঘাইহাট টু-আইসিকে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি করা হলে যদি কলেজের কার্যক্রম শুরু করা যায়, তাহলে জনগণের দ্বারা কলেজটি পরিচালিত হলে তা করা যাবে না কেন? এটা কী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার দাপট বা ‘জোর যার মল্লুক তার’ নয়?



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments