""

রাঙামাটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মেঘরানী, শোভা ও সান্ত্বনা চাকমার জীবন সংগ্রামের গল্প

বাম থেকে মেঘরানী চাকমা, শোভা চাকমা ও সান্ত্বনা চাকমা। সংগৃহিত ছবি


অনলাইন ডেস্ক, সিএইচটি নিউজ

রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

পাহাড়ের রুক্ষ পথ আর অভাবের সাথে লড়াই করে যারা প্রতিদিন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিল, এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা তাদের সেই লড়াইয়ের পথ চিরতরে থামিয়ে দিল।

আজ রবিবার (১৬ আগস্ট ২০২৬) সকালে রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়নের মানিকছড়ি সেনাক্যাম্পের সামনে ঘটে যাওয়া এক পিকআপ উল্টে যাওয়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় রাঙামাটি শহরের কল্যাণপুর ও আমানতবাগ এলাকার পরিচিত মুখ—মেঘরানী চাকমা, শোভা চাকমা এবং সান্ত্বনা চাকমাসহ চারজন প্রাণ হারান। এ সময় তারা ব্যবসার জন্য কাঁচা তরিতরকারি কিনতে কুদুকছড়ি বাজারে যাচ্ছিলেন।

তাদের এই এই অকাল প্রয়াণে কল্যাণপুর সন্ধ্যার বাজার ও আশপাশের এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিয়মিত ক্রেতারা।

পরিচিত সেই মুখগুলো আর কখনো দেখা যাবে না

কল্যাণপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিদিন দুপুরের পর ঘর থেকে বের হলেই দেখতেন টুলের ওপর টাটকা শাকসবজির পসরা সাজিয়ে বসে থাকা মেঘরানী চাকমা ও শোভা চাকমাকে। অত্যন্ত ভদ্র, নম্র এবং সৎ এই দুই নারী নিজেদের মেহনতি জীবনের মধ্য দিয়ে সংসারের চাকা সচল রাখার চেষ্টা করতেন।

নিহত মেঘরানী চাকমার জীবনের গল্পটি ছিল বড় বেশি করুণ। মাস দেড়েক আগে তাঁর মা মারা যান। মায়ের শেষকৃত্য ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পন্ন করতে গিয়ে চড়া সুদে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই মাত্র মাস দুয়েকের ব্যবধানে না ফেরার দেশে চলে গেলেন মেঘরাণী নিজেও।

অতিরিক্ত শারীরিক মেদ ও চর্বির কারণে তিনি নানা রোগশোকে ভুগতেন, তা সত্ত্বেও সহজ-সরল স্বামীর পাশাপাশি নিজে সবজি বিক্রি করে সংসার টিকিয়ে রাখার অদম্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। প্রয়োজনের মুহূর্তে মানুষের কাছ থেকে ধার নেওয়া টাকা সময়মতো পরিশোধ করার সততা তাঁর ছিল অনন্য।

আরেক নিহত শোভা চাকমাও তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও অমায়িক ব্যবহারের জন্য সকলের শ্রদ্ধা কুড়িয়েছিলেন। দুর্ঘটনার পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

নিহত মেঘরানী ও শোভা চাকমা দু’জনই নান্যাচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা।

নিয়তির কাছে হার মানা লড়াকু নারী সান্ত্বনা চাকমা

এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো আরেক লড়াকু নারী সান্ত্বনা চাকমা (যিনি আমানতবাগ এলাকায় একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকতেন)। পাঁচ বছর আগের এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী বোধিপ্রিয় চাকমা একটি পা হারান। এতে মোটেও দমে যাননি তিনি। স্বামীর আয়ে অক্ষম হয়ে পড়ার পর সংসারের সম্পূর্ণ ভার কাঁধে পড়ে স্ত্রী সান্ত্বনা চাকমার। দুই কন্যাকে নিয়ে রাঙামাটি শহরের আমানতবাগ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থেকে পুরো সংসারের ঘানি একাই টানছিলেন তিনি।

প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে দূর পাহাড়ি পথে ছুটতেন কাঁচাবাজারের সন্ধানে। সেখান থেকে শাক সবজি সংগ্রহ করে রাঙামাটির কল্যাণপুর ও বনরূপা বাজারের রাস্তার পাশে বিক্রি করতেন।

এই সবজি বিক্রির সামান্য আয় দিয়েই চলত দুই মেয়ের পড়ালেখা ও সংসারের খরচ।

সান্ত্বনা চাকমার বড় মেয়ে পৃথিলা চাকমা ভেদভেদী পৌর উচ্চবিদ্যালয় থেকে সদ্য এসএসসি পাস করেছে। ছোট মেয়ে আকৃতা চাকমা আমানতবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

পাহাড়ি অঞ্চলের এই নারীর জীবনসংগ্রাম আশেপাশের মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল।

* তথ্যসূত্র: অনলাইন



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments