""

জুলাই দ্রোহযাত্রার ২য় বার্ষিকী: ৬ দফা দাবিতে ঢাকায় মিছিল ও সমাবেশ

পাহাড়ে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের দাবি মেনে নিতে সরকারের প্রতি অমল ত্রিপুরার আহ্বান


ঢাকা প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬

চব্বিশের জুলাই দ্রোহযাত্রার ২য় বার্ষিকীতে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জাতিগত, ধর্মীয়, লিঙ্গীয় নিপীড়ন বন্ধ করাসহ ৬ দফা দাবিতে ঢাকায় মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রবিবার (২ আগস্ট ২০২৬) বিকাল ৫:৩০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ-এর সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে দ্রোহযাত্রা ২য় বার্ষিকীর কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর প্রেসক্লাব থেকে একটি মিছিল শুরু হয়ে শহীদ মিনারে গিয়ে সমাবেশ ও বিভিন্ন গান, কবিতা, আবৃত্তি, নাটক পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ-এর সভাপতিত্বে শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান ইউপিডিএফ সদস্য অমল ত্রিপুরা। 

তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে যে অন্তবর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, সে সরকারের আমলেই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ভুলুণ্ঠিত হয়েছে। যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চৌদ্দশ’র অধিক ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা, সেই স্বপ্ন পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে ইউনূস সরকার।

অমল ত্রিপুরা আরো বলেন, আমরা জানি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার, মন্দিরসহ পাহাড় কিংবা সমতলে ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগণের ওপর হামলা হয়েছিল। আমরা জানি দীপু দাসকে কীভাবে জীবিত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আমরা জানি সিলেট, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন জায়গায়, গারো, মুন্ডা, সাঁওতাল, ওঁরাওদের ওপর কীভাবে আক্রমণ হয়েছিল। ঠিক অনুরূপভাবে আমরা দেখেছি পার্বত্য চট্টগ্রামে। সেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক ৭ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। অনেক বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ফ্যাসিবাদী শাসনের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, আমরা তখন বলেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে এ সরকার ফ্যাসিস্ট নয়। কিন্তু তার কাজে-কর্মে আমরা দেখেছি অন্তর্বতী সরকার ফ্যাসিস্টদের মতোই আচরণ করেছে।

অমল ত্রিপুরা আক্ষেপ করে বলেন, আমরা একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র চেয়েছিলাম, যে রাষ্ট্রে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষ, জাতিসত্তার জনগণ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সাম্য, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও কাঙ্ক্ষিত সে রাষ্ট্র, মানবিক যে রাষ্ট্র তা প্রতিষ্ঠা হয়নি। এদেশের নাগরিক, এদেশের শ্রমিক শ্রেণি, এ দেশের ছাত্র-যুবকসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিসত্তাদের যে অধিকার তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পাহাড়ি জনগণের ন্যায্য অধিকারের যে দাবি তা বারংবার উপেক্ষা করা হয়েছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্তর্বর্তী সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার- কোন সরকারই পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের যে যৌক্তিক দাবি তা পুরণের জন্য তারা চেষ্টা করেনি। ফলে আমরা দেখি পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো সেনাশাসন চলছে, সেখানে পাহাড়ি জনগণের ওপর হত্যা, গুম, খুন, অপহরণসহ প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত করা হচ্ছে।  

পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চলমান রয়েছে উল্লেখ করে অমল ত্রিপুরা বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমল থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমানে বিএনপি সরকারের আমলেও গত জুন মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে মার্কিন বাণিজ্য ‍চুক্তি নিয়ে নানা আলাপ হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের কোন বক্তব্য আমরা দেখতে পাই না। আমরা সরকারকে বলতে চাই, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোন চুক্তি জনগণ মেনে নেবে না। এ দেশের নাগরিকের একটি অংশ হিসেবে আমরাও জনগণের স্বার্থবিরোধী যে চুক্তি তা মানতে পারি না।  

অমল ত্রিপুরা সাম্য, মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন পাহাড় কিংবা সমতলে সকল গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হই। পাহাড়ে যে সেনাশাসন চলছে তার বিরুদ্ধে আমরা কথা বলি, রুখে দাঁড়াই। মনে রাখতে হবে দেশে যে স্বৈরশাসন, ফ্যাসিবাদ আমরা দেখতে পাই তার প্রথম সূচনা হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে। সেখানে সফল হওয়ার পর দেশের অন্যান্য জায়গায় তারা সেটা প্রয়োগ করে। কাজেই, পাহাড় কিংবা সমতলে যে লড়াই সে লড়াইকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে চলবে না। কাজেই, আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, লড়াই করি।

বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে সকল হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেসব হত্যাকাণ্ডেরও বিচার করতে হবে। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সমস্যা তা সমাধানের জন্য সেখানকার জনগণের সাথে শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেখানকার পাহাড়ি জনগণের পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের যে দাবি তা অচিরেই মেনে নিতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকার জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে যে বোঝাপড়া করছিল, বর্তমান সরকারের মধ্যেও একই চিন্তাধারা দেখতে পাচ্ছি। অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবাদী শক্তির সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের ভয়ংকর অন্ধকার জগৎ তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এর পৃষ্ঠপোষকতা করেছে এবং বর্তমান সরকারও একই ধারায় তা অব্যাহত রেখেছে।’

তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানে সর্বজনের শক্তির প্রকাশ ঘটেছে। অভ্যুত্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারে না। এর জন্য সর্বজনের উন্নয়ন দর্শন প্রতিষ্ঠা করা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় শক্তিগুলোকে সংগঠিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেই মতাদর্শ সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজও শক্তিশালী রাখতে হয়। প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে সাংস্কৃতিক, সৃজনশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক, শ্রেণির প্রশ্ন ও নারীর প্রশ্ন নিয়ে কাজের ধারাবাহিকতা আরও সংগঠিত করার তাগিদ দেন তিনি।

সমাবেশে আনু মুহাম্মদ প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আপনারা কি শুনেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পরে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে দেশের সর্বনাশকর চুক্তি করা হবে, নারীর চলাচলে বাধা দেওয়া হবে। আপনারা কি শুনেছেন ভয়ের সংস্কৃতি চালু হবে, ধর্মীয় ও জাতিগত বৈষম্য বাড়তে থাকবে এবং নতুন স্বৈরশাসন ও ফ্যাসিবাদের আবহাওয়া তৈরি হবে?’

আনু মুহাম্মদ বলেন, শ্রমিক, নারী, আদিবাসী, শ্রমজীবী মানুষের শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলে কতদূর অর্জন করা সম্ভব তা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে দেখা গেছে।

তিনি আহ্বান জানান, যত দিন পর্যন্ত গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশের যাত্রা একটি যথাযথ জায়গায় না পৌঁছাবে, তত দিন পর্যন্ত জনগণের সেই শক্তিকে সংগঠিত ও বিকশিত করে দ্রোহযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে।

সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন জুলাইয়ের শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফি রতন, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ডা. হারুন অর রশীদ, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক-এর পক্ষে অলিউর সান, উদীচির সাধারণ সম্পাদক ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতি ঐক্যর সমন্বয়ক জামশেদ আনোয়ার তপন, জাতীয় শ্রমিক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের নেতা শামীম ইমাম, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ও গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সমন্বয়ক সালমান সিদ্দিকী প্রমুখ।



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments