""

আগস্ট মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে গ্রেফতার, নির্যাতনসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ

গত আগস্ট মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত ঘটনাবলীর কিছু চিত্র।


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গত আগস্ট মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে আটক-গ্রেফতার, শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ, ভূমি বেদখল চেষ্টা ও নারীর ওপর সহিংসতাসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে ইউপিডিএফের মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেলের মাসিক রিপোর্ট ‘পরিবীক্ষণ’-এ। গত ৩ সেপ্টেম্বর রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়। এতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, জেএসএস (সন্তু), ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসী, অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত, সেটলার বাঙালি ও ভূমিদস্যু কর্তৃক পৃথক পৃথকভাবে এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে। গত আগস্ট মাসে সেনাবাহিনী চার ব্যক্তিকে আটক করেছে, যার মধ্যে ইউপিডিএফের এক সংগঠক রয়েছেন। আটককৃতদের মধ্যে দু’জন মুক্তি পেলেও বাকী দু’জনকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

“ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ২১ আগস্ট ২০২৬ ভোরে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার সাদিয়াবাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা বজেন্দ্র ত্রিপুরা (৫০) ও লক্ষী কুমার ত্রিপুরা (২৬) নামে দুই ব্যক্তির বাড়ি তল্লাশির পর তাদেরকে আটক করে থানায় হস্তান্তর করে। পরে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে লক্ষী কুমার ত্রিপুরাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হলেও বজেন্দ্র ত্রিপুরাকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

“অপর আটকের ঘটনাটি ঘটে ২২ আগস্ট। খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলাধীন সিন্দুকছড়ির পক্ষীমুড়ো এলাকায় সেনাবাহিনী ইউপিডিএফ সংগঠক সুনান্ত চাকমা ওরফে বিকাশ চাকমা ও শিমুল চাকমা নামে অপর এক ব্যক্তিকে আটক করে। পরে শিমুল চাকমাকে মহালছড়ি জোন থেকে ছেড়ে দেওয়া হলেও সুনান্ত চাকমাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

“আলোচ্য মাসে বান্দরবানের থানচি ও খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ইউপিডিএফ সদস্যসহ অন্তত সাত ব্যক্তি সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হন। গত ১০ আগস্ট আলীকদম সেনা জোনের একদল সেনা সদস্য থানচির জনিরাম পাড়া (বটগাছপাড়া) গ্রামের এক কিশোরসহ চার জনের ওপর নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা হলেন ১. সলোমন ত্রিপুরা (১৮), ২. জীবন ত্রিপুরা (১৫), ৩. জগদীশ ত্রিপুরা (২১) ও৪. ইলিসাই ত্রিপুরা (২৮)।

“অপর ঘটনাটি ঘটে ১৫ আগস্ট খাগড়াছড়ির দীঘিনালায়। একদল সেনা সদস্য রাতের আঁধারে বাড়ি ঘেরাও করে ইউপিডিএফ সদস্য পিউশন চাকমা ও রুবেল চাকমা এবং এলাকার যুবক রিকন চাকমার উপর অমানুষিকভাবে শারীরিক নির্যাতন চালায়।

“আগস্ট মাসে খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়িতে এক ব্যক্তির বাড়িতে হয়রানিমূলক তল্লাশি, রাঙামাটির সাজেকে এক ব্যক্তির বাড়ি ঘেরাও করে হয়রানি, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় অন্তত ৭টি স্থানে সেনা অভিযান বা টহল-তৎপরতা চালানো হয়। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলায় পুরো আগস্ট মাস জুড়ে সেনাবাহিনী ও বিজিবি টহল-তৎপরতা চালায়। অন্যদিকে, গুইমারায় নাক্রাই এলাকায় সশস্ত্র ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের সাথে নিয়ে সেনাবাহিনী তৎপরতা চালিয়েছে।”

এছাড়া আলোচ্য মাসে রাঙামাটির সাজেক কলেজের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রমে বাধাদানের ঘটনা ঘটেছে। সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন ও বনবিভাগ কলেজটি বনবিভাগের জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে বলে মিথ্যা অভিযোগ তুলে কলেজটি বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

রিপোর্টে জেএসএস সন্তু গ্রুপের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে,  গত আগস্ট মাসে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সন্ত্রাসীরা সাজেকের পর্যটন থেকে ফেরদৌস চাকমা নামে এক রেস্টুরেন্ট কর্মচারীকে অপহরণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। ৩ আগস্ট সংঘটিত এ ঘটনায় সেনাবাহিনী ও সন্তু গ্রæপের যোগসূত্র রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর উভয়ের যোগসাজশের মাধ্যমে সেনাবাহিনী অপহৃত ব্যক্তিকে নিজ বাড়ি থেকে “উদ্ধার” নাটক সাজায়। তবে বর্তমানে সন্তু গ্রুপ উক্ত ব্যক্তিকে ‘এরিয়া বন্দি’ করে রেখেছে বলে জানা গেছে।” 

ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত ঘটনার তথ্য তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীরা খুন, অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে। গত আগস্ট মাসে এই সন্ত্রাসীদের কর্তৃক অন্তত সাত ব্যক্তি অপহরণ বা জিম্মির শিকার হয়েছেন।

“ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ২২ আগস্ট খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং ইউনিয়নের তালুকদার পাড়া থেকে মিলন চাকমা (৩৬), চিঙ্গিরি চাকমা (৩৭), অসীম চাকমা (৩২) ও টুটুমনি চাকমা (২২) নামে চার গ্রামবাসীকে অপহরণ ও জিম্মি করার অভিযোগ রয়েছে।

“অপর ঘটনাটি ঘটে ৩০ আগস্ট খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়িতে। সেনা মদদপুষ্ট ঠ্যাঙাড়ে (মুখোশ) দুর্বৃত্ত দুর্জয় চাকমা ও তার সহযোগীরা লক্ষীছড়ি বাজারে শুকরের মাংস বিক্রি করতে যাওয়া কালাইয়া চাকমা, নিথন চাকমা ও বাবু চাকমা নামে তিন জনকে ধরে নিয়ে জিম্মি করে ৩৮ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা লক্ষীছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে তারা চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মিঠাছড়ায় বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।”

এছাড়া গত ২৮ আগস্ট খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রথম শহীদ ভরদ্বাজ মুনির স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে রাজীব চাকমা নামে এক ব্যক্তি জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয় দীঘিনালা ইউনিয়নের মেম্বার এবং জেএসএস (সংস্কারবাদী) দলের সাথে যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে। এর আগে তিনি সেনা-সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে (মুখোশ) বাহিনীতে কাজ করেছিলেন এবং সে সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার সাথে শাসকগোষ্ঠীর বিশেষ মহলের ইন্ধন থাকতে পারে বলে এলাকাবাসী ধারণা করছেন- বলে উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে।

অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত কর্তৃক সংঘটিত ঘটনা তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার সিন্দুকছড়ি ইউনয়নের তৈকর্মা এলাকায় মংশিনু মারমা (২৫) নামে এক যুবক অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হামলা-মারধর ও ছিনতাইয়ের শিকার হন। গত ২৬ আগস্ট  রাত সাড়ে ৮টার দিকে গুইমারা বাজার থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে মোটর সাইকেলের গতি রোধ করে ৩-৪ জন দুর্বৃত্ত তাকে বেদম মারধর করে এবং নগদ ৩ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরে দুর্বৃত্তরা তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। ভুক্তভোগী মংশিনু মারমা সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মুখপাড়া এলাকার সুইহ্লা প্রু মারমার ছেলে বলে জানা গেছে।”

রিপোর্টে সেটলার বাঙালি কর্তৃক সংঘটিত ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধভাবে পুনর্বাসিত সেটলাররা সবসময় পাহাড়িদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে তাদের দৌরাত্ম্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৭৯-৮৪ সালে ফৌজি শাসক জিয়াউর রহমানের তৎকালীন বিএনপি ও এরশাদের জাতীয় পার্টির সরকারের আমলে তাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসা যায়। তারা মূলত মুসলমান বাঙালি।”

এতে বলা হয়, “গত আগস্ট মাসে খাগড়াছড়ির রামগড়ের গরুকাটা এলাকায় অগ্নিকান্ডে এক সেটলার বাঙালির গোয়ালঘর পুড়ে যাওয়ার ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে সেটলাররা পাহাড়িদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়। এতে পাহাড়িদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। তবে বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।” 

ভূমি বেদখলের তথ্য তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ভূমি বেদখল ও বেদখল চেষ্টার ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে। অবৈধ সেটলাররা ও কোম্পানি নামধারী ভূমিদস্যুরা এর সাথে জড়িত। তাদের প্রতি স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে।”

আগস্ট মাসের ভূমি বেদখল সংক্রান্ত ঘটনাবলীর বিবরণ দিয়ে এতে বলা হয়েছে, “গত আগস্ট মাসে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ৫টি স্থানে ভূমি বেদখল প্রচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে খাগড়াছড়ির গামারিঢালায় এক পাহাড়ির রেকর্ডিয় জমিতে সেটলারদের ঘর নির্মাণ; বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন চাক পাড়ায় পাড়াবাসীদের দীর্ঘসময় ধরে ব্যবহৃত শ্মশানের জায়গা নূর মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি কর্তৃক দখলের অপচেষ্টা; খাগড়াছড়ি সদরের মহিলা কলেজ এলাকায় এক বাঙালি ট্রাক ড্রাইভার কর্তৃক আমেরিকা প্রবাসী বিজ্ঞানী ড. মংসানু মারমা বাথোয়াই-এর কেনা জমি দখল করার পাঁয়তারা, বান্দরবানের লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নে মেরিডিয়ান কোম্পানির লোকজন কর্তৃক ¤্রােদের ভোগদখলীয় জমিতে রাবার চারা লাগিয়ে বেদখল চেষ্টা এবং খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার নাঙ্গেল পাড়ার বাসিন্দা শান্তি রঞ্জন চাকমার (৪৫) বসতভিটা এলাকায় একদল সেটলার বাঙালি বেআইনিভাবে প্রবেশ করে বেদখলের চেষ্টার ঘটনা।”

নারীর উপর সহিংসতার তথ্য তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “গত আগস্ট মাসে অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত কর্তৃক এক ত্রিপুরা নারী হত্যার শিকার হন। গত ২৯ আগস্ট খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের নরেন্দ্র কারবারি পাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে অনিকা ত্রিপুরা (৩০)-এর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে এলাকাবাসী ধারণা করছেন। তাকে হত্যার পর দুর্বৃত্তরা তার বাড়ি থেকে মালামাল লুট করে নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।”


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments