""

পানছড়িতে দুই বন্দীর উপর সন্তু গ্রুপের বর্বর নির্যাতন



লক্ষীছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গত ৫ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার তারাবন এলাকা থেকে ধরে নেওয়া দুই তরুণকে গতকাল (৭ সেপ্টেম্বর) অভিভাবক ও এলাকার জনপ্রতিনিধিদের ডেকে তাদের হাতে তুলে দিয়েছে জেএসএস সন্তু গ্রুপ। তারাবন গীর্জা এলাকা থেকে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা যায়।

এ সময় সন্তু গ্রুপের পক্ষ থেকে আদিত্য, জুনপহর, প্রত্যুত্তর, তরু উপস্থিত জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথাবার্তা বলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

অপহৃত বন্দীদেরকে ছেড়ে দেওয়ার পর পরই সন্তু গ্রুপের লোকজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন আইডি, পেইজ থেকে স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেদেরকে মানবিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালায়। দু্'একজনকে তাদের এ কাজের জন্য প্রশংসা করতেও দেখা যায়। কিন্তু তাদের এই ‍“মানবিকতা” প্রদর্শনের আগে দুই বন্দীর ওপর সন্তু গ্রুপ যে চরম নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা চালিয়েছে তা এখনও কেউ জানে না।

জানা যায়, উক্ত দুই তরুণ গণপ্রতিরোধ যোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে পানছড়িতে কর্মরত ছিলেন। গত ৫ সেপ্টেম্বর সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র টিম আক্রমণ চালালে তাদের হাতে তারা ধরা পড়েন। এ সময় তারা বাবুর্চির দায়িত্ব পালন করছিলেন। তারা ছিলেন সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও সাধারণ পোশাক পরিহিত। আক্রমণের সময় সরে যেতে না পেরে তারা একটি বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। পরে সেখান থেকে সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা তাদেরকে ধরে নিয়ে একটি স্থানে বেঁধে আটক করে রাখে এবং তাদের ওপর অমানুষিক শারিরীক নির্যাতন চালায়।

তারা নিরীহ দুই তরুণের বন্দী অবস্থার ছবি ব্লার করে বা মুখ ঢেকে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে নিজেদের বীরত্ব দেখাতে চায়। তবে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালিত ‌‘সাউটইস্ট এশিয়া জার্নাল’ নামে একটি নিউজ পোর্টালে বন্দীদের পরিষ্কার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, যা নিয়ে সকল মহলে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাটির হাতে কীভাবে এই ছবি গেলো তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক সিএইচটি নিউজকে বলেন, “সন্তু গ্রুপের সাথে গোয়েন্দা সংস্থাটির ঘনিষ্ট যোগাযোগ না থাকলে বন্দীদের ছবি তাদের হাতে যাওয়ার কথা নয়। সন্তু গ্রুপ আসলে জনগণের পক্ষে কাজ করছে না সেটা না বোঝার আর কোন কারণ নেই।”

ভুক্তভোগী দুই তরুণের একজন হলেন সার্জেল্যা চাকমা ওরফে মেকসন (২৩)। তিনি লক্ষীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা সুনীল চাকমার ছেলে।

মুক্তি পাওয়ার পর তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হলে তার শারীরিক অবস্থা দেখে সন্তু গ্রুপের নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা প্রকাশ পায়। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এখনো রয়েছে সন্তু গ্রুপের নির্যাতনে জখম হওয়ার চিহ্ন।

তার ওপর এত নির্মম অত্যাচার চালানো হয়েছে যে, তিনি এখন ঠিকমত কথাও বলতে পারছেন না। ব্যথা বেদনায় কাতরাচ্ছেন। জ্বরও আছে। সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন, চামড়া একেবারে কালো হয়ে গেছে।

বন্দীদের সাথে সন্তু গ্রুপের অমানবিক ব্যবহার দেখে অনেকে হতবাক হয়েছেন। অনেকে প্রশ্ন করে বলেছেন, একজন নিরস্ত্র ব্যক্তির উপর কীভাবে সন্তু গ্রুপ এমন নির্যাতন করতে পারে।

রাজনৈতিক এক পর্যবেক্ষক বলেন, “বন্দীদের ওপর এই নির্যাতন আসলে সন্তু গ্রুপের ধ্বংস ও পতনেরই লক্ষণ। পাকিস্তানী সৈন্যারাও ১৯৭১ সালে পতনের আগে এমন নির্যাতন চালিয়েছিল। প্রত্যেকটি সেনাবাহিনীকে ধ্বংস হওয়ার আগে বর্বরতা চালাতে দেখা যায়। সন্তু গ্রুপও তার ব্যক্তিক্রম হবে না।”

তিনি বলেন, বন্দীদের বিশেষত যুদ্ধবন্দীদের সাথে দুর্ব্যবহার, তাদের ওপর নির্যাতন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এ বিষয়ে জেনেভা কনভেনশনে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘যুদ্ধবন্দীদের সাথে সর্বদা মানবিক ও সদয় আচরণ করতে হবে। তাদের হত্যা, অঙ্গহানি বা শারীরিক নির্যাতন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।’

কিন্তু সন্তু গ্রুপ জেনেভা কনভেনশনের নীতি মেনে চলেনি। তারা বন্দী দুই তরুণের ওপর অমানবিক আচরণ করেছে। তাদের ওপর শারিরীক নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের এই অমানবিক নিষ্ঠুরতা জনগণের কোন সমর্থন লাভ করবে না।


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।








0/Post a Comment/Comments