""

দীঘিনালায় নিরাপত্তা বাহিনীর বাধা উপেক্ষা করে বিশাল নারী সমাবেশ ও র‌্যালি অনুষ্ঠিত : ৭ দফা রাজনৈতিক প্রস্তাবনা অনুমোদন

 * আপন ভূমিতে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে তবেই পাহাড়ি নারীদের মুক্তি সম্ভব : নওসিন ফ্লোরা

* দমন-পীড়ন বন্ধে রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে ‘জনগণের রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে : সামা হক

* ১৯ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠান সফল করুন : শহীদ জুনান মা


হিল উইমেন্স ফেডারেশনের আয়োজিত নারী সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ। 


দীঘিনালা প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় সেনা তল্লাশি, হয়রানি, ড্রোন উড়িয়ে নজরদারি, সমাবেশস্থলে হুমকিমূলক অবস্থান, ভিডিও ধারণ ও নানা বাধা উপেক্ষা করে দীঘিনালা বাবুছড়া কলেজ মাঠে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ডাকে আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল সাড়ে দশটায় এক বিশাল নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

প্রখর রৌদ্রের মাঝে দেড় সহস্রাধিক বিভিন্ন বয়সের নারী-কর্মজীবী-শিক্ষার্থী সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন।

ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে খাগড়াছড়িতে সেনা গুলিতে নিহত শহীদ জুনান মা রূপসা চাকমা আবেগপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে এ সমাবেশ উদ্বোধন করেন এবং আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিতব্য ‘শহীদ জুনান-রুবেল স্মরণ অনুষ্ঠান’ সফল করার জন্য সর্বস্তরের জনতার প্রতি আহ্বান জানান।

শহীদ জুনান চাকমার মা রূপসা চাকমা সমাবেশ উদ্বোধন করেন।

এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন শহীদ রুবেল মা, ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক উষাতন চাকমা, ল্যাম্পপোস্টের গণমুক্তির গানের দলের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ফারহানা হক সামা, রেড ফেমিনিস্ট ব্লগ-এর সদস্য নওসিন ফ্লোরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি কণিকা দেওয়ান, ৫নং বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গগণ বিকাশ চাকমা, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর সভাপতি সমর চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য অনুপম চাকমা, জনপ্রতিনিধি প্রতিভা চাকমা ও শান্ত চাকমা প্রমুখ। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা ও পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রথম শহীদ ভরদ্বাজ মুণি-সহ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে দুই মিনিট নিরবতা পালনের পরে পরেই মূল আলোচনা শুরু হয়।

শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে ২ মিনিট নীরবতা পালন করেন সমবেত জনতা।

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা আগের দিন ১৩ সেপ্টেম্বর সংগঠনের বিশেষ সম্মেলনে গৃহীত ‘৭ দফা সম্বলিত রাজনৈতিক প্রস্তাবনা’ সমবেতদের উদ্দেশ্যে পড়ে শোনান এবং অংশগ্রহণকারীদের সমর্থন যাচাই করেন। এ সময় সমাবেশস্থলে মুহুর্মুহু শ্লোগান উচ্চারিত হয়। অংশগ্রহণকারীগণ তুমুল করতালি দিয়ে হাত উঁচিয়ে তা সমর্থন দেন।

সমাবেশে সমবেত নারী ও শিক্ষার্থীরা হাত উঁচিয়ে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ৭ দফা প্রস্তাবনা অনুমোদন করছেন।

সমাবেশে ঢাকা থেকে আগত অতিথি ল্যাম্পপোস্টের সামা হক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন এবং প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘অনেকেই বলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কিন্তু একটি প্রজাতন্ত্রের দেশে প্রতিনিয়ত আর্মি, পুলিশ, সেটলার কিংবা মুখোশ, ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী দ্বারা ইউপিডিএফ’র অথবা জনগণের আন্দোলনের বাধাগ্রস্ত করতে পারে? একটি স্বাধীন দেশে তা হয় না বা হতে পারে না।’

সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ।

পাহাড়ে সংঘটিত বহু বেদনাদায়ক ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, ইতিহাসে বিপুল, জুনান, কল্পনা চাকমার মতো ঘটনা আমরা আর চাই না। আমরা আমাদের আরো কোন ভাই, সন্তান, বোন, পিছি কাউকে হারতে চাই না।

সামা হক জোর গলায় বলেন, বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে শ্রমিক, জনগণের ক্ষমতা, জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তখনি এই রাষ্ট্রের নিপীড়ন বন্ধ হবে, রাষ্ট্রীয় বাহিনী আমাদের রক্ষা করবে।

সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন ল্যাম্পপোস্টের ফারহানা হক সামা।

নারী সমাবেশে একাত্মতা জানিয়ে অপর অতিথি রেড ফেমেনিস্ট ব্লক-এর সদস্য নওশিন ফ্লোরা বলেন, “দশকের পর দশক ধরে পাহাড়ে সংঘাত ও সামরিকীকরণের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুরা যৌন সহিংসতা, ভয়ভীতি, উচ্ছেদ এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেক সময় সহিংসতার পর এসেছে আরেকটি অন্যায়—নীরবতা, ভুক্তভোগীদের ওপর চাপ, তদন্তের ব্যর্থতা এবং দায়মুক্তি।”

পাহাড়-সমতলে নারী নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “সেনা শাসন পাহাড়ের নারীদের নিরাপত্তা কথা বলে তাদের নিজের জন্মভূমিতে অবরুদ্ধ করে রাখে। কিন্তু সেনাবাহিনী নিজেরাই এদের ওপর নিপীড়ন করে। অপরদিকে বাঙালি সেটেলার আদিবাসীদের নিজস্ব জায়গায় এসে সেনা সহায়তায় তারা আদিবাসী নারীদের ওপর অন্যায়, নির্যাতন চালায়। এছাড়াও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা এই দেশে সংখ্যালঘু পাহাড়ি নারীদের নিজস্ব কালচার ধারণ করাটাও বিরূপ চোখে দেখে। ফলে পাহাড়ি নারীদের যে নিজস্ব স্বকীয়তা তা অনেক সময়েই তাদের লুকিয়ে রাখতে হয়।”

সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন রেড ফেমেনিস্ট ব্লক-এর সদস্য নাওশিন ফ্লোরা 

তিনি আরো বলেন, “আমরা সকলেই বাংলাদেশের নাগরিক এবং সেই কারণেই পাহাড়ি নারীদের উপর করা নিপীড়ন এর প্রতিবাদ জানাতে হবে এবং পাহাড়ি নারীদের মুক্তি তখনই হবে যখন পাহাড়ি নারীদের নিজেদের জন্মভূমিতে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।”

তিনি পাহাড়ে একদিন সেনা শাসনের নিপাত হবে ও আদিবাসী নারী অধিকারসহ পূর্ণস্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়িত হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

সরকারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পাহাড়িদের ধ্বংস করা মন্তব্য করে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের’ আহ্বায়ক উষাতন চাকমা তার বক্তব্যে বলেন, বর্তমানে আমরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছি, সেটলাররা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হয়েছে। বাঁচার তাগিদে আন্দোলন সংগ্রামে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান উষাতন চাকমা। তিনি বিএনপি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। মীর হেলাল পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগণের ভোটের নির্বাচিত প্রতিনিধি না হওয়া সত্ত্বেও তাকে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে পাহাড়ে উন্নয়ন, শান্তি, শৃঙ্খলা, তদারকির দায়িত্ব প্রদান করায় সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা। 

সমাবেশে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি তার বক্তব্যে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন এবং বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ সারাদেশে নারী ও শিশুরা অনিরাপদ, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা মধ্যে দিয় দৈনন্দিন জীবন যাপন করছে। দেশে প্রতিনিয়ত নারীর ওপর সহিংসতা এবং কোথাও না কোথাও খুন, ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ ঘটনা ঘটছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলে নারীর ওপর চলমান সহিংসতা বন্ধ করতে হবে বলে তিনি দৃঢ়তার সাথে মত দেন।

নীতি চাকমা বক্তব্য রাখছেন।

পাহাড়ে নারী নিরাপত্তার প্রধান হুমকি হচ্ছে সেনা ও সেটলার মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পূর্ব শর্ত হচ্ছে পাহাড় থেকে “অপারেশন উত্তরণ” ও “অবৈধ ১১ দফা নির্দেশনা” প্রত্যাহার করে সেনা-সেটলার ফিরিয়ে নেওয়া। তার পরিবর্তে সেনা, গোয়েন্দা, আমলা ও সরকারের অনুগ্রহভাজন কতিপয় ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে সরকার কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে উদ্যত হয়েছে, তা গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপি’র অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নীতি চাকমা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, সেনা ও আমলা নির্ভর উদ্যোগ কখনই ফলপ্রসু হবে না।

বক্তব্য রাখছেন কণিকা দেওয়ান।

সমাবেশে কণিকা দেওয়ান বলেন, নিরাপত্তার নামে নিয়োজিত সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্ত পরিস্থিতিকে অশান্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তিন কমিটি গঠনও তারই অংশ। কাজেই সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থেকে সকল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন বাবুছড়া ইউপি চেয়ারম্যান গগণ বিকাশ চাকমা।

বাবুছড়া ইউপি চেয়ারম্যান গগণ বিকাশ চাকমা বলেন, পাহাড়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি একদিন নিরসন ঘটবে। আমাদেরকে টিকে থাকার জন্য এক ও অভিন্ন হয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

সমাবেশে ছাত্রনেতা সমর চাকমা বলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে দমন-পীড়ন জোরদার করতে পূর্বের মত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অগণতান্ত্রিক নীতি কৌশল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

বক্তব্য রাখছেন সমর চাকমা।

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দমন-পীড়ন, হত্যাকাণ্ড চালিয়ে জনগণের আন্দোলনকে ধ্বংস করা যাবে না। পাহাড়ি জনগণ অধিকারের জন্য লড়াই করছে, আত্মবলিদান দিয়েছেন। সুতরাং ভয় দেখিয়ে আমাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

সমাবেশ শেষে প্রতিবাদী গানের নৃত্য পরিবেশন করা হয়।

সমাবেশে প্রতিবাদী নৃত্য পরিবেশন করছেন শিল্পীরা।

এরপর বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও আহ্বান সম্বলিত ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি প্রধান সড়কে বেরিয়ে পড়ে। র‌্যালিটি হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কর্মীদের শ্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে বাবুছড়া প্রধান সড়কের নুয়োপাড়ায় গিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।










সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments