""

সেনাবাহিনী ও জেএসএস মিলে ইউপিডিএফের সাংগঠনিক এলাকায় যৌথ সশস্ত্র তৎপরতা

সেনা সদস্যদের তৎপরতা। ছবিটি কাউখালী থেকে তোলা


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে ইউপিডিএফের সাংগঠনিক এলাকায় সেনাবাহিনী ও জেএসএস সন্তু গ্রুপের যৌথ সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ উঠছে।

গতকাল (৭ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে সেনাবাহিনীর একটি দল এবং জেএসএসর সন্তু গ্রুপের অপর একটি সশস্ত্র গ্রুপ রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়ন এলাকায় প্রবেশ করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। 

জানা যায়, নানিয়ারচর সেনা জোন থেকে ৬০ জনের একদল সেনা সদস্য গতকাল দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে কুদুকছড়ির বটতলী ও নারনছড়ার দুর্গম পাহাড় অতিক্রম করে কাউখালীর ঘাগড়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের উগলছড়ি গ্রামে সকাল ৭টার দিকে পৌঁছে।

সেখানে যাবার পথে তারা ৪ নং কুদুকছড়ি ইউনিয়নের বটতলী গ্রাম থেকে তিন গ্রামবাসীকে দরজায় লাথি মেরে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে গাইড হিসেবে ধরে নিয়ে যায়।

তারা হলেন- ১. রিকেন চাকমা, পিতা: করুণা কুমার চাকমা, ২. দয়াল চাকমা, পিতা: মদন কুমার চাকমা ও ৩. প্রতি মোহন চাকমা, পিতা: চন্দ্র কুমার চাকমা। তারা সবাই রাঙামাটি সদর উপজেলার বটতলী গ্রামের বাসিন্দা।

সেনা সদস্যরা সন্ত্রাসী ও অস্ত্র খোঁজার নামে উক্ত গ্রামের ৪টি বাড়িতে তল্লাশি চালালেও অবৈধ কোন কিছু উদ্ধার করতে পারেনি।

যাদের বাড়ি তল্লাশি করা হয়েছে তারা হলেন- কৃষ্ণ মোহন চাকমার ছেলে মঙ্গল মুনি চাকমা (৫২) ও বুদ্ধ চরণ চাকমা (৫০) এবং যত্ন কুমার চাকমার ছেলে শান্তি কুমার চাকমা ( ৬৫) ও ইন্দ্র কুমার চাকমা ( ৪২)। তারা সবাই কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

তল্লাশির সময় সেনারা ইউপিডিএফ সদস্যদের খোঁজ করে, তাদের চাঁদা দিতে হয় কিনা জিজ্ঞাসাবাদ করে। এছাড়া তারা পরিবারের সদস্যদের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে এবং তাদের কুঁড়ে ঘরগুলোর ছবি তুলে নিয়ে যায়।

অপরদিকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র দলটি ভোর ৪টার দিকে কাউখালীর ঘাগড়া ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের নোআদাম-বাকছড়ি এলাকায় প্রবেশ করে। তারা নোআদামে ৬০/৭০ জনের খানার অর্ডার দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে পরে জানা গেছে তাদের সংখ্যা মাত্র ২৬ জন।

ইউপিডিএফ অধ্যুষিত এলাকায় জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্রবেশে সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে তা স্পষ্ট হয়েছে।

যেমন- কাউখালীতে জেএসএস সন্ত্রাসীদের প্রবেশের পথ সুগম করতে গত ৩১ আগস্ট ফুরোমোন আর্মি ক্যাম্প হতে কছইছড়ি মোনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই রাত অবস্থান করে।

৩ সেপ্টেম্বর কাউখালী হতে একদল সেনা সদস্য পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে ২ রাত অবস্থান করে। পরে অবশ্য তারাও ক্যাম্পে ফিরে যায়।

এরপর ৪ সেপ্টেম্বর একদল সেনা ঘাগড়ার নোআদাম গ্রামে টহল দেয়।

এছাড়া গত ৬ সেপ্টেম্বর হারাঙ্গী মারমা পাড়া ও নীচপাড়ায় সেনারা রাতে অবস্থান করে।

সেনাদের কয়েক দিনের টহলের প্রেক্ষাপটে গতকাল দিবাগত রাতে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সন্ত্রাসীরা নোআদাম গ্রামে প্রবেশ করেছে।

তাদেরকে কাভার বা নিরাপত্তা দেয়ার জন্য ২নং ফটিকছড়ি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত নভাঙা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও গতকাল (৭ সেপ্টেম্বর) থেকে একদল সেনা সদস্য অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।

সাজেকেও সেনা-সন্তু গ্রুপের যৌথ তৎপরতা

গত এক সপ্তাহ ধরে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের বিভিন্ন এলাকায়ও সেনাবাহিনী ও জেএসএস সন্তু গ্রুপের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন অপকর্ম করে যাচ্ছে।

যেমন, গত ১ সেপ্টেম্বর জেএসএস সশস্ত্র সন্ত্রাসী শরীদ চাকমার নেতৃত্বে ৪২ জনের একটি টিম সাজেক ছয়নালছড়া হতে দুটো জীপ গাড়িতে করে ক্যাম্পের পাশ দিয়ে শিজকছড়া পর্যন্ত আসে। অথচ সেনা সদস্যরা তা দেখেও না দেখার ভান করে। তাদের নিজেদের মধ্যে বুঝাপড়ার কারণে তা সম্ভব হয়েছে।

ঐদিন সকাল ৬টায় ইউপিডিএফ নেতা কর্মীরা রাতযাপন করতে পারে এমন সন্দেহে  ব্রীজপাড়া গ্রামবাসী জ্ঞান শান্তি চাকমা, হুলোহাবা চাকমা, কৃষ্ণ চাকমা ও পলিন বিহারী চাকমার বাড়ি তল্লাশি চালানো হয়।

তারা ইউপিডিএফের নেতা কর্মীদের না পেয়ে ব্রীজপাড়া থেকে নোয়াপাড়া গ্রামে বুদ্ধ চাকমার বাড়িতে তল্লাশি করে।

সেখানেও কাউকে না পেয়ে তার ছেলে মিটন চাকমাকে ধরে নিয়ে যায়। ঘন্টাখানেক আটকে রাখার পর তাকে ছেড়ে দেয়।

সকাল ১০টার দিকে তারা মাচালঙ নোয়াপাড়া গ্রামে গিয়ে থেমে থেমে কয়েক রাউন্ড ব্রাশফায়ার করে এবং পরে  বিকাল ৩টার দিকে মাচালঙ ৬ নম্বর এলাকায় চলে যায়।

সেদিন তারা মাচালঙ ব্রীজ পাড়া এলাকায় স্থানীয় মুক্তিকামী জনতার ধাওয়া খেয়ে অভুক্ত অবস্থায় ৬নং পাড়ায় যায়। পরে সেনা সদস্যরা মিনা বাপের বাগানে তাদের জন্য ২ বস্তা খাদ্য সামগ্রী রেখে দিয়ে আসে।

অন্যদিকে, জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার চিনু মারমার নেতৃত্বে ৬ জনের একটি টিম গঙ্গারাম লক্ষীছড়ি সিদিজ্জ্যাছড়া এসে অফিস পাড়া, মগপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামে মুরব্বীদের ডেকে গণ চাঁদা দাবী করে। এরপর তারা উল্টাছড়ি দিকে চলে যায়।

গত ৩ সেপ্টেম্বর বেলা ১টার দিকে মাচালঙ ৬ নম্বর এলাকার স্থানীয়রা জানান, ডিঙি শাকখুলো চাকমার বাড়ির পূর্ব-দক্ষিণ সাইডে সেগুন বাগানে জেএসএসের সশস্ত্র সন্ত্রাসী এবং সেনা সদস্যরা পাশাপাশি অবস্থান করে।

গতকাল সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৩টার দিকে মাচালঙ শান্তিপাড়া গ্রামে সেনাবাহিনীর কর্তৃক বাড়ি ঘরে তল্লাশি করা হয়। পরে সোহেল চাকমা (২০) ও জিকো চাকমা (২২) নামে দুই যুবককে তারা মারধর ও নানান হয়রানি করে।

নির্যাতিতরা দীঘিনালা ৩নং কবাখালী ইউনিয়নের ৫ নং খালকুল পাড়া গ্রামের চিত্ত রঞ্জন চাকমা ও শান্তি বিকাশ চাকমার পুত্র বলে জানা যায়। তারা মাচালঙ পুকুর পাড় গ্রামে আত্মীয়ের বাড়ীতে বেড়াতে গিয়ে ফেরার পথে মাচালঙ ব্রীজের পাশে এ নির্মমতার শিকার হন।

তবে সেনারা বাবু চাকমার বাড়িতে তল্লাশি চালালেও অবৈধ কোন কিছু পায়নি। এরপর সেনারা আরো বেশ কয়েকজনের ঘর ঘেরাও করে তল্লাশির চেষ্টা চালায়। তবে স্থানীয় নারী সমাজের প্রবল আপত্তিতে তারা তল্লাশি করতে পারেনি।

এছাড়া, খাগড়াছড়ি জেলার ইউপিডিএফ অধ্যুষিত এলাকায়ও সেনাবাহিনী এবং জেএসএস সন্তু গ্রুপ গোপন বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।

গতকাল (৭ সেপ্টেম্বর) খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার উল্টাছড়ি ইউনিয়নে ইউপিডিএফ সদস্যদের খোঁজে সেনাবাহিনী ব্যাপক তল্লাশি চালায়। ভোর ৪টা থেকে সেনা সদস্যরা মরাটিলা, পদ্মনি পাড়া ও চিংসা পাড়া এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালায়। ইউপিডিএফ সদস্যদের খোঁজে সেনারা অন্তত ১৩ জন পাহাড়ির বাড়ি ঘেরাও-তল্লাশিসহ নানা জিজ্ঞাসাবাদ করে।

এভাবে একদিকে সেনা অভিযানের নামে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে তল্লাশি চালানো আর অন্যদিকে প্রকাশ্যে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র কার্যক্রমে সহযোগিতা- এ নিয়ে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments