লক্ষীছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়িতে এক বিশেষ নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত
হয়েছে। এতে লক্ষীছড়ি উপজেলা কমিটি ও আরো তিন ইউনিয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের কমিটি
গঠন করা হয়েছে।
আজ শনিবার (১০ অক্টোবর ২০২৬) সকাল ১০টায় বর্মাছড়ি বাজার এলাকায় সম্মেলন
আয়োজক কমিটির উদ্যোগে এই নারী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন এলাকা থেকে তিন
হাজারের মতো নারী অংশগ্রহণ করেন।
সম্মেলন শুরুতে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে আত্মবলিদানকারী শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে
১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
“আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় মুক্তি অসম্ভব” এই শ্লোগানে আয়োজিত
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি কণিকা দেওয়ান
ও সঞ্চালনা করেন সহ-সভাপতি রিনিসা চাকমা।
সম্মেলনে বক্তব্য দেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর
সংগঠক থুইক্যচিং মারমা, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি উষাতন চাকমা,
হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নীতি চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের খাগড়াছড়ি
জেলা সভাপতি ক্যামরন দেওয়ান ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের লক্ষীছড়ি উপজেলা সভাপতি প্রাচুর্য
চাকমা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রেশমি
মারমা।
বক্তারা বলেন, আজকের নারী সম্মেলন বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতিতে
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের
নারী সমাজসহ পাহাড়ি জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল আগের ফ্যাসিবাদী হাসিনার আমলের মতো নিপীড়ন-নির্যাতন
ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা আর সংঘটিত হবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের নারীরা নিরাপদে বসবাস
করতে পারবে, স্কুলে কলেজে যেতে পারবে, নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে।
কিন্তু তার পরিবর্তে আমরা দেখেছি আগের তুলনায় আরো বেশি নিপীড়ন-নির্যাতন,
সাধারণ গ্রামবাসীদের হয়রানি, রাতের আঁধারে ঘরবাড়ি তল্লাশি, ধরপাকড়সহ নারী ধর্ষণ-নিপীড়নের
ঘটনা ঘটছে। ফলে এখন পাহাড়ি জনগণ অনিরাপদ জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বক্তারা সম্প্রতি গত ৩ অক্টোবর বর্মাছড়ি ইউনিয়নেরর দেওয়ান পাড়া ও বৈদ্য পাড়ায় দুই সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর সেনাবাহিনীর নির্যাতন, হয়রানি ও এক অসুস্থ শিশুতে ওষুধ খাওয়াতে বাধা দেওয়ার ঘটনা তুলে ধরে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। একই সাথে গতকাল দিবাগত মধ্যরাতে রাঙামাটির সাজেকের উজোবাজারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী তিন জনের বাসা-বাড়ি ও দোকাান সেনা তল্লাশি-ভাংচুর ও হয়রানির ঘটনারও নিন্দা জানিয়েছেন।
বক্তারা বর্মাছড়ি নারীদের সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, সেনাবাহিনী বসন্ত
চাকমা ও বৃষ কুমার চাকমাকে আটক করে মুক্তছড়িতে নেওয়ার পর এখানকার নারীরা যেভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনীর
বন্দুকের নলকে ভয় না করে তাদের দু’জনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন তা প্রশংসনীয়। এ ঘটনা
পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের নারী সমাজের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বক্তারা নারী নির্যাতনসহ সকল ধরনের অন্যায় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে পার্বত্য
চট্টগ্রামে নারী সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সম্মেলন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কনিকা
দেওয়ান লক্ষীছড়ি উপজেলা প্রশাসনের কাছে চার দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো”
১. গণদুশমন, সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন মামলার আসামি উৎপল চাকমা এবং দুর্জয় চাকমা
গংদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর চাঁদাবাজি,
উৎপাত ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
২. এলাকায় সেনাবাহিনীর অপারেশন ও টহলের নামে নিরীহ জনগণের বাড়িতে তল্লাশি,
লুটপাট ও হয়রানি নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।
৩. গত ৩ অক্টোবর ২০২৬ বর্মাছড়ির দেওয়ানপাড়া ও বৈদ্যপাড়ায় বসন্ত চাকমা
ও বৃষ কুমার চাকমাকে নির্যাতন এবং অসুস্থ নাতিকে সেবা শুশ্রূষা করতে ও ওষুধ খাওয়াতে
বৃষ কুমার চাকমাকে বাধাদানের সাথে জড়িত সেনা মেজরকে শাস্তি দিতে হবে।
৪. সাধারণ খেটে খাওয়া জনগণকে নিজেদের লাগানো গাছ-বাঁশ বিক্রিতে বাধাপ্রদান
ও জব্দ করে তাদেরকে ভাতে মারার নীতি বন্ধ করতে হবে।
উক্ত চার দফা দাবি মেনে নেওয়া না হলে মিছিল-সমাবেশ, মানববন্ধন, রোডমার্চ,
অবস্থান ধর্মঘট, অবরোধ, বাজার বয়কটের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি
উচ্চারণ করেন।
সম্মেলনে লক্ষীছড়ি উপজেলা কমিটি ও আরো তিন ইউনিয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী
সংঘের কমিটি গঠন করা হয়।
এর মধ্যে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট লক্ষীছড়ি উপজেলা কমিটিতে জনিতা চাকমাকে সভাপতি,
অংক্রই মারমাকে সাধারণ সম্পাদক ও মেরিনা চাকমা সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
২৩ সদস্যের ১ নং লক্ষীছড়ি ইউনিয়ন কমিটিতে মেরিনা চাকমাকে সভাপতি, ত্রিশা
চাকমা সাধারণ সম্পাদক ও মেরিতা চাকমা সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
২ নং দুল্যাতলী ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হয় ২৭ সদস্য বিশিষ্ট এতে কমলা দেবী
চাকমা চাকমাকে সভাপতি, কনিকা চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক, সুজরিতা চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক
নির্বাচিত করা হয়।
আর ২৩ সদস্য বিশিষ্ট ৩নং বর্মাছড়ি ইউনিয়ন কমিটিতে সমিতা চাকমাকে সভাপতি,
প্রিয়াঙ্কা চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক ও সোনালিতা চাকমাকে সাংগঠনিক নির্বাচিত করা হয়েছে।
নবগঠিত উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটির সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান পার্বত্য চট্টগ্রাম
নারী সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি কনিকা দেওয়ান।
সম্মেলনে এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
![]() |
| সম্মেলনে গঠিত কমিটিগুলোকে শপথ বাক্য পাঠ করাচ্ছেন কণিকা দেওয়ান। |
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।





