কাউখালী প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ফটিকছড়ি, কলমপতি ও বেতবুনিয়া ইউনিয়নের ছাত্র-যুব
সমাজের মাঝে খেলার সামগ্রী বিতরণ করেছে ইউপিডিএফ কাউখালী ইউনিট।
আজ শনিবার (২০ ডিসেম্বর ২০২৫) দুপুর ১:০০টার সময় কলমপতি ইউনিয়নের কোলাপাড়া
এলাকায় এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফুটবল, ভলিবলসহ খেলার সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে ইউপিডিএফের সংগঠক অভি মারমার সভাপতিত্বে ও প্রতিম চাকমা সঞ্চালনায়
বক্তব্য রাখেন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রোনাল চাকমা, গণতান্ত্রিক
যুব ফোরামের কাউখালী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক নিবাইমং মারমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয়
সহসভাপতি থুইহলাপ্রু মারমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সাধারণ
সম্পাদক শামীন ত্রিপুরা, কলমপতি ইউপির ৬নং ওয়ার্ডের গ্রাম কমিটির সভাপতি অংশিথোয়াই
মারমা, ফটিকছড়ি ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার অংচাজাই মারমা, ডাবুয়া বাক্কুপাড়ার কার্বারি
হরিপ্রু মারমা ও কলমপতি দেবাপাড়া কার্বারি চাইনুপ্রু মারমা।
ছাত্রনেতা রোনাল চাকমা বলেন, কাউখালীতে আসা হলেও এই কলমপতি এলাকায় কোনদিন
আসা হয়নি। আজকে এই অনুষ্ঠানে এসে এখানকার যুব সমাজকে দেখে খুবই ভালো লাগছে।
তিনি বলেন, একটি সমাজ সুষ্ঠুভাবে গঠন করার জন্য আগে যুব সমাজকে পরিবর্তন
হতে হয়। যুব সমাজ সচেতন ও সুশৃঙ্খল হলে খুব সহজে সমাজের পরিবর্তন আনা যায়।
রোনাল চাকমা আরো বলেন, কাউখালী ঘাগড়া থেকে ঋতুপর্ণা চাকমা বাংলাদেশের নারী
ফুটবল টিমের হয়ে দেশে ও দেশের বাইরে সুনাম অর্জন করছে। নারীরা পারলে ছেলেরা কেন পারবে
না। ছাত্র সমাজ ও যুব সমাজকেও নিজেদেরকে এগিয়ে নেয়ার চিন্তা
করতে হবে। মাদকের ছোবল থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হবে।
তিনি বলেন, ৫২’র ভাষা আন্দোলনে নিজের মাতৃভাষার জন্য তখনকার ছাত্র, যুবকরা
আন্দোলন করেছিল। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানেও ছাত্র-তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। পার্বত্য
চট্টগ্রামেও ছাত্র-যুব সমাজকে জাতির অস্তিত্ব রক্ষা তথা অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ
করতে হবে।
কলমপতি গণহত্যার কথা তুলে ধরে রোনাল চাকমা বলেন, ’৮০ সালের ২৫শে মার্চ এই
কলমপতিতে পাহাড়িদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছিল। আমাদের সবসময় এই গণহত্যার কথা স্মরণ
করে নিজেদেরকে সুসংগঠিত রাখতে হবে। তিনি বলেন, শুধু কলমপতি নয়, লংগদু, লোগাং, নান্যাচরসহ
পার্বত্য চট্টগ্রামে আরো বহু গণহত্যা সংঘটিত করা হয়েছে। সেনাবাহিনী এখন মদ, গাঁজা,
ইয়াবায় আসক্ত করে ছাত্র-যুব সমাজকে ধ্বংসের কৌশল প্রয়োগ করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন
এবং বলেন, আমাদের ছাত্র-যুব সমাজকে এর থেকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তার নাম দিয়ে সেনাবাহিনী পাহাড়ি
জনগণের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়িদের অধিকারহীন করে রাখতে তারা ন্যায্য
আন্দোলন করতেও বাধাগ্রস্ত করছে। আমাদের স্বাধীনতা নেই বলেই, সেনাবাহিনী এখন আমাদের
ওপর খবরদারি করছে, কোথাও ঘুরতে গেলে সেনাবাহিনী
আমাদের পরিচয় জানতে চায়, বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করে। বান্দরবানের দিকে তাকালে আমরা দেখতে
পাই সেখানে পাহাড়িদের রাজনৈতিক অসচেতনতার সুযোগে নানা প্রলোভনে ফেলে ছোট ছোট পাহাড়ি
শিশুদের মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। তিনি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে জাতির স্বার্থে
লড়াই-সংগ্রামে সামিল হওয়ার জন্য ছাত্র-যুব সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।
যুবনেতা নিবাইমং মারমা বলেন, বর্তমানে সমাজে কিছু বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক অবক্ষয়
দেখা যাচ্ছে। যুব সমাজ নেশায় আসক্ত থাকার কারণে এমন ঘটছে। তাই যুব সমাজকে সচেতন ও পরিবর্তন
হতে হবে।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজমান সেদিকে
যুব সমাজের নজর নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত যে দমন-পীড়ন, নারী নির্যাতন, ভূমি
বেদখলের ঘটনা ঘটছে তার বিরুদ্ধে ছাত্র-যুব-নারী সমাজকে রুখে দাঁড়াতে হবে, প্রতিবাদ
করতে হবে।
ছাত্রনেতা থুইহ্লা মারমা বলেন, আমাদের ছাত্র যুব সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন
হয়ে সমাজকে পরিবর্তন করতে হবে। যুব সমাজ সুশৃঙ্খল হলে সমাজের মধ্যে পরিবর্তন আসবে।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান সমস্যা হল ভূমি সমস্যা। প্রতিনিয়ত
আমাদের ভূমি বেদখল করা হচ্ছে। সাজেকের মতো জায়গায় বিলাস বহুল মসজিদ বানানো হয়েছে। কাজেই,
ছাত্র-যুব সমাজকে অবশ্যই রাজনৈতিকভাব সচেতন হয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে হবে।
অংশিথোয়াই মারমা তার বক্তব্যে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস হচ্ছে
খুবই বেদনাদায়ক। বর্তমান সময় হচ্ছে ছাত্র-যুব সমাজের পরিবর্তিত হওয়ার সময়। যুব সমাজকে
মাদকের ছোবল থেকে মুক্ত থাকার জন্য খেলাধুলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
ছাত্রনেতা শামীন ত্রিপুরা বলেন, ছাত্র-যুবকরা হচ্ছে জাতির কাণ্ডারি। তারা
যদি মাদকের কবলে পড়ে থাকে তাহলে জাতির মুক্তি আসবে না। তাই ছাত্র-যুব সমাজকে মাদক থেকে
মুক্ত থাকতে হবে।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদেরকে পরাধীন করে রাখা হয়েছে। আমরা স্বাধীনভাবে
চলাফেরা করতে পারি না। শাসকগোষ্ঠি বরাবরই আমাদেরকে মাদকে আসক্ত রেখে শিকলে বন্দি করে
রাখতে চায়। তারা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে বাধা দেয়। কয়েকদিন আগে আমরা দেখেছি, সাজেকে
জনগণের উদ্যোগে নির্মিত একটি স্কুল সেনাবাহিনী ভেঙে দিয়েছে। আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত নিরাপদ রাখতে পারছি
না। আর নারীদের তো কোন নিরাপত্তাই নেই। কাজেই, ছাত্র, যুব সমাজকে শাসকগোষ্ঠির পাতানো
ফাঁদ মাদক থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হবে এবং দমন-পীড়ন, নারী নির্যাতন, ভূমি বেদখলের
বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সামিল হতে হবে।
অংচাজাই মারমা বলেন, আজকে ইউপিডিএফের এই ভলিবল, ফুটবল বিতরণ একটি ভালো উদ্যোগ।
আমাদের ছাত্র-যুব সমাজকে মাদকের কবল থেকে মুক্ত হয়ে খেলাধুলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
নতুন প্রজন্মকে সঠিক দিশা দেয়ার জন্য বর্তমান ছাত্র-যুব সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন
হতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউপিডিএফ ছাড়া অন্যয়ের বিরুদ্ধে কোন কেউ প্রতিবাদ করে
না মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, সবাইকে ইউপিডিএফের পতাকাতলে সমবেত হয়ে অন্যায়ড়-অবিচার,
নারী নির্যাতন ভূমি বেদখলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা মনে করেছি চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে পার্বত্য
চট্টগ্রামসহ দেশে একটা পরিবর্তন আসবে। কিন্তু দেখা গেল অভ্যুত্থানের পর থেকে নিপীড়ন-নির্যাতন
আরো দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ছাত্র-যুব-নারী সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে
প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করতে হবে। কারণ, যে জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে জানে,
সে জাতি অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে।
হরিপ্রু মারমা বলেন, ’৮০ দশকে কলমপতি গণহত্যার মধ্যে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে
পাহাড়িদের উপর দমন-পীড়ন, ভূমি বেদখল বৃদ্ধি পেয়েছে। অতীতের ঘটনাবলী থেকে আমাদের ছাত্র-যুব
সমাজকে শিক্ষা নিতে হবে। ছাত্র সমাজকে নেশা বাদ দিয়ে শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
কারণ শিক্ষা হচ্ছে আলো। শিক্ষা ছাড়া কোনো বিকল্প পথ নেই।
কার্বারি চাইনুপ্রু মারমা ছাত্র, যুব সমাজ থেকে শুরু করে সমাজের ময়-মুরুব্বীদেরও
পরির্বতন ও সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি যুব সমাজের মধ্যে মাদকের ব্যবহার বৃদ্ধিতে
উদ্বেগ প্রকাশ করেন তা থেকে উত্তরণের আহ্বান জানান।
পরে তিন ইউনিয়নের আওতাধীন বিভিন্ন গ্রামের ছাত্র-যুবকদের মাঝে ভলিবল, ফুটবলসহ
খেলার সামগ্রী প্রদান করা হয়।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







