![]() |
| শান্তিবাহিনী সদস্য। সংগৃহিত ছবি |
লেখা: CHT Voice এডমিন
কয়েকদিন আগে পাচগলার (পার্বত্য চট্টগ্রামের গণলাইন) পক্ষ থেকে জেএসএস-শান্তিবাহিনীর
পরিচালিত সশস্ত্র সংগ্রামের ওপর ইউপিডিএফ নেতা মিল্টন চাকমার বিশ্লেষণমূলক লেখাটির
(কেমন ছিল শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রাম?) সমালোচনা করা হয়েছে। ইতিহাসের কোন অংশের
বা কোন ঘটনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিয়ে সবাই একমত হবেন এমন কোন কারণ নেই। তবে মিল্টন
চাকমার বিশ্লেষণকে এক বাক্যে “বিভাজনমূলক প্রপাগান্ডা এবং রাষ্ট্রয় দমননীতির ভাষ্য
পুনরুৎপাদন” বলে খারিজ করতে চাওয়ার মধ্যে ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ও ভুল স্বীকার
করার সৎসাহসের ঘাটতি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
১) গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া:
মিল্টন চাকমা দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করেছেন যে, শান্তিবাহিনী প্রথমদিকে
অর্থাৎ অবিভক্ত জেএসএসের সময়কালে বেশ সামরিক সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। শান্তিবাহিনীর
যোদ্ধারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ও টহল দলের ওপর আক্রমণ চালিয়ে অনেক শত্রুসৈন্যকে
হতাহত ও অস্ত্র-গোলাবারুদ দখল করেছিল। প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিকের
Insurgent Crossfire বইয়েও এই বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়।
শান্তিবাহিনীর এই অগ্রগতি তখনই থমকে যায় যখন গেরিলা-হামলায় পর্যুদস্ত বাংলাদেশ
সরকার সন্তু লারমাকে জেল থেকে মুক্তি দেয় এবং সন্তু লারমা ছাড়া পাওয়ার পরই সেটলার ও
সেনাবাহিনীর ওপর প্রতিরোধাত্মক গেরিলা হামলা বন্ধের নির্দেশ দেন। বলা বাহুল্য, তার
এই নির্দেশ ছিল সম্পূর্ণ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এবং জুম্মদের স্বার্থের বিরুদ্ধে।
সন্তু লারমা কেন উক্ত হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন মিল্টন চাকমা সেই প্রশ্ন তুলেছেন।
কিন্তু জেএসএস সন্তু গ্রুপের ফেসবুক মুখপাত্র পাচগলা এই প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন।
অথচ এটি ছিল সন্তু লারমার এমন একটি বিতর্কিত নির্দেশ যা পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনের
ইতিহাসের ধারায় বড় আকারে বাঁক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কারণ পেছনে ফিরে তাকালে স্পষ্ট দেখা
যায়, সন্তু লারমা যদি সেদিন সেটলার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শান্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের সশস্ত্র
প্রতিরোধ সংগ্রাম বন্ধ করার নির্দেশ না দিতেন এবং গেরিলারা যদি অব্যাহতভাবে প্রতিরোধ
হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম হতেন, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের চেহারা আজকের মতো হতো না
এবং সেটলারদের জনসংখ্যার বিষ্ফোরণও আজকের মতো ঘটতে পারত না। ইতিহাসের এই দায় থেকে সন্তু
লারমা কীভাবে মুক্তি পাবেন?
কেউ করুণা বশত: বিনা শর্তে নিজের শত্রুকে মুক্তি দেয় না। বিশেষত যখন আপনার
শত্রু বাহিনী আপনাকে আক্রমণ করে নাস্তানাবুদ করছে, তখনতো সেটা কল্পনাও করা যায় না।
জিয়াউর রহমানও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ করেই সন্তু লারমাকে মুক্তি দেয়ার বাজি
ধরেছিলেন। এ প্রসঙ্গে সুবীর ভৌমিকের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি তার উপরোল্লেখিত
বইয়ে লেখেন: This was (অর্থাৎ সন্তু লারমাকে মুক্তি দেয়া – পোস্ট লেখক) not just a
conciliatory gesture; Zia had clearly calculated the confusion that Larma’s
return would cause in the organiazation, where an alternative leadership had
slowly emerged after his arrest more than four years previously. His gamble
paid off handsomely. (Subir Bhaumik, Insurgent Crossifre) অর্থাৎ জিয়া সন্তু লারমাকে
মুক্তি দেয়ার বাজি ধরে জিতেছিলেন।
২) সন্তু লারমার স্বেচ্ছাচারী নির্দেশই বিভেদের বীজ
যদি কৌশলগত কারণে সাময়িকভাবে হামলা বন্ধের নির্দেশ দিতেই হয়, তাহলে সেই
নির্দেশের সিদ্ধান্ত পার্টির মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হবে – এটাই স্বাভাবিক
গণতান্ত্রিক পদ্ধতি? কিন্তু সেই পদ্ধতি সন্তু লারমা মানেননি। অধিকন্তু পাঁচ বছর জেলে
থাকার সময় আন্দোলনের মাঠে যে অনেক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত জানা
সন্তু লারমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। অথচ তারপরও মাঠের অবস্থা আগে না জেনে, কেন্দ্রীয়
নেতাদের সাথে কোন আলোচনা না করে তিনি এককভাবে হামলা বন্ধের নির্দেশ দেন। এই ধরনের অগণতান্ত্রিক,
একনায়কসূলভ, স্বেচ্ছাচারী ও ফ্যাসিস্ট আচরণ দলের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য ও সংঘাতের জন্ম
না দিয়ে পারে না। এবং জেএসএসে সেটাই হয়েছে। আর দলের ভাঙন সমাজের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
অর্থাৎ সমাজ-জাতিও বিভক্ত হয়ে যায়।
কাজেই এটা একেবারে অনস্বীকার্য যে, সন্তু লারমা জেল থেকে মুক্তি পেয়ে শান্তিবাহিনীর
দায়িত্ব নেয়ার পরই জেএসএসে, শান্তিবাহিনীতে ও আন্দোলনে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল।
একদিকে পার্টিতে ভাঙন দেখা দেয়, গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, এমএন লারমা প্রাণ হারান এবং জুম্ম
জনগণের প্রতিরোধ হীনবল হয়ে পড়ে। অপরদিকে সেটলারদের ওপর হামলা বন্ধ হয়, সরকার গৃহযুদ্ধের
সুযোগে সেটলারদের পুনর্বাসন কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয় এবং সেনাবাহিনীও
তাদের শক্তি ও অবস্থান সংহত করে নেয়।
সন্তু লারমার এই একনায়কসুলভ নেতৃত্ব দেখে এক ভারতীয় সাংবাদিক তাকে একজন
divisive figure বলে মন্তব্য করেছিলেন। জেএসএসের নেতা তাতিন্দ্র লাল চাকমার একটি লেখার
মধ্যেও উক্ত সাংবাদিকের মন্তব্যের পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায়। তাতিন্দ্র বাবু লেখেন:
”এমএন লারমার প্রদর্শিত প্রগতিশীল চিন্তাধারা থেকে বিচ্যুত এই নেতৃত্ব (অর্থাৎ সন্তু
লারমা) বিগত ২৯ বছরে যা করেছে তা হচ্ছে – এক সময়ে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃত্ব যা
ছিল পার্টির দীর্ঘ পরিশ্রমের ফল – সেই নেতৃত্বকে কাছে টানার বদলে দূরে সরিয়ে দিয়ে এমনকি
নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা না করে সরাসরি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যার ফলে আত্মরক্ষার
তাগিদে এই নেতৃত্ব ইউপিডিএফ নামে আত্মপ্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে।” (এমএন লারমা ও তাঁর
উত্তরসুরীদের বর্তমান অবস্থা, প্রবাহণ) জেএসএস সন্তু গ্রুপের মধ্যে এই একনায়কতন্ত্র
এখন আরও বেশি শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য।
৩) সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর অবক্ষয়ের ব্যাখ্যা নেই
মিল্টন চাকমা ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরকে
শান্তিবাহিনীর দ্বিতীয় দফা সশস্ত্র সংগ্রামের কাল বলে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে
এই সময়ে শান্তিবাহিনী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ
হয়েছে। কিন্তু লাম্বা-বাদি গৃহযুদ্ধ শেষে সন্তু লারমার নেতৃত্বে জনসংহতি সমিতি আন্দোলনে
একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেও কেন এ সময় কোন উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্য
অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে তার কোন ব্যাখ্যা আমরা পাচগলার লেখায় পাইনি।
তবে জেএসএস সন্তু গ্রুপের মুখপাত্রের লেখায় এই ব্যাখ্যা না পেলেও আমরা তাতিন্দ্র
লাল চাকমার লেখায় সেটা খুঁজে পেয়েছি। উপরোল্লেখিত প্রবন্ধে তিনি লেখেন: ”এমএন লারমার
মৃত্যুর পরপরই তাঁর প্রধান উত্তরাধিকারী (অর্থাৎ সন্তু লারমা) শান্তিবাহিনীর প্রতিটি
ইউনিট থেকে পলিটিক্যাল সেক্রেটারীর পদটি লুপ্ত করে দেন এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারার প্রচার
ও প্রসারের দায়িত্বে নিয়োজিত আঞ্চলিক কমিটি বিলুপ্ত করেন। তারপর থেকে শান্তিবাহিনীর
মধ্যেকার জঙ্গী চেতনা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। এর পরের ঘটনা আরো ভয়াবহ। এমএন লারমার
উত্তরসুরীরা বিপ্লবী কর্মনীতি সঠিকভাবে প্রয়োগ না করে ভ্রান্ত কর্মনীতি প্রয়োগ করতে
শুরু করেন। তখন সমগ্র শান্তিবাহিনীতে পুনর্গঠনের নামে যোগ্যতার ভিত্তিতে কমান্ডার,
পরিচালক নিয়োগ না করে আনুগত্যের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। কিছু দিনের মধ্যে প্রমাণিত
হতে থাকে এই আনুগত্য স্রেফ ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং স্বজন পোষণের আনুগত্য। ফলে দেখা গেছে
যারা কখনও কোন যুদ্ধে যায়নি বা যুদ্ধ করার কথাও যারা ভাবেনি তাদেরকেই শান্তিবাহিনীতে
উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। এতদিন যারা বেসামরিক বিভাগে কাজ করতো হঠাৎ করে তাদেরকে
কোম্পানী কমান্ডার, সেক্টর কমান্ডার ও কমান্ড পোস্ট কমান্ডার এর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ফলে শত্রুর দ্বারা নয় বরঞ্চ নেতৃত্বের দ্বারাই শান্তিবাহিনীর জঙ্গিত্ব পঙ্গুত্ব বরণ
করতে শুরু করে।”
উদ্ধৃতি দীর্ঘ হলেও দ্বিতীয় পর্বে শান্তিবাহিনীর ব্যর্থতার কারণ বুঝতে তাতিন্দ্র
লাল চাকমার এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিবাহিনীর অনেক সাধারণ কমান্ডার
ও যোদ্ধার সাহস, ত্যাগ-তিতিক্ষ্যা ও আত্মবলীদান কোনদিনই অস্বীকার করা যাবে না। শান্তিবাহিনীর
ব্যর্থতার দায় তাদের নয়, দায় মূল নেতৃত্বের। যেখানে কাউকে কোন সামরিক ইউনিটের কমান্ডার
হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার মানদণ্ড হিসেবে তার মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য না দিয়ে তার ব্যক্তিগত
আনুগত্যকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়, সেখানে কীভাবে সেই সামরিক ইউনিটটি ঠিকভাবে
পরিচালিত হবে ও সাফল্য অর্জন করবে? একসময়কার “জঙ্গী” শান্তিবাহিনীকে এভাবেই সন্তু লারমা
তার প্রাইভেট বাহিনীতে পরিণত করে “পঙ্গু” করে ফেলেছিলেন। পঙ্গু ব্যক্তি যেমন হেঁটে
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে না, তেমনি সন্তু লারমার নেতৃত্বে পঙ্গু শান্তিবাহিনীও দীর্ঘ
আন্দোলন চালিয়ে নিতে সক্ষম হয়নি, রণক্লান্ত হয়ে সরকারের কাছে সারেন্ডার করতে বাধ্য
হয়েছে।
৪) Low intensity warfare নয়, তাহলে কী?
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে প্রায় সকল গবেষক ও অন্যরা সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন
জেএসএসের সশস্ত্র সংগ্রামের মাত্রাকে লো ইনটেনসিটি ওয়ারফেয়ার বলে চিহ্নিত করলেও, পাচগলা
সেটা স্বীকার করতে নারাজ। আমরা পাচগলার ভুল ধারণা দূর করে দেয়ার জন্য এখানে দুএকজন
লেখকের নাম উদ্ধৃত করতে চাই। অনুরাগ চাকমা ও Haseeb MD. Irfanullah উভয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের
সশস্ত্র সংগ্রামকে low intensity armed conflict বলে বর্ণনা করেছেন। (https://www.tandfonline.com/.../10.1080/00207233.2012.695919)
অপরদিকে IWGIA-এর রিপোর্টে একে a decades-long low intensity guerrilla war বলে অভিহিত
করা হয়েছে। আপনারা যে কেউ ইন্টারনেট সার্চ করলে আরও অনেক রেফারেন্সে পাবেন। রেফারেন্সের
জন্য চ্যাটজিপিটিরও আশ্রয় নিতে পারেন। তার চেয়েও বড় কথা হলো সামান্য কান্ডজ্ঞান থাকলেই
বোঝা যাবে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগ্রামটি হাই বা মিডিয়াম ইনটেনসিটির ছিল
না। বর্তমানে মায়ানমারে আরাকান আর্মি যে মাত্রায় যুদ্ধ করছে, তার ধারে কাছেও সন্তু
লারমার নেতৃত্বে পরিচালিত শান্তিবাহিনী যেতে পারেনি। শুধু তাই নয়, অবিভক্ত জেএসএসের
সময় শান্তিবাহিনী যে পরিমাণ সাফল্য অর্জিত হয়েছিল, সন্তু লারমার শান্তিবাহিনী ততটুকুও
অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। বান্দরবানেতো তার সময়ে কোন সামরিক কার্যক্রম ছিল না বলেই
চলে। অথচ অবিভক্ত জেএসএসের সময় শান্তিবাহিনীর যোদ্ধারা চট্টগ্রামের দুলাহাজারা পর্যন্ত
বিচরণ করত। শঙ্খ নদীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা বহু বার শান্তিবাহিনীর আক্রমণের
শিকার হয়েছিল। সাবেক সেনা সেনাপ্রধান সে সময় বান্দরবানে সেনা অফিসার হিসেবে দায়িত্ব
পালন করতেন। তিনি তার শান্তির স্বপ্নে: সময়ের স্মৃতিচারণ নামক বইয়ে ”ইজ্জতের বাঁশ”
বলে যা উল্লেখ করেছেন তা থেকে সহজে ধারণা করা যায়, কীভাবে তারা শান্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের
হাতে নাস্তানাবুদ হয়েছিলেন।
৫) অতীতের ব্যর্থতা: বিশ্লেষণ-শিক্ষা, না ঢেকে রাখা?
পাচগলার অভিযোগ লো ইনটেনসিটি ওয়ারফেয়ার বলে মিল্টন চাকমা জুম্ম জনগণের প্রতিরোধ
সংগ্রামকে হেয় করার চেষ্টা করেছেন। মিল্টন চাকমা আন্দোলনকে হেয় করতে নয়, কেন সন্তু
লারমার নেতৃত্বে একসময়কার শক্তিশালী সংগঠন শান্তিবাহিনী সঠিকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা
করতে ব্যর্থ হয়েছে তারই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। ভবিষ্যত আন্দোলনের জন্য এসব বিষয়
জানা আমাদের অবশ্যই জরুরী। আমরা যদি আমাদের ব্যর্থতাগুলো ঢেকে রাখি, সেগুলো সঠিকভাবে
বিশ্লেষণ না করি ও তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে কৃপনতা প্রকাশ করি, তাহলে আমরা জাতি
হিসেবে কি সামনে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো? যে নিজের ভুল স্বীকার করে না তার মধ্যে বিপ্লবী
আদর্শ ও গুণাবলী নেই। আর যে বিপ্লবী নয়, সে কখনই আন্দোলনে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারবে
না। আমরা চাই আমাদের অতীত আন্দোলনের ভুলগুলো সম্পর্কে আলোচনা হোক, যাতে আমরা তার থেকে
শিক্ষা নিতে পারি।
৬) বৈঠকে বসতে বাধ্য করা: শান্তিবাহিনীর একমাত্র সাফল্য!
পাচগলা প্রশ্ন করেছেন, “যে সংগ্রাম রাষ্ট্রকে সংলাপে বসতে বাধ্য করেছে এবং
পার্বত্য চুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে, তা কীভাবে ব্যর্থ হয়?” আপনি দেখছি অনেক কষ্ট করে
খোঁজাখঁজি করে অবশেষে বলছেন: পেয়েছি, রাষ্ট্রকে সংলাপে বসতে বাধ্য করা তো বিরাট সাফল্য!
আপনার এই যুক্তি দেখে কাঁদবো না হাসবো বুঝে উঠিতে পারাছি না। যাদের সামান্যতম
রাজনৈতিক জ্ঞান আছে তারা জানেন, সরকার বা রাষ্ট্র বিদ্রোহীদের সাথে সংলাপে বসে বা পাচগলার
ভাষায় বসতে বাধ্য হয় সামগ্রিক কৌশলের অংশ হিসেবে। সেই সামগ্রিক কৌশল হলো বিদ্রোহীদের
পরাজিত করতে তাদের বিরুদ্ধে একইসাথে বা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে সামরিক, রাজনৈতিক,
মনস্তাত্বিক ও কূটনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনা করা। অথচ আমাদের পাচগলারা রাষ্ট্রের সেই কৌশলকে
নিজেদের বিরাট সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। এই যদি তাদের রাজনৈতিক জ্ঞানের পরিধি হয়ে থাকে,
তাহলে শান্তিবাহিনীকে তারা পঙ্গু করবে না তো কী করবে! যদি সেটা সাফল্য হয়েই থাকে, তাহলেই
সেই সাফল্য এত বড় কিছু হতে পারে না। কেএনএফ-ও দু’একটি ব্যাংক ডাকাতি করে ইতিমধ্যে রাষ্ট্রকে
তাদের সাথে সংলাপে বসতে বাধ্য করে বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে। যে সাফল্য অর্জন করতে
সন্তু বাবুদের ১০ বছর লেগেছে, সেই একই সাফল্য অর্জন করতে কেএনএফের দুই বছরও লাগেনি।
৭) আরও দু’টি ব্যর্থতা
সন্তু লারমা শান্তিবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর এই গেরিলা বাহিনীটি উল্লেখযোগ্য
কোন সামরিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এর কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মিল্টন চাকমা তার
লেখায় শান্তিবাহিনীর সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার দিকগুলোকে তুলে ধরেছেন। এখানে আমরা
আরও দু’একটি ব্যর্থতা উল্লেখ করছি।
ক) ১৯৮৯ সালের ২৫ জুন এরশাদ সরকার তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের
নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিলে জেএসএস তা সামরিকভাবে বানচালের ঘোষণা দেয়। এ নিয়ে তারা
জনগণের সামনে অনেক বড় বড় হুংকার দেয়। কিন্তু শেষে দেখা গেল গর্জন হয়েছে, বর্ষণ হয়নি।
শান্তিবাহিনী সামরিকভাবে কোন “ঘটনা-ই” ঘটাতে পারেনি। এই ব্যর্থতার পর শান্তিবাহিনীর
মধ্যে গভীর হতাশা সৃষ্টি হয় এবং তাদের অনেক সদস্য নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এমনকি সেনাবাহিনীর
কাছে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পন ঠেকানো এক কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
খ) সন্তু লারমার শান্তিবাহিনীর অন্য একটি ব্যর্থতা হলো ম্রোদের মতো অধিকতর
সংখ্যালঘু ও পশ্চাদপদ জাতিগুলোকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত না করে বরং তাদের সাথে শত্রুতা
তৈরি করা। জেএসএসের নেতৃত্বের ভুলের কারণে ম্রোরা ১৯৮০ দশকে শান্তিবাহিনীর বিপক্ষে
চলে যায় এবং ম্রো বাহিনী গঠন করে। রাজনৈতিকভাবে পেছনে থাকা জনগোষ্ঠীকে আন্দোলনে নিয়ে
আসার জন্য নেতৃত্বের মধ্যে যে ধরনের ধৈয, সহনশীলতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রয়োজন হয়,
তা জেএসএসের মধ্যে ভয়ানকভাবে অনুপস্থিত ছিল। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে পার্বত্য
চট্টগ্রাম কমিশনের রিপোর্ট লাইফ ইজ নট আওয়ার্স এর চতুর্থ আপডেট দেখুন। বলে রাখা ভাল,
ম্রোরা সে সময় শিক্ষাদীক্ষায় আজকের চাইতে অনেক পশ্চাদপদ হলেও তারা বান্দরবানে পাহাড়ি
জাতিগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ, অর্থাৎ মারমাদের পরেই তাদের অবস্থান। আর তারা
শিক্ষায় অগ্রসর না হলেও, আন্দোলনের প্রথমদিকে শান্তিবাহিনীকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু
গৃহযুদ্ধ পরবর্তী জেএসএস নেতৃত্বের ভুলের কারণে শান্তিবাহিনী তাদের সেই গুরুত্বপূর্ণ
সমর্থন ধরে রাখতে পারেনি। যখন আপনার নিজের জনগণের এক বিরাট অংশ আপনার বিপক্ষে শত্রুর
শিবিরে চলে যায়, তখন আপনি কীভাবে জয়লাভের আশা করতে পারেন। বলা হয় গেরিলারা মাছ, জনগণ
পানি। আপনি যদি আপনার সেই পানি নিজেই ড্রেন করে শত্রুর জমিতে নিয়ে যান, আপনি বাঁচবেন
কী করে? সারেন্ডার করা ছাড়া উপায় থাকে কি? জেএসএস – শান্তিবাহিনীর মধ্যে এই দুর্বলতাগুলো
কি কখনও আলোচনা-বিশ্লেষণ হয়েছে? শিক্ষা নেয়া হয়েছে? ভুলের সংশোধন করা হয়েছে? যে ম্রো
জনগোষ্ঠীর ওপর অন্যায় করা হয়েছে, তাদের কাছে কি ক্ষমা চাওয়া হয়েছে?
মোট কথা, শান্তিবাহিনীর ব্যর্থতা ও অস্ত্রসমর্পন বা আত্মসমর্পন অনিবার্য
ছিল এবং সেই অনিবার্যতা শান্তিবাহিনীর সাধারণ কমান্ডার ও যোদ্ধাদের কারণে নয়, বরং তা
নেতৃত্বের মৌলিক দুর্বলতার কারণে। অথচ পাচগলারা এই দুর্বলতা-ব্যর্থতাগুলোর আলোচনা
ও বিশ্লেষণ করতে একেবারে নারাজ। শুধু তাই নয়, যারা সেগুলো সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা
করে শিক্ষা নিতে চান তাদেরকেও তারা নিরুৎসাহিত করেন। (২১ জানুয়ারি ২০২৬)
* মূল লেখার লিঙ্ক এখানে।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
