ঢাকা প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন
করবেন তাদের উদ্দেশ্যে “জনগণের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের
ইশতেহার” নামে ২৫ দফার একটি ইশতেহার প্রকাশ করেছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
বুধবার (২১ জানুয়ারি ২০২৬) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের
আকরাম খা হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ইশতেহার প্রকাশ করা হয়।
ইশতেহারটি পাঠ করেন- গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি সদস্য চলচ্চিত্র
নির্মাতা খান, লেখক ও গবেষক মাহতাব উদ্দীন আহমেদ এবং গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্ট সুস্মিতা পৃথা।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন গণতান্ত্রিক
অধিকার কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যায়ের সাবেক অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ।
এতে আরও উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ডা. হারুন-অর-রশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের
শিক্ষক অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, নারীনেত্রী সীমা দত্ত প্রমুখ।
সভাপ্রধানের বক্তব্যে আনু মুহাম্মদ বলেন, “আমাদের জীবনে শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তার
বড়ই অভাব এখন। আমরা এখানে জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-বিশ্বাস-শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে মানুষের
জীবনের শান্তি-স্বস্তি নিরাপত্তার সংকটগুলোকে এখানে চিহ্নিত করতে চেষ্টা করেছি। আমরা
আশা করি সামনের নির্বাচনে যারাই নির্বাচিত হবেন তারা এবং রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারটিকে
গুরুত্বের সাথে নেবেন। আমরা চাই সরকারের সকল কাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি।”
ইশতেহারের ভূমিকায় বলা হয়, “ধরে নেয়া হয় যে রাজনৈতিক দলগুলোই
কেবল ইশতেহার দিবে, সর্বত্রই আমরা দেখতে পাই জনগণের যে এজেন্সি, জনগণের যে সার্বভৌমত্ব
সেটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। এই চর্চা আমরা জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের কাজের মধ্যেও
দেখতে পেয়েছি। সরকার মনোযোগ দিয়ে আলাপ শুনল কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর, সাধারণ মানুষের
মতামত শোনার কোন কার্যকর ব্যবস্থাই ছিল না। অবস্থাটা এমন যেন সাধারণ মানুষের সংস্কার
বিষয়ে, দেশ পরিচালনা বিষয়ে কোন বক্তব্য থাকতে পারে না! তাদের কাজ কেবল রাজনৈতিক দলগুলোকে
অনুসরণ করা! অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এদেশের মানুষ কেবল আওয়ামী লীগ সরকারকেই উচ্ছেদ
করেনি, তাদের মনোজগতে পুরনো ধাঁচের রাজনীতির উচ্ছেদের আকাঙ্ক্ষাও ছিল।”
এতে বলা হয়, “...আমরা মনে করি ইশতেহার তৈরিতে জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ থাকতে হবে। আর এ কারণেই কোনো রাজনৈতিক দল না হওয়া সত্ত্বেও নিছক গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য নাগরিকদের একটি প্লাটফর্ম হিসেবে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির পক্ষ থেকে আমরা জনগণের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ইশতেহার তুলে ধরছি।’
২৫ দফার ইশতেহারে রয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ সকল গণঅভ্যুত্থান
ও মুক্তিযুদ্ধকে জনগণের দখলে ফেরত আনা; জননিরাপত্তা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি
এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান; নির্বাচনে দাঁড়ানো, প্রচার বৈষম্য দূরীকরণ ও প্রার্থকে
পছন্দ না করার গণতান্ত্রিক অধিকার; বাজেটের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায্যতা; অর্থনীতির
নিরাপত্তা; সমম্বিত প্যাকেজে কৃষক, পোল্ট্রি খামারি, মৎস্যচাষী ও জেলে এবং ভোক্তাদের
শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতির মেরুদণ্ড
জোরদারকরণ; প্রাতিষ্ঠানিক খাটের শ্রমিক ও কর্মজীবীদের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও
গণতান্ত্রিক অধিকার; অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা; ফ্রিল্যান্সারদের
ন্যূনতম নিরাপত্তা; প্রবাসী শ্রমিকদের ন্যূনতম শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা; দেশীয় শিল্পভিত্তি
ও ব্যবসায়ী এবং হকার, টং দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা; শিক্ষার
মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার;
চিকিৎসার নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বাধীনতা; প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের নিরাপত্তা;
বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতের নিরাপত্তা; নিরাপদ সড়ক,বাকস্বাধীনতার নিরাপত্তা; জনগণের সার্বভৌমত্বের
নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক; ভূমিকম্প, অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং
আবাসনের নিরাপত্তা; বিনোদনের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা; সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের
নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার; আদিবাসীদের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক
অধিকার; নারীদের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার; বৈচিত্রের ঐক্যের
শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার এবং পোশাকের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা।
ইশতেহারটির প্রতিটি দফার অধীনে নানা উপদফা রয়েছে।
ইশতেহারের ১২ নং দফায় “শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থী ও
শিক্ষকের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার” এর ৪নং উপদফায় মাতৃভাষায়
শিক্ষা বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘পর্যায়ক্রমে সকল জাতিসত্তার মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা
লাভের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং সেজন্য পর্যাপ্ত বই বিতরণ ও শিক্ষক নিয়োগসহ শিক্ষকদের
উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও ভাষার মানুষদের বীরত্বপূর্ণ
সংগ্রামের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
১৪ নং দফায় “প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের নিরাপত্তা” এর
৬নং উপদফায় বিদেশী প্রজাতির গাছ লাগানো বন্ধের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘গ্রামাঞ্চলে
অর্থনৈতিক লাভের আশায় এদেশের প্রাণপ্রকৃতির সাথে খাপ না খাওয়া যেসব বিদেশী জাতের আগ্রাসী
উদ্ভিদ কিংবা প্রাণীর চাষ করা হচ্ছে সেটাকে অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’ ১৬ নং উপদফায়
‘পাহাড়ে পরিবেশ ধ্বংসের শ্বেতপত্র’ প্রকাশ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘পাহাড়ে কারা কতখানি জমি
অধিগ্রহণ করেছে তার শ্বৈতপত্র প্রকাশ করতে হবে। পাহাড় কাটা, গাছ কাটা, ঝিরিতে বিষ দেয়া
বন্ধ করতে দৃশ্যমান উদ্যোগ নির্বাচিত হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে নিতে হবে।’
১৭ নং দফায় “বাকস্বাধীনতার নিরাপত্তা” এর ১, ২ ও ৩ নং
উপদফায় বলা হয়েছে, কেবল যেকোন মাধ্যমে মত প্রকাশের জন্য কিংবা স্রেফ কথার জন্য – সেটি
উক্তি হোক কিংবা কটুক্তি, কাউকে গ্রেফতার/কারো উপর হামলা হয়রানি করা চলবে না এই মর্মে
‘কথা সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ণ করত হবে সরকারকে। তবে কাউকে হামলার হুমকি, হত্যা করার আহ্বান
জানালে আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট, ৭৪ এর বিশেষ ক্ষমতা আইন,
শ্রমিক পরিষেবা বিলসহ মতপ্রকাশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী নিবর্তনমূলক সকল আইন বাতিল
করতে হবে। মতপ্রকাশ, সভা-সমাবেশ-মিছিল, বিক্ষোভ-ধর্মঘট, মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত
করতে হবে।
২২ নং দফায় “আদিবাসীদের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক
অধিকার” এর ১, ২, ৩ ও ৪ নং উপদফায় বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক
পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সেখান থেকে সেনাশাসন প্রত্যাহারের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। সেনাশাসন
প্রত্যাহার মানে সেনাবাহিনীর সেনানিবাস প্রত্যাহার নয়। পাহাড়ে সংঘটিত সাম্প্রতিক হামলা
অগ্নিসংযোগসহ সকল খুন অপহরণ হয়রানির বিচার হতে হবে। পাহাড় ও সমতলের প্রতিটি জাতিসত্তার
সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে এবং তাদের ভূমি সমস্যার সমধানের জন্য কাজ শুরু
করতে হবে। বিনা বিচারে প্রায় সাড়ে ছয়শো দিন ধরে আটক নিরীহ বম নাগরিকদের অনতিবিলম্বে
মুক্তি দিতে হবে।’
২৩ নং দফায় “নারীদের শান্তি-স্বস্তি-নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক
অধিকার” এর ২নং উপদফায় বলা হয়েছে, ‘যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে হাইকোর্টের দেয়া ২০০৯
সালের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল সরকারি বেসরকারি পেশাগত প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক অরাজনৈতিক
সংগঠনে ‘যৌন নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালা’ কার্যকর করা’ ও ৩নং উপদফায় বলা হয়েছে, ‘নারী
ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির প্রজ্ঞাপন জারি
করা, এই ট্রাইবুনালে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো’ ইত্যাদি।
সংবাদ সম্মেলনে ইশতেহার তুলে ধরার পর নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের বিভিন্ন
প্রশ্নের জবাব দেন।
* পুরো ইশতেহারটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।

