""

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি-স্বস্তির পরিবর্তে ইউনূস সরকার দিয়েছে ৮ পাহাড়ির লাশ

ইউনূস সরকারের ১৭ মাসে সেনা-সেটলার হামলায় হত্যার শিকার ৮ জন। 


বিশেষ প্রতিবেদন, সিএইচটি নিউজ

শনিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের জন্য শান্তি-স্বস্তির পরিবর্তে দিয়েছে একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা ও লাশের সারি। ইউনূস সরকারের ১৭ মাসে ৮ জন পাহাড়ি সেনা-সেটলার হামলায় হত্যার শিকার হয়েছেন। অথচ গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল বৈষম্যহীন ও নিপীড়নমুক্ত বাংলাদেশের।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শিক্ষার্থী-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের টানা পনের বছরের অধিক শাসনের পতন ঘটলে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূস। দেশের মানুষের মতো পাহাড়িরাও মনে করেছিল হয়তো এবার পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ শোষণ-বঞ্চনা, নিপীড়ন-নির্যাতনের কিছুটা হলেও অবসান হবে। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। ফ্যাসিবাদী শাসকদের চেয়েও তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে দমন-পীড়নের মাত্রা বৃদ্ধি করেন। পাহাড়িদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন সেনাবাহিনী ও সেটলার বাঙালিদের। যার কারণে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের দেড় মাসের মাথায় ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা ও খাগড়াছড়ি সদরে পাহাড়িদের ওপর ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। এতে দীঘিনালায় সেটলারদের হামলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর অমানুষিক নির্যাতনে নিহত হন ৬৭ বছর বয়সী ধন রঞ্জন চাকমা। সেটলাররা পুড়িয়ে দেয় পাহাড়িদের শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-ঘরবাড়ি।

একই দিন রাতে খাগড়াছড়ি সদরের নারাঙহিয়া-স্বনির্ভর এলাকায় ঘটে সেনাবাহিনীর ভয়াবহ হামলা। দীঘিনালা হামলার প্রতিবাদে ও এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে রাস্তায় অবস্থান নেওয়া ছাত্র-জনতার ওপর সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে কলেজ ছাত্র জুনান চাকমা ও রাজমিস্ত্রী রুবেল ত্রিপুরা নামে দুই জনকে। গুলিতে গুরুতর জখম করা হয় আরো অন্তত ২১ জন পাহাড়িকে। সেদিনের রাতটি পাহাড়িদের জন্য এক বিভীষিকাময় রাতে পরিণত হয়।

পরদিন ২০ সেপ্টেম্বর দীঘিনালা ও খাগড়াছড়ি হামলার প্রতিবাদ জানাতে ‘সংঘাত ও বৈষম্য বিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন’ নামের প্লাটফর্ম-এর ব্যানারে শিক্ষার্থী-জনতা রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভে নামলে সেখানেও সেটলার বাঙালিরা হামলা চালায়। তারা নৃশংসভাবে পিটিয়ে খুন করে অনিক চাকমা নামে এক ছাত্রকে। এ হামলায় ৬০ জনের অধিক পাহাড়ি আহত হন।

উপরোক্ত ঘটনাগুলোর পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ কয়েকজন উপদেষ্টা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন, ভিকটিমের পরিবারের সাথে কথা বলে বিচারের আশ্বাস প্রদান করেন। সরকার উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কিন্তু সরকারের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে এলেও তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি।

এরপর ১ অক্টোবর ২০২৪ খাগড়াছড়ি সদরে দ্বিতীয় বারের মতো আবারও হামলার ঘটনা ঘটে। খাগড়াছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ সোহেল রানা নামে এক লম্পট শিক্ষক গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেটলার বাঙালিরা খাগড়াছড়ি শহরের মহাজন পাড়া, পানখাইয়া পাড়া, উপজেলা পরিষদ এলাকায় পাহাড়িদের ওপর হামলা চালায়। এতে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, লুটপাট করা হয়। অনেক পাহাড়ি আহত হন।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারা রামেসু বাজারে। সেখানে সেনাবাহিনী নির্বিচার গুলি চালিয়ে আখ্র মারমা, আথুইপ্রু মারমা ও থৈইচিং মারমা নামে তিন মারমা যুবককে হত্যা করে। অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষকে জখম করে। সেটলার বাঙালিরা পাহাড়িদের শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেয়।

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ গুইমারা রামেসু বাজারে সেনা-সেটলার হামলায় হতাহতদের কয়েকজন।

এ ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ২৭ সেপ্টেম্বর সেটলাররা খাগড়াছড়ি শহরের মহাজন পাড়া, উপজেলা পরিষদ এলাকা ও পানখাইয়া পাড়া য়ংড বৌদ্ধ বিহার এলাকায় হামলা চালিয়ে ৬ জন পাহাড়ি যুবককে গুরুতর জখম করেছিল। ভাঙচুর চালিয়েছিল পাহাড়িদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।

খাগড়াছড়ি পৌরসভার সিঙ্গিনালা গ্রামে ৮ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক মারমা কিশোরী ছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে ‘জুম্ম ছাত্র জনতার’ ডাকে সড়ক অবরোধ পালন করতে গিয়ে গুইমারা ও খাগড়াছড়ি সদরে এই হামলার ঘটনাগুলো সংঘটিত করা হয়েছিল।

ঘটনার পর আগের মতোই প্রশাসন যথারীতি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু সেই কমিটির তদন্ত রিপোর্টও হাওয়া হয়ে গেছে।

২০ অক্টোবর ২০২৫ রাতে আরেকটি হামলার ঘটনা ঘটে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বড় মাল্যা নামক স্থানে। ভূমি বিরোধের জেরে সংঘটিত এ হামলায় এক পাহাড়ির বাড়ি অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় ও ৯ পাহাড়ির বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।  

সর্বশেষ হামলার ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়ি হেডম্যান পাড়া এলাকায়। ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে সেটলার আব্দুল বাশির গংদের হামলায় ধারালো অস্ত্রের আঘতে থোয়াইহ্লাঅং মারমা, বিমল ত্রিপুরা ও মিলন চাকমা নামে তিন জন পাহাড়ি গুরুতর আহত হন। এদের মধ্যে বিমল ত্রিপুরা গত ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। উক্ত হামলায় জড়িতরা সবাই বিএনপি নেতা-কর্মী-সমর্থক বলে জানা গেছে।  

পৃথক পৃথকভাবে সংঘটিত উপরিউক্ত হামলাগুলোতে ৮ জন পাহাড়িকে হত্যা করা হয়েছে। ড. ইউনূস সরকার ফ্যাসিস্ট সরকারগুলোর কায়দায় সেনাবাহিনী ও সেটলারদের ব্যবহার করে পাহাড়িদের ওপর এসব হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন। যার কারণে তিনি এসব ঘটনার বিচারের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। কাজেই, এর দায় ড. ইউনূস কোনভাবেই এড়াতে পারবেন না। তার সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও এইসব হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকে একদিন না একদিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

আরো উল্লেখ্য যে, ইউনূস সরকার শুধু সাম্প্রদায়িক হামলা, হত্যা করে ক্ষান্ত হননি। তিনি সরকার গঠনের পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছেন। তার সরকারের পুরো সময়টাই পাহাড়ে সেনাবাহিনী অভিযানের নামে সাধারণ পাহাড়িদের নিপীড়ন-নির্যাতন, ধরপাকড়, ঘরবাড়িতে তল্লাশি, লুটপাট, হয়রানি, ধর্মীয় পরিহানীসহ নানা ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করলেও পাহাড়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি না করে সেনা দমন-পীড়ন জারি রেখেছেন। ফলে এ নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হবে তার বিন্দুমাত্র নিশ্চয়তা নেই।

তাই, পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে পাহাড়ি ছাত্র-যুব সমাজসহ সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোই একমাত্র উপায় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সচেতন মহল ও বিশ্লেষকরা।



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments