রোনাল চাকমা
পাহাড়ে সন্ধ্যা নামছে। চারদিকে শান্ত আর নিরবতা
ঘিরে ধরছে পাহাড়ি জনপদকে। সাথীদের সাথে খেলা শেষ করেই বাড়ি ফিরেছি। রাত হতেই গ্রামের
সব থেকে বড় উঠোনে হঠাৎ কতগুলো মশাল জ্বলে উঠল। চতুর্দিক থেকে শব্দ আসছে ‘উজো, উজো’।
গ্রামের সমস্ত শিশু, বৃদ্ধ আর নারীরা জড়ো হল গ্রামের সব থেকে বড় উঠোনে। আমি হঠাৎ নিজেকে
মায়ের কোলে আবিষ্কার করলাম। মায়ের এক হাতে একটা চেরাগ। বয়স আমার তখন মাত্র ৫ বছর। আমার
বাবাসহ শক্ত সমর্থ পুরুষরা সবাই গেছে পাশের এলাকা পাহারা দিতে। আমরা গ্রাম ছেড়ে পালালাম
জঙ্গলে। বড় হয়ে জানতে পারি, সময়টা ২০০৩ সালের আগস্টের শেষ দিক। সেনা-সেটেলার বাঙালিদের
হামলায় আমাদের এলাকায় ১০টির অধিক গ্রামের প্রায় ৪০০ বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ১০
জনের অধিক নারী ধর্ষিত হয়েছিল, ৮ মাসের শিশু কৃতন চাকমাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল,
প্রাণ গিয়েছিল সাবেক চেয়ারম্যান বিনোদ বিহারী খীসার।
তখন বিএনপি-জামাত নেতৃত্বাধীন জোট সরকার।
তখন খাগড়াছড়ির এমপি ছিল বিএনপি নেতা ওয়াদুদ ভূইয়া। তাঁর শক্ত ঘাঁটি এলাকা ছিল মহালছড়ির
মাইসছড়ি। খাগড়াছড়ি-মহালছড়িতে পাহাড়িদের হাজার হাজার একর জমি বেদখলের মূল হোতা ছিলেন
তিনি। ঘটনার ২৩ বছর পেরিয়ে গেছে, আমরা বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা সমাপ্ত করেছি কিন্তু
চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার এখনো বিচার হয়নি, বেদখলকৃত জমি আমরা ফেরত পাইনি। আমরা
হারিয়েছি স্বাভাবিক বিকাশের শৈশব, বড় হয়েছি প্রতিনিয়ত ভয় ও আতঙ্কে।
উপরোক্ত ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি
পাহাড়ি সন্তানের সাথে হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এইতো গত বছর সেপ্টেম্বরে খাগড়াছড়ি সদরের সিঙিনালায়
এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। প্রতিবাদে যখন হাজার হাজার পাহাড়ি ছাত্র–জনতা বিচারের
দাবি নিয়ে রাস্তায়, তখন তাঁদের উপর চলেছিল গুলি, কুপিয়ে কুপিয়ে করা হয়েছিল জখম। পুড়িয়ে
দেয়া হয়েছিল গুইমারায় রামেসু বাজারের পাহাড়িদের দোকানপাট-ঘরবাড়ি। অর্থাৎ নিজ বোনের
ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে ৩ জন পাহাড়ি হত্যার শিকার হলেন, আহত হলেন অর্ধশতাধিক। ধর্ষিত
আমার বোন সেদিন ছিল অসহায়, আর আমরা ছিলাম নিরুপায়। দানবীয় শক্তির নিকট পাহাড়ি জনগণ
সেদিন ছিল নিরুপায়। পাহাড়ে বিচারের বানীও আর নিভৃতে কাঁদে না। কারণ যুগের পর যুগ ধরে
এখানে অবিচার, অনাচার, বঞ্চনা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তবুও যখনি ধর্ষিত সহোদরার মুখ
দেখি, তাঁর অসহায়ত্ব দেখি তখনি শুধু মনে প্রতিশোধ আর প্রতিরোধের বারুদ জ্বলে। আমার
সহোদরা যখনি জানতে চাইবে কেন তাঁর সাথে এমন জঘন্য ঘটনা হলো, তখন কি জবাব দেব আমরা? কি জবাব দিবে পাহাড়?
কি জবাব দিবে এই ব্যর্থ রাষ্ট্র?
আগামীকাল বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের জনগণের জন্য দিনটি অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা
জোরদার হয়েছিল পাহাড় থেকে সমতলে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে
নেয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি হাসিনার পাতানো নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের
২৭টি ভোট কেন্দ্র ছিল শূন্য। অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোট দিতে যায়নি পার্বত্য এলাকার জনগণ।দেশের
নির্বাচনী ইতিহাসে সেটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ভোট দিতে না যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল
পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের যুগ যুগ ধরে রাজনৈতিক অধিকারহীনতা, শোষণ ও নিপীড়ন। সমতলের
সাথে পাহাড়ের মৌলিক পার্থক্য হল শাসনব্যবস্থায়। পাহাড়ে চলে অঘোষিত সেনাশাসন। বন্দিদশা
থেকে মুক্তি পেতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পাহাড়ি জনগণ অংশগ্রহণ করেছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনে পাহাড়ি ছাত্র-জনতার
অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। উদ্দেশ্য একটাই আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি, অধিকার ও মর্যাদা
নিয়ে বেঁচে থাকা। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বার বার হতাশ করেছে। হতাশ করেছে দেশের
মূল ধারার রাজনৈতিক দলসমূহ। সরকারের জুলাই সনদ-গণভোট ও দলসমূহের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য
চট্টগ্রাম সমস্যার কোন গুরুত্ব পাইনি। এটা যে বিশেষ সমস্যা সেটা স্বীকার করার আন্তরিক
প্রচেষ্টাও লক্ষিত হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক পাশে রেখে সারা দেশে গণতান্ত্রিক
প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে চলবে সেটা তো হতে পারে না।
অধিকারহীন জনপদে জনগণ এখন বুঝে গেছে তাঁদের
শত্র কারা, মিত্র কারা। কাদের ভোট দিতে হবে আর কাদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে। তাঁদের
হৃদয় যে ক্ষত বা শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা শাসকগোষ্ঠী কিংবা সহযোগী বা দালালদের শত প্রলোভন,
সুবিধা-অর্থ দিয়ে পূরণ করতে পারবে না। সাময়িক সুবিধার বিনিময়ে খাগড়াছড়িতে ধর্ষিত সহোদরার
স্বাভাবিক চলন-বলন, গুইমারায় শহীদ থৈইচিং এর সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তান, খাগড়াছড়িতে শহীদ
জুনান-রুবেল ত্রিপুরা আর রাঙামাটির অনিক চাকমার তরুণ প্রাণ কি ফিরে পাবে তাঁদের মমতাময়ী
মায়েরা?
এবারের নির্বাচনে তাই জনগণ বেছে নিয়েছে খাগড়াছড়িতে
ধর্ম জ্যোতি চাকমা আর রাঙামাটি আসনে পহেল চাকমাকে। তাঁরা যেন জনমদুঃখী জুমিয়াদের প্রতিনিধি।
তাঁদের অর্থ, বিত্ত আর বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়ার নেই কিন্তু আছে জনগণের জন্য নিবেদিত
প্রাণ হয়ে কাজ করার অদম্য ইচ্ছা, সাহস আর জাতীয় দায়িত্ববোধ। তাঁরা হেরে গেলে জনগণ হেরে
যাবে, তাঁরা জিতে গেলে জিতে যাবে আমাদের ধর্ষিত সহোদরা, পিতা হারানো নিষ্পাপ সন্তান
আর সন্তান হারানো মমতাময়ী মা। তাই আগামীকাল (১২ ফেব্রুয়ারি) সারা দিন, খাগড়াছড়িতে ঘোড়া
আর রাঙামাটিতে ফুটবল মার্কাকে ভোট দিন। প্রতিরোধের শক্তিকে ব্যালটে পরিণত করুণ। জনতার
রায়ে বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
* রোনাল চাকমা, সাংগঠনিক সম্পাদক, পাহাড়ি
ছাত্র পরিষদ
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
