""

লক্ষণ শুভ নয়, আন্দোলনের প্রস্তুতি নিন


মন্তব্য প্রতিবেদন


জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার বিজয়ের পর সেটেলাররা উৎফুল্ল, উৎসাহিত ও আগের চেয়ে আরও বেশি উগ্র হয়ে উঠেছে। নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার ৩৬ ঘন্টার মধ্যে তারা দু’টি পৃথক ঘটনায় সুইবাঅং মারমা ও হিমেল চাকমা নামে দুই পাহাড়ির ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে।

সেটেলাররা সুইবাঅং মারমাকে (৪৭) অমানুষিক নির্যাতনের পর রামগড়ের লালছড়ি নামক স্থান থেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং পরে আরও মারধর করে বিজিবির হাতে তুলে দেয়। বর্তমানে গুরুতর জখম অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

তাকে মিথ্যাভাবে ইউপিডিএফের “সন্ত্রাসী” ও চাঁদাবাজ” আখ্যায়িত করে সেটেলারদের মব-সন্ত্রাসকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা চলছে। সুইবাঅং “সন্ত্রাস” বা যে অপরাধেই জড়িত হোক, তার জন্য আইন রয়েছে। আইনের মাধ্যমে তার শাস্তি হবে। কিন্তু সেটা না করে কয়েকজন সেটেলার তার ওপর মব-ভায়োলেন্স করবে, আর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সিনেমার দৃশ্য দেখার মতো চেয়ে চেয়ে দেখবে, তা কোনভাবে মেনে নেয়া যায় না। সরকার মব-ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর কথাবার্তা বললেও, সেটেলার মবদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি, যা দুঃখজনক। সুইবাঅং মারমা যদি “সন্ত্রাসের” জন্য দোষী হয়, তাহলে তাকে হামলার সাথে জড়িত সেটেলারাও একই অপরাধে অপরাধী।

সেটেলারদের হামলা-মারধরে আহত হিমেল চাকমা।

সুইবাঅংকে হামলার দিন আরও একটি হামলার ঘটনা ঘটে। অসুস্থ হিমেল চাকমা রামগড় বাজার থেকে ঔষধ কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে লালছড়ি গ্রামের সীমান্তে পাম্পওয়েল বাগানে পৌঁছলে সেটেলার সন্ত্রাসীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে তারা সাংঘাতিকভাবে মারধর করে, ফলে তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যান। সেটেলাররা তাকে মৃত ভেবে ফেলে চলে যায়। পরে জ্ঞান ফিরে এলে হিমেল বাড়িতে ফিরে যান। তবে তার কাছে থাকা নগদ টাকা ও বিহারের ও নিজের কিছু দলিলপত্র হামলাকারীরা নিয়ে যায়।

হিমেল চাকমা (৫৫) রামগড় উপজেলার নাঙ্গেল পাড়া ধর্মকীর্তি অরণ্য বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি। তার সাথে সেটেলারদের কিংবা অন্য কারোর ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকার কথা নয়।

উক্ত দু’টি হামলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার – সেটা হলো নাঙ্গেলপাড়াসহ আশেপাশের এলাকা থেকে পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে তাদের জায়গাজমি বেদখল করা। নির্বাচনের অনেক আগে থেকে সেটেলাররা এজন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিছুদিন আগে তারা পাহাড়িদের জমিতে অবৈধভাবে একটি বাড়ি নির্মাণ করে এবং পরে তারা নিজেরাই সেটা ভেঙে ফেলে। কিন্তু এর দায় তারা পাহাড়িদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। বাড়িটি “ভেঙে দেয়ার” প্রতিবাদে সেটেলাররা রামগড়ে পাহাড়িদের বিরুদ্ধে মিছিলও বের করে।

অপরদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকাও সেটেলারদের প্রতি পক্ষপাতমূলক ও পাহাড়িদের প্রতি বৈরীমূলক। তারা পাহাড়িদের এলাকাগুলোতে ঘন ঘন টহল দেয়, অহেতুক জিজ্ঞাসাবাদের নামে গ্রামবাসীদের হয়রানি করে এবং নানাভাবে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এসবের উদ্দেশ্য হলো ভয়ভীতি দেখিয়ে পাহাড়িদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যহত ও অসহনীয় করে তোলা, যাতে তারা এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

নির্বাচনের আগে থেকে সচেতন মহল আশঙ্কা করে আসছিল যে, সেটেলারদের অন্যতম প্রধান নেতা ওয়াদুদ ভূঁইয়া নির্বাচনে জয়লাভ করলে রামগড়সহ খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় ত্রিপুরা, মারমাসহ পাহাড়িদের ওপর অত্যাচার, জুলুম ও ভূমি বেদখলের ঘটনা বৃদ্ধি পাবে। তাদের আশঙ্কা যে অমূলক নয়, উক্ত দুই ঘটনায় তা প্রমাণিত হয়েছে।

১৯৮০ দশকে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রামে গরীব ভূমিহীন সেটেলারদের নিয়ে আসা হয়েছিল জমির লোভ দেখিয়ে। অথচ এখানে জমির অভাবে তার আগেই ১৯৬০ দশকে কাপ্তাই বাঁধের পর ৪০ হাজার পাহাড়ি ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ফলে নতুন আসা সেটেলারদের জন্য জমি সংস্থানের একমাত্র উপায় ছিল পাহাড়িদের জমি কেড়ে নিয়ে তাদেরকে দেয়া। তৎকালীন সরকার সেটাই করেছিল। সরকার পাহাড়িদের জমি কেড়ে নেয়ার জন্য সেনাবাহিনী ও সেটেলারদের লেলিয়ে দেয়। পাহাড়িদের গ্রামে হামলা চালিয়ে তাদের উৎখাত করে তাদের জমিজমা, বসতভিটা ও অন্যান্য সম্পত্তি বেদখল করা হয়। এভাবে ফেনী, রামগড়, মাটিরাঙ্গা ও মানিকছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়িদের জমি সেটেলারদের বেদখলে চলে যায়। অথচ এসব অঞ্চল একসময় ছিল সম্পূর্ণ মারমা ও ত্রিপুরা অধ্যুষিত। গত কয়েক বছরে এগুলো এখন বাঙালি মুসলমান সেটেলার অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। মারমা ও ত্রিপুরারা জমি হারিয়ে এখন নিঃস্ব।

পাহাড়িদের এত বিশাল পরিমাণ জমি কেড়ে নেয়ার পরও সেটেলারদের জমির ক্ষুধা মেটেনি। তারা সব সময় পাহাড়িদের জমিগুলোর দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে এবং সুযোগ বুঝে হামলে পড়ে। গতবার ওয়াদুদ ভূঁইয়া এমপি থাকার সময় এবং তারপর ২০০৭-০৮ সালের জরুরী অবস্থার সময় সেটেলারদের জন্য সেই সুযোগ এসেছিল এবং আমরা তখন ভূমি বেদখলের মহোৎসব প্রত্যক্ষ করেছিলাম। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বিএনপি ও ওয়াদুদ ভূঁইয়ার বিজয়ের পর আবারও সেটেলারদের সামনে ভূমি বেদখলের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা যে এই সুযোগ কাজে লাগাবে না তা বিশ্বাস করা কঠিন। অন্ততঃ অতীত অভিজ্ঞতা আমাদেরকে আশঙ্কিত হতে বাধ্য করেছে।

অথচ অতীতের এসব অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও যেভাবে পাহাড়িদের একটি অংশ সামান্য সুবিধার বিনিময়ে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে “ধানের শীষ” বলে গলা ফাটিয়ে শ্লোগান দিচ্ছে, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও একইসাথে বেদনাদায়ক। শাসকগোষ্ঠীর চিরাচরিত কৌশল হলো শাসিত জাতির অতি ক্ষুদ্র একটি অংশকে ছিটেফোঁটা সুবিধা দিয়ে বৃহত্তর অংশের ওপর শোষণ-পীড়ন চালানো। পার্বত্য চট্টগ্রামেও আমরা সেটা হতে দেখছি। সেনা-সেটেলার শাসকরা পাহাড়িদের মধ্যে দালাল-সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছে এবং তাদেরকে বশে রেখে তাদেরকে দিয়ে পাহাড়িদের মধ্যে বিভেদ-অনৈক্য সৃষ্টি করছে। পাহাড়িদের এই দালাল-সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর শিরোমনি হলেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা। সেনা-শাসকরা তাকে আঞ্চলিক পরিষদের গদিতে বসিয়ে রেখে যেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার আধিপত্য কায়েম করেছে এবং আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে, অতীতে অন্য কোন দালালের মাধ্যমে সেটা করা সম্ভব হয়নি।

যাই হোক, জাতি হিসেবে আমাদের বিস্মৃতিপরায়ণ হলে চলবে না। আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের অতীতকে জানতে ও মনে রাখতে হবে। অতীতে আমাদের স্বাধীনতার স্মৃতি, ভূমি হারানোর বেদনা সব সময় স্মরণ রাখতে হবে এবং সেই হারানো ভূমি ও অধিকার ফিরে পাবার জন্য চেষ্টা ও নিরন্তর সংগ্রাম করতে হবে। মানুষ একটা ৩ টাকার কলম হারালেও তা ফিরে পাবার জন্য খুঁজে গলদঘর্ম হয়। আর একটা জাতি তার হারানো জমি, হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাবার জন্য চেষ্টা-সংগ্রাম করবে না, সেটা তো অবিশ্বাস্য। পৃথিবীতে অনেক জাতি হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাবার জন্য শত শত বছর ধরে সংগ্রাম করেছে এবং অনেক জাতি এখনও করছে। আমাদেরকে সেই সব জাতির সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিতে হবে। হারানো ভূমি ও অধিকার ফিরে পাবার স্বপ্ন সবসময় জাগিয়ে রাখতে হবে এবং সংগ্রাম করতে হবে।

যারা না বুঝে স্বার্থের ধান্দায় বিএনপির সাথে সামিল হয়েছে, তারা ভুল পথে রয়েছে। তাদের কারণে এবারও জাতীয় সংসদে যাওয়ার চাবি ভুল ব্যক্তির হাতে পড়েছে। ফলে পাহাড়িদেরকে এখন জমি হারানোর, জুলুমের শিকার হওয়ার কয়েকগুণ আশঙ্কা-ভয় নিয়ে দিন কাটাতে হবে। দালালি করে, শাসকদের তোষণ করে কতিপয় ব্যক্তি ক্ষমতার খুদকুড়ো ও সামান্য কিছু সুবিধা লাভ করতে পারে, কিন্তু তাতে জনগণের অধিকার অর্জিত হয় না, জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হয় না। এর জন্য যা করতে হয়, তা হলো সংগ্রাম। দুনিয়ায় কোন জাতি সংগ্রাম ছাড়া অধিকার লাভ করেনি। কোন জাতি দালালি করে মুক্ত হয়েছে তার উদাহরণ একটিও নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জন্যও সংগ্রাম করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তাই ওয়াদুদ ভূঁইয়ার জয় লাভের পর ভূমি বেদখল ও জুলুমের যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা যদি বাস্তবে পরিণত হয়, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য আমাদেরকে আগে থেকে প্রস্তুত থাকতে হবে। 

(১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।


 





0/Post a Comment/Comments