""

ছাত্রনেতা নাঈম উদ্দীনের উপর পুলিশি হামলার বিচার দাবিতে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সংবাদ সম্মেলন


ঢাকা প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা নাঈম উদ্দিনের উপর অহেতুক পুলিশি হামলা ও বর্বরতার বিচার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট।

আজ বুধবার (২৫ ফ্রেব্রুয়ারি ২০২৬) বিকাল ৩:৩০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্র জোটের নেতৃবৃন্দ নাঈম উদ্দীনের উপর পুলিশি হামলার ঘটনা সারাদেশে চলমান পুলিশবাহিনীর নিপীড়নমূলক আচরণ ও জনগণের ওপর মোরাল পুলিশিংয়ের ধারাবাহিকতা মাত্র বলে মন্তব্য করেন। 

সংবাদ সম্মেলন থেকে নাঈম উদ্দীনের উপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদ ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিসহ ৬ দফা দাবি জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সমন্বয়ক পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি অমল ত্রিপুরা। এসময় উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি ছায়েদুল হক নিশান, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের সহ-সভাপতি নাঈম উদ্দীন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল ও ঢাবি আহ্বায়ক নুজিয়া হাসিন রাশা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ঢাবি আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক।

লিখিত বক্তব্য নাঈম উদ্দীনের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনা নিন্দা জানিয়ে জোটের নেতৃবৃন্দ বলেন, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন ২৩ ফেব্রুয়ারী রাতে হলে ফেরার সময় পুলিশি হয়রানির স্বীকার হন। যদিও পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে কোনোরকম বেআইনি কাজের প্রমাণ বা অভিযোগ পায়নি। এসময় নাগরিক অধিকার বিষয়ে পুলিশকে তিনি কিছু প্রশ্ন করলে পিছন থেকে পুলিশের কয়েকজন সদস্য তাকে হঠাৎ আক্রমণ করে। তাঁদের আক্রমণে তিনি আহত হন। এই ঘটনা নাগরিক অধিকার , বাক স্বাধীনতা এবং দেশের বিদ্যমান আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আমরা, গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের নেতৃবৃন্দ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। 

তারা আরো বলেন, কেবল নাঈম উদ্দিনই নয়, আমরা মিডিয়াতে দেখতে পাই একই সময়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দায়িত্বরত এক সাংবাদিককে পুলিশ মারাত্মক মারধোর করে আহত করেছে। এক কিশোরকে সম্পূর্ণ তল্লাশি করে বের হয়ে যেতে দেয়ার সময় অহেতুক তার গায়ে হাত তোলে এক পুলিশ সদস্য। এছাড়াও বিগত কয়েকদিনে কোনোরকম অপরাধ বা আইনভঙ্গ ছাড়াই পুলিশ বাহিনী দেশজুড়ে বিভিন্ন মানুষকে হয়রানি করে। আমরা মনে করি এইসব ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা। পুলিশ বাহিনীর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা ও জবাবদিহিতার অভাব তাকে ক্রমাগত গণবিরোধী শক্তি হিসাবে তৈরি করে চলেছে। 

পুলিশ কাঠামোয় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্য বলেন, জুলাই গণভ্যুত্থানের সময়ে পুলিশ বাহিনীর তীব্র গণবিরোধী অবস্থানের পরে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিলো পুলিশ বাহিনীতে সংস্কার হবে এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠিত হবে। পুলিশ জনগণের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে বলপ্রয়োগ করবে না। কিন্তু পুলিশ কাঠামোয় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি, জুলাই ও এর পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনীর কোনো অপরাধের সুষ্ঠু জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা হয়নি। সংস্কার বিষয়ে পুলিশ সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রস্তাবনায় পুলিশের ক্ষমতার উপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ, পুলিশের অবৈধ এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের সুযোগ কমানো সংক্রান্ত প্রায় সকল প্রস্তাব পুরোপুরি বাদ গেছে। কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া পুলিশের ইমেজ বাড়ানোর নামে শুধুমাত্র পোশাক পরিবর্তন অহেতুক রাষ্ট্রের অর্থব্যয় ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আমরা পুলিশবাহিনীকে শ্রমিক, ছাত্র, আদিবাসী, নারী, শিক্ষকসহ জনগণের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে নির্মম হামলা চালাতে দেখেছি। এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। কারা হেফাজতে নিপীড়ন ও মৃত্যুর অভিযোগ অব্যাহত আছে। এরমধ্যে নবনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসামাত্র পুলিশের এই নিপীড়নমূলক আচরণ আমাদের বুঝিয়ে দেয় পুলিশ এখনো আগের মতই গণবিরোধী। 

তারা আরো বলেন, কলোনিয়াল রাষ্ট্রকাঠামো থেকে উদ্ভূত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান এই পুলিশবাহিনী প্রায়শই দুর্নীতিপ্রবণতার পাশাপাশি চরিত্রের দিক থেকে কর্তৃত্বপরায়ণ ও অহংকারি। নিজেদেরকে জনগণের সেবক না ভেবে তারা জনগণের কন্ঠ রোধ করতে চায়। জনগণ তাদের প্রশ্ন করলে তারা পিছন থেকে গলা চিপে ধরে ঠিক ছাত্রনেতা নাঈম উদ্দিনের উপর হামলার মত। গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে জানিয়ে দিতে চায়, আমরা এমন নতুন বাংলাদেশ গঠনে বদ্ধপরিকর যেখানে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের নিকট সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ থাকতে হবে। আমরা জনগণকে বলতে চাই পুলিশবাহিনী জনগণের বন্ধু বা আত্মীয় নয়, বরং জনগণের নিরাপত্তাদানে নিয়োজিত এবং জনগণের দ্বারাই ক্ষমতায়িত নাগরিক মাত্র। ফলে জনগণকে এই ক্ষমতার তত্ত্বাবধানে সোচ্চার থাকতে হবে। 

নব নির্বাচিত বিএনপি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সম্প্রতি বক্তব্যকে কঠোর সমালোচনা করে জোটের নেতৃবৃন্দ বলেন, নব নির্বাচিত বিএনপি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন সম্প্রতি পুলিশবাহিনীকে নির্দেশ দেন যেন কিশোরদের রাতে ঘোরাফেরা করতে দেখলেই পুলিশবাহিনী তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রথমত, আমরা মনে করি বিদ্যমান আইন ব্যবস্থা অনুযায়ী কেবল সন্দেহজনক কিছু দেখলেই পুলিশ একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ কররে পারে, রাতে বৈধ এলাকায় হাঁটার জন্য অহেতুক কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে না। একজন মন্ত্রী হয়ে সাধারণভাবে পুলিশকে এভাবে আইনিসীমা অতিক্রম করতে বলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। দ্বিতীয়ত, সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমান ছাড়া কেবল সন্দেহের বশে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের যে সুযোগ বর্তমান আইনে আছে তাও বহুল অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এমতাবস্থায় এধরণের স্বেচ্ছাচারী উক্তি সত্যিকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বদলে পুলিশকে অহেতুক মোরাল পুলিশিং এ ধাবিত করে। আমরা শিক্ষামন্ত্রীর এধরণের অসচেতন আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই।

জোটের নেতৃবৃন্দ, নাঈম উদ্দীনের উপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে ২৪ তারিখ দুপুর থেকে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে নৃবিজ্ঞান বিভাগ’ নামক একটা মঞ্চ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা শাহবাগ থানার সামনে অবস্থান করে বিক্ষোভ কর্মসূচি ও দাবির প্রতি সংহতি এবং পূর্ণ সমর্থন জানান।

সংবাদ সম্মেলন থেকে ৬ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিসমূহ : ১. সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে ও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে; ২. অভিযুক্ত ডিসি মাসুদসহ সারাদেশে হেনস্তাকারী পুলিশদের বিরুদ্ধে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; ৩. তদন্ত প্রক্রিয়া চলাকালীন ডিসি মাসুদকসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করতে হবে; ৪. নিজের আওতাবহির্ভূত এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন সংবিধানবিরোধী বক্তব্য দিয়ে পুলিশি হয়রানির প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য অবিলম্বে শিক্ষামন্ত্রীকে ভুল স্বীকার করে দুঃখপ্রকাশ করতে হবে; ৫. মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে; ৬. পার্ক ও উদ্যানে সাধারণ মানুষের অবাধ যাতায়াত এবং আড্ডা দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলন শেষে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করে নাঈম উদ্দীনের ঘটনাসহ ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা বিষয়ে ঢাবি প্রশাসনের কি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর একের পর এক পুলিশের হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।

এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগামীকালের মধ্যে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি প্রদান করবে এবং পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অফিসিয়াল চিঠি দেবে বলে জোট নেতৃবৃন্দকে আশ্বাস প্রদান করে।



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments