![]() |
| সন্তু লারমা। সংগৃহিত ছবি |
সুনয়ন চাকমা
জেএসএস গঠিত হয় ১৯৭২ সালে। সন্তু লারমা গ্রেপ্তার হন ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর।
সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৭৬ সালে। সন্তু লারমা ছাড়া পান ১৯৮০ সালের ২২ জানুয়ারী।
১৯৮১ সালের মধ্যভাগে তিনি আবার জেএসএসে যোগদান করেন। এরপর থেকে জেএসএসে অভ্যন্তরীণ
দ্বন্দ্ব শুরু, পরিণতিতে লাম্বা-বাদি গৃহযুদ্ধ, যা ১৯৮৫ সালের ২৯ এপ্রিল বাদি গ্রুপের
আত্মসমর্পনের আগ পর্যন্ত চলে। বাদি গ্রুপের আত্মসমর্পনের পর লাম্বা গ্রুপ একচ্ছত্র
আধিপত্য কায়েম করে। ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সেটেলারদের বিরুদ্ধে আবার
আক্রমণ শুরু করা হয়। চলে ১৯৯২ সালের ৯ আগস্ট পর্যন্ত। ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট থেকে জেএসএসস
একতরফা যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে, ফলে এরপর আর কোন যুদ্ধ হয়নি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর
সরকারের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তারপর থেকে ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত
চলছে।
মোটা দাগে এই হলো জেএসএসের “সংগ্রামের” টাইমলাইন। এবার সশস্ত্র সংগ্রাম
তথা আন্দোলনে সন্তু লারমার ভূমিকা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।
• সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি পর্বে সন্তু লারমার অংশগ্রহণ
রয়েছে।
• তবে জেলে থাকার কারণে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা বা মূল
পর্বে তার কোন ভূমিকা ছিল না।
• ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত জেএসএসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
ও গৃহযুদ্ধে তার বিশাল অবদান রয়েছে। এই রক্তাক্ত এই গৃহযুদ্ধের জন্য প্রধানত তাকে ও
প্রীতি কুমার চাকমাকে দায়ি করা হয়।
• গৃহযুদ্ধের পর সন্তু লারমার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর
বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চলে মাত্র ৭ বছর।
• যুদ্ধ বিরতির সময় ১৯৯২ থেকে চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত
তিনি সরকারের সাথে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন।
• চুক্তির পর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত শুরু করেন এবং আজ পর্যন্ত
জিইয়ে রেখেছেন। এই সংঘাতে ইতিমধ্যে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৫৫০ জুম্ম নিহত হয়েছেন।
উপসংহার: সন্তু লারমা সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন মাত্র ৭ বছর। আর গৃহযুদ্ধ
ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত করেছেন ৩৪ বছর (লাম্বা-বাদি গৃহযুদ্ধ ৫ বছর ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত
২৯ বছর)। অর্থাৎ তার “সংগ্রামী” জীবন কেটেছে প্রধানত স্বজাতির ভাই হত্যা করে।
যে সাত বছর তিনি সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন, সেটাকেও প্রকৃত অর্থে সশস্ত্র
সংগ্রাম বলা যায় কীনা তা এক গভীর গবেষণার বিষয়। এটা বলা মোটেই অসঙ্গত হবে না যে, সশস্ত্র
সংগ্রামের নামে তিনি যা করেছেন, তাকে আসলে শিশুসূলভ বিশৃঙ্খলা মাত্র। শিশুরা যেমন দামি-মূল্যবান
জিনিসকেও খেলনা মনে করে খেলা করে ও বাড়ির সকল জিনিসপত্র বিশৃঙ্খল, এলোমেলো করে, সন্তু
লারমাও জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে তেমনি খেলা করেছেন। অনেকে হয়ত জানেন না, ভারতে
জুম্মরা শরণার্থী হতে বাধ্য হয় কেবল সেনাবাহিনী ও সেটলারদের হামলার কারণে নয়, শান্তিবাহিনীর
সদস্যদের কর্তৃক তাদের বাড়িঘরে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেয়ার কারণেও। ভারতে আশ্রয় নেয়ার
জন্য জেএসএস লোকজনকে বাধ্য করেছিল এবং এজন্য অনেকের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল।
এ সময়কালের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা এখনও অনেকে বলতে পারবেন। শান্তিবাহিনীর
কোন কোন সদস্য শরণার্থী হতে যাওয়া লোকজনের গরু ছাগল ও সোনা অলংকার নিয়ে কী করেছে সে
সম্পর্কে এখনও অনেক কাহিনী লোকজনের মুখে মুখে ফেরে। এক কথায় সন্তু লারমার সাত বছরের
সশস্ত্র যুদ্ধ ছিল জুম্মদের জন্য এক ভয়ঙ্কর দুঃসময়।
গৃহযুদ্ধের পরও বাংলাদেশ সেনবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চাইতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই শ্রী লারমা ব্যস্ত ছিলেন। এই সময়েই চাবাই মগ, সাহিত্যিক সুহৃদ চাকমা, মনিস্বপন দেওয়ানের বাবা শান্তিময় দেওয়ান, রঞ্জিত দেওয়ান, সুদত্ত খীসা (তিক্ক), পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান রাজ কুমার চাকমা, সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমার বড় ভাই সুলিল কুমার চাকমা (২ নং নানিয়ারচর ইউপি সাবেক চেয়ারম্যান)সহ আরো অনেককে হত্যা করা হয়। সত্যবীর দেওয়ান এর নেতৃত্বে সুলিল কুমার চাকমাকে হত্যা করা হয়েছিল। এছাড়া রাঙ্গামাটিতে মোনঘরের প্রতিষ্ঠাতা প্রজ্ঞানন্দ ভান্তেকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয় বলে জানা যায়।
বর্তমানে সন্তু লারমা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে মিলে আন্দোলনকারী শক্তি
ইউপিডিএফকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন না করে তিনি
তাদেরকেই মেরে ফেলছেন, যারা ভূমি বেদখলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে, জুম্মদের স্বাধিকার
প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করছে। কেন তিনি জাতির জন্য অনিষ্টকর এই জঘন্য কাজ করছেন, তার
কোন ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত দেননি। সবার প্রশ্ন, এটা তার কী ধরনের সংগ্রাম?
এটা বলা মোটেই অসঙ্গত হবে না যে, তিনি জুম্ম জাতির যে পরিমাণ ক্ষতি করেছেন
এবং এখনও করে চলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আর কোন দালাল, এমনকি শত্রুরাও সে পরিমাণ
ক্ষতি করতে পারেনি। তার মতো “আন্দোলনকারী” ”জুম্ম প্রেমী” থাকলে, জুম্মদের শত্রুর দরকার
আছে কি? তার কারণেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সেটলাররা পার্বত্য চুক্তির পর থেকে নিরাপদে,
নির্বিঘ্নে, নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে; আর এদিকে জুম্মরা নরক রাজ্যে পড়ে শয়ে শয়ে মারা
যাচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সেটলাররা তার মতো আর কোন অকৃত্রিম ও বিশ্বস্ত বন্ধু
পাবে না।
সুতরাং আজ এটা জোর দিয়ে বলা যায়, সন্তু লারমা “আন্দোলন” না করলেই বরং জুম্মরা
ভালো থাকতো। এক কথায় তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের নামে যা করেছেন, তা হলো শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলা,
আন্দোলনের নামে যা করেছেন, তা হলো ভণ্ডামি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের নামে যা করেছেন ও
করছেন, তা হলো সেনাশাসকগোষ্ঠীকে সেবাদান। এ জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসক সেনাবাহিনী
তাকে খুবই পছন্দ করে ও গত ২৭ বছর ধরে আঞ্চলিক পরিষদের গদিতে বহাল রেখেছে। জয়তু সন্তু
লারমা!
* লেখা সংগ্রহ: সুনয়ন চাকমার ফেসবুক পোস্ট
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
