খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর খাগড়াছড়ি জেলা
শাখার ২১তম কাউন্সিল সম্পন্ন হয়েছে। এতে তৃষ্ণাঙ্কর চাকমাকে সভাপতি, প্রাঞ্জল চাকমাকে
সাধারণ সম্পাদক, সুনীল চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করে ১৭ সদস্য বিশিষ্ট নতুন
কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার (৬ মার্চ ২০২৬) খাগড়াছড়ি সদর এলাকায় দিনব্যাপী এই কাউন্সিল
অনুষ্ঠিত হয়।
কাউন্সিলের ব্যানার শ্লোগান ছিল “সামরিক আগ্রাসনে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের
রাজনৈতিক সমস্যা নিরসনে ও স্থায়ী শান্তি স্থাপনে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত কর।”
কাউন্সিলের ১ম অধিবেশন শুরুতে দলীয় সঙ্গীত “পাহাড়ি ছাত্র-ছাত্রী দল” গানটি
পরিবেশনের মধ্য দিয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
এরপর পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়িত জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে
যারা শহীদ হয়েছেন তাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
“আপোষকামিতা ও দাসত্ববরণের মানসিকতা ছুড়ে ফেলে শাসকের জাতীয় অস্তিত্ব
ধ্বংসকারী সকল ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙে দিতে আসুন, আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম বেগবান
করতে পিসিপি'র পতাকাতলে সমবেত হই” এই আহ্বানে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে খাগড়াছড়ি
জেলা শাখার সভাপতি মিঠুন চাকমার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক তৃষ্ণাঙ্কর চাকমার সঞ্চালনায়
স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপি সাংগঠনিক সম্পাদক প্রাঞ্জল চাকমা।
কাউন্সিল অধিবেশনে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক
ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর খাগড়াছড়ি ইউনিটের অন্যতম সংগঠক লালন চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের
কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক শান্ত চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার
সভাপতি ক্যামরণ দেওয়ান, হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় সভাপতি নীতি চাকমা ও পাহাড়ি
ছাত্র পরিষদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দপ্তর সম্পাদক ক্যচিংহ্লা মার্মা প্রমুখ।
ইউপিডিএফ সংগঠক লালন বলেন, জন্মলগ্ন থেকে পিসিপি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আপোষহীনভাবে
লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের এই লড়াই অস্তিত্ব
রক্ষার লড়াই, নিপীড়ন-বঞ্চনা থেকে মুক্তির লড়াই। বাঁচার মতো বাঁচতে হলে সংগ্রামই একমাত্র
মুক্তির পথ। শুধুমাত্র ভরি ভরি সার্টিফিকেট ও
ডিগ্রি অর্জন করে অধিকার অর্জিত হবে
না। অধিকার অর্জনের জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে রাজপথে লড়াইয়ের
জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান
জানান।
তিনি স্মৃতিচারণ করে আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের লড়াই-সংগ্রামে প্রথম
শহীদ ভরদ্বাজ মনি। তখন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীনভাবে রুঁখে দাঁড়ানো
দেখে আমি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদে নিজেকে সামিল করেছিলাম।
![]() |
| বক্তব্য রাখছেন নীতি চাকমা |
নারী নেত্রী নীতি চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসকগোষ্ঠীর মিলিত ষড়যন্ত্র, দমন-পীড়ন, অব্যাহত ভূমি বেদখল, নারী ধর্ষণের বিরুদ্ধে পাহাড়ের সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসমূহকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে রুখে দাঁড়াতে হবে। জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে পাহাড়ে ছাত্র-যুব-নারী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
তিনি আরো বলেন, খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালায় অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী গণধর্ষণের
শিকার হয়। সিঙ্গিনালা ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে সেনাবাহিনীর গুলিতে ৩ জন শহীদ হতে হয়েছিল।
বর্তমানে গড়ে ওঠা ছাত্রসমাজ ও নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে নানাভাবে বিভ্রান্তি ও ফাঁদে
ফেলার ষড়ডন্ত্রণ চলছে। আমাদের অধিকার রক্ষার জন্য গ্রামাঞ্চলে এলাকায় এলাকায় ঐক্যবদ্ধ
হয়ে আন্দোলন করতে হবে।
যুবনেতা ক্যামরণ দেওয়ান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগণের অধিকার আদায়ের
জন্য পাহাড়ের সকল ছাত্রসমাজ, যুবসমাজ এবং নারী সমাজকে আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে
পার্বত্য চট্টগ্রামে যুবসমাজ নেশাদ্রব্যে আসক্ত হয়ে আন্দোলনে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে
পারছে না। পাহাড়ের আন্দোলন স্তিমিত করতে সরকার ও শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন রকম কূটকৌশল অবলম্বন
করে যাচ্ছে। অনেকে বিপথগামী হয়ে শাসকগোষ্ঠীর সাথে লেজুড় করে গণ স্বার্থবিরোধী কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, পাহাড়ের সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এ সমস্যা থেকে
উত্তরণের জন্য ঐক্যবদ্ধ লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
ছাত্রনেতা শান্ত চাকমা বলেন, পাহাড়ে সেনাশাসন জারি থাকার কারণে সাধারণ মানুষ
অনিরাপদ ও প্রতিনিয়ত ভয়-ভীতিতে দিন কাটাচ্ছেন। এই দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের
সংগঠিত হয়ে আন্দোলন করতে হবে। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাহাড়ে নিপীড়িত
জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে আপোষহীন লড়াই-সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালের ১৯ এপ্রিল নান্যচরে ছাত্রনেতা রমেল চাকমা সেনাবাহিনীর
নির্যাতনে মারা যায়। তার লাশ পর্যন্ত পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। সেনাবাহিনীর
নির্দেশনায় ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট মুখোশ বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে স্বনির্ভরে প্রকাশ্যে দিবালোকে
ছাত্রনেতা তপন, এল্টন ও যুবনেতা পলাশ চাকমাসহ ৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ১১
ডিসেম্বর দিবাগত রাতে পানছড়িতে অনিলপাড়ার সাবেক বিপুল চাকমা, লিটন, সুনীল ও রহিসহকে
মুখোশ বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা সংগঠন থাকলেও একমাত্র বৃহত্তর
পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ আপোষহীনভাবে লড়াই-সংগ্রামে অবিচল রয়েছে। আন্দোলন
বাধাগ্রস্ত করতে শাসকগোষ্ঠীর সাথে ষড়যন্ত্র করছে জেএসএস সন্তু লারমা। তাদেরকে চিনতে
হবে। সেনাদের হাতের পুতুল সন্তু লারমা ’৯৬ সালে কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনাকে ‘বিতর্কিত’
বলে মন্তব্য করেছিলেন।
কাউন্সিল অধিবেশনের সভাপতি মিঠুন চাকমা বলেন, শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে
অন্যায়, অবিচার, খুন-গুম, হত্যা, ধর্ষণের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মকে চেতনাহীন করে রাখতে
প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রণের জাল বুনছে। এ বিষয়ে তরুণ প্রজন্মকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরো বলেন, দেশে ক্ষমতা পালাবদল হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়ন বদলায়
না। পার্বত্য চট্টগ্রামে যুগ যুগ ধরে চলা নির্যাতন, মিথ্যা মামলায় জেলে প্রেরণসহ নির্যাতনের
স্টিমরোলার রুখতে হবে।
তিনি শাসকগোষ্ঠীর জাতীয় অস্তিত্ব ধ্বংসকারী সকল ষড়যন্ত্র ভেঙে দিতে পিসিপির
পতাকাতলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান।
কাউন্সিলের ২য় অধিবেশনে পুরনো কমিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে প্রস্তাবনা আকারে
তৃষ্ণাঙ্কর চাকমা সভাপতি, প্রাঞ্জল চাকমা সাধারণ সম্পাদক, সুনীল চাকমা সাংগঠনিক সম্পাদক
করে ১৭ সদস্যের নতুন কমিটি উপস্থাপন করা হয়। উপস্থিত প্রতিনিধিরা করতালির মাধ্যমে প্রস্তাবিত
কমিটিকে পাশ করেন।
নতুন কমিটির সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান শান্ত চাকমা।
কাউন্সিলে বিভিন্ন উপজেলা শাখা কমিটি থেকে প্রতিনিধি-পর্যবেক্ষক ও কলেজ
শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া পর্যবেক্ষক হিসেবে পিসিপির সাবেক শুভাকাঙ্ক্ষী ও
সমর্থকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।



