সোহেল চাকমা
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সম্প্রীতির রাজনীতি বেশ লক্ষণীয় ব্যাপার
বটে। বিশেষত পাহাড়ি জনগণের আস্থা, ভরসা ও বিশ্বাস অর্জনে সেনাবাহিনী এই কার্যক্রম পরিচালনা
করে। চিকিৎসা সেবা, ত্রাণ বিতরণ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, সম্প্রীতির কনসার্ট ও খেলাধূলা
ইত্যাদি আয়োজনের নামে সেনাবাহিনী সম্প্রীতির রাজনৈতিক কার্য চালায়। এ সমস্ত কিছু করার
মাধ্যমে তারা পাহাড়িদের সহানুভূতি পেতে চায়,
মন জয় করতে চায় এবং গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে চায়। কিন্তু সেনাবাহিনী বোধহয় জানেই
না ‘কাউন্টার ইন্সারজেন্সির’ বিপরীতে তাদের এসব লোকদেখানো কার্যক্রম কতটা কুৎসিত দেখায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সম্প্রীতির রাজনীতি শুরু হয় আশির দশকে।
রাঙামাটির ব্রিগেড কমান্ডার থাকাকালীন সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহিমই পাহাড়িদের মন জয় করার
কৌশল হিসেবে এটি প্রয়োগ করেন। তিনি সেসময় সর্বজনশ্রদ্ধেয় ধর্মগুরু বনভান্তের কাছেও
গিয়েছিলেন এবং ১৯৮৭ সালে রাঙামাটির টাউন হলে বনভান্তের উপস্থিতিতে একটি শান্তি সম্মেলনও
করিয়েছিলেন। যার প্রভাব পাহাড়ি জনসমাজে বিশদভাবে পড়েছিল। সেনাবাহিনীর প্রতি পাহাড়িদের
দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ইব্রাহিমের সম্প্রীতির রাজনীতির কৌশল
বেশ কাজে দিয়েছে বলা যায়। বর্তমান সময়ে পাহাড়িদের বিশ্বস্ততা অর্জনে সেনাবাহিনী পূর্বের
সেই সম্প্রীতির কৌশলই অনুসরণ করছে।
সম্প্রতি সেনাবাহিনী বেশ কয়েকটি জায়গায় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিয়ে পাহাড়িদের
মন জয় করার চেষ্টায় নেমেছে। একই সাথে ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারা হত্যাকাণ্ডে
আহতদের নামমাত্রিক চারটি দোকান প্লট তুলে দিয়ে ও একজন শহীদ পরিবারকে নামমাত্রিক চাকুরির
ফাঁদে ফেলে নিজেদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর
নির্মিত চারটি দোকান সেনাবাহিনী উদ্বোধন করবে বলে গুঞ্জন রয়েছে। অথচ সেনা-সেটলার কর্তৃক
এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শত শত পাহাড়ি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত, আহত ও নিহত হয়েছে। তাদেরকে
সেনাবাহিনী কী দিয়েছে? হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যৎসামান্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে গুটিকয়েক নিহত
ও আহত পরিবারের প্রতি করুণা প্রদর্শন করে সেনাবাহিনী কী প্রমাণ করতে চায়?
মূলত, হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সেনা-সেটলারদের গ্রেফতার ও বিচার যেন না হয়
এবং নিজেদের কৃত অপরাধের দায় থেকে বাঁচার জন্য ও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে সেনাবাহিনী
এখন উদগ্রীব। তাদের এমন দৃষ্টিকটু কার্যকলাপ ও তৎপরতাই প্রমাণ করে হত্যাকাণ্ডের সাথে
সেনাবাহিনী সরাসরি জড়িত। প্রশ্ন হচ্ছে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়নের জিকির তুলে কি হত্যাকাণ্ডের
পাপ বা অপরাধ মোচন করা যায়?
পাহাড়িদের ওপর সেনাবাহিনীর সম্প্রীতি রাজনীতির আরেকটি উদ্দেশ্য হল, প্রতিবাদ,
প্রতিরোধ ও ঐক্যবদ্ধ হওয়া থেকে পাহাড়িদের বিরত রাখা। যাতে কনফ্রন্টেশন বা সরাসরি বিরোধিতার
কৌশল হিসেবে ‘কাউন্টার ইন্সারজেন্সি’ বা বিদ্রোহ দমন করা যায়। সেনাবাহিনীর এই দ্বিমুখী
চরিত্র পাহাড়িদের কারোরই অজানা নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল রাখতে স্ব-সৃষ্ট
ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী দিয়ে পাহাড়ি জনগণের সম্মিলিত আন্দোলন দমন, জেএসএস সন্তু গ্রুপ দিয়ে
জাতিগত প্রক্সি যুদ্ধ জিইয়ে রাখা এবং সন্ত্রাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে পাহাড়িদের
ওপর সেনা অভিযান পরিচালনা করা পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ কাজে আইনগত বৈধতা ও সমতলে বাসকৃত বৃহৎ বাঙালি জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের জন্য তারা
সাংবাদিক ভাড়া করে বা কখনো বাধ্য করে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার সাহায্যে প্রচারকার্য চালায়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসেবে সেনাবাহিনীর কাজ কি? এই প্রশ্ন
যদি দেশের নাগরিকদের সম্মুখে করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে উত্তর আসবে দেশের সার্বভৌমত্ব
ও ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষা করা। এছাড়া আভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা
মিশনে গিয়ে দেশের সুনাম অর্জন করা এবং জাতিগঠনমূলক কাজে ভূমিকা রাখা। দেশের রাজনীতিতে
নামা বা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে দেশ বা বিশেষ কোন অঞ্চল শাসন করা সেনাবাহিনীর কাজ
নয়। কিন্তু সেনাবাহিনী দেশের সামগ্রিক স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে
একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মূখ্য ভূমিকা পালন
করছে। তারা গোষ্ঠীগত রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান
হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। না হলে দেশের অর্ধশতাধিকেরও বেশী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক
সেনাবাহিনী হয় কি করে?
দেশের আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গুর হওয়ার অন্যতম একটি কারণও হলো সেনাবাহিনীর গোষ্ঠীগত
রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রুপান্তরিত হওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাজার-ব্যবস্থাপনা,
পর্যটন, হোটেল-মোটেল ব্যবসা, বাঁশ-কাঠ ব্যবসা, প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন ইত্যাদি বিভিন্ন
প্রজেক্টও সেনাবাহিনীর নখদর্পনে। সেনাবাহিনীর এমন ভূমিকা নিঃসন্দেহে সমগ্র দেশের জন্য
অশনিসংকেত।
বিশেষ করে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে গণতান্ত্রিক পথ রুদ্ধ করে দিয়ে
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন কায়েম করা ও পাহাড়িদের ওপর জবরদস্তিমূলক খবরদারি করা
একটি দেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কোনভাবেই কর্তব্য হতে পারে না। সুতরাং, পাহাড়িদের ওপর
গণহত্যা, নারী ধর্ষণ ও সাম্প্রদায়িক হামলায় সেটলারদের লেলিয়ে দেওয়া এবং নেতৃত্ব দেওয়া
সেনাবাহিনীর প্যাসিফিকেশন পলিটিক্স বা সম্প্রীতির রাজনীতির বিরুদ্ধে পাহাড়ি জনগণকে
সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে এবং পাহাড়িদের ওপর দমন-পীড়ন নীতির বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে
তুলতে হবে। অন্যথায়, এর থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
* সোহেল চাকমা, সাধারণ সম্পাদক. পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
