""

অক্টোবর মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিপূর্ণ অবরোধে হামলাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ

রাঙামাটির সাজেকে সেনাবাহিনীর হামলা ও নির্যাতনের শিকার কয়েকজন।


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

গত অক্টোবর মাসে পাবত্য চট্টগ্রামে শান্তিপূর্ণ অবরোধে সেনাবাহিনীর হামলাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে ইউপিডিএফের মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেলের মাসিক রিপোার্ট “পরিবীক্ষণ’-এ। গতকাল (২ নভেম্বর ২০২৬) এই রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়।

রিপোর্টে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়, “পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় বাহিনী বিশেষত সেনাবাহিনী ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত করে যাচ্ছে। তারা সাধারণ পাহাড়ি জনগণের ওপর হামলা, অন্যায় দমন-পীড়ন, বেআইনিভাবে ঘরবাড়িতে তল্লাশি, অভিযানের নামে ভয়ভীতি প্রদর্শন ছাড়াও জেএসএস সন্তু গ্রুপ ও ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের মদত দিয়ে অপরাধমূলক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, যা এখন প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

“গত অক্টোবর মাসে রাঙামাটির সাজেকে সেনাবাহিনী শান্তিপূর্ণ অবরোধে অংশগ্রহণকারী জনতার ওপর হামলা, বেপরোয়া লাঠিপেটা ও গুলিবর্ষণ করে। সাজেক থেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ কয়েকটি দাবিতে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন নামে দুটি সংগঠন অনির্দিষ্টকালের এই অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে। সেনাবাহিনীর সদস্যদের বেপরোয়া হামলা ও লাঠিপেটায় কয়েকজন গুরুতর আহতসহ অন্তত ৭৮ জন নারী-পুরুষ আহত হয়েছেন। হামলাকালে সেনারা উজোবাজারে দোকানপাট-বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এতে ৪৯টি দোকান-বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। “এছাড়া সেনারা জনগণের ব্যবহৃত ১৭টি এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে যায় এবং সেনাদের ধাওয়ায় পালানোর সময় ১৫টি মোবাইল ফোন (১টি এন্ড্রয়েড ও ১৪টি বাটন) নষ্ট হয় বা হারিয়ে যায়। এতে সর্বসার্কুল্যে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয় বলে জানা গেছে।

“এ ঘটনার পর গত ২৬ অক্টোবর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির দুই এমপি, দুই জেলা প্রশাসকসহ সরকারের একটি প্রতিনিধি দল আন্দোলনকারীদের সাথে বৈঠক করলেও তা সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে।

“আলোচ্য মাসে সেনাবাহিনীর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪ জন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে নারী, অসুস্থ ব্যক্তিও রয়েছেন। ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩ অক্টোবর খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়িতে ঠ্যাঙাড়ে দুর্বৃত্তদের সাথে নিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অপারেশনে যায় এবং বসন্ত চাকমা ও বৃষ কুমার চাকমা নামে দুজনকে শারীরিক নির্যাতন ও ধরে নিয়ে হয়রানি করে। এ সময় সেনারা অসুস্থ এক শিশুকে (বৃষ কুমার চাকমার নাতি) ওষুধ খাওয়াতে বাধা প্রদান করে।

“অপর দুটি ঘটনা ঘটে রাঙামাটির সাজেকে। গত ২২ অক্টোবর খাগড়াছড়ি থেকে অসুস্থ স্বজনকে দেখভাল করে বাড়ি ফেরার সময় সাজেকের উজোবাজারে পৌঁছলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সমাপ্তি চাকমা নামে এক নারীর ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালায়। অন্য এক ঘটনায় গত ২৫ অক্টোবর চিকিৎসার জন্য খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে যাওয়ার পথে উজোবাজারের পার্শ্ববর্তী কাচলং সেনা ক্যাম্পে আটকিয়ে লাদেন চাকমা নামে এক ব্যক্তিকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। এর আগে ২২ অক্টোবরও সেনারা তার ওপর নির্যাতন চাালিয়েছিল।

“অক্টোবর মাসে সেনাবাহিনী অন্তত ১০টির অধিক বাড়িতে হয়রানিমূলক তল্লাশি চালিয়েছে। এছাড়া সাজেকের মাচলঙে ঝর্ণা চাকমা নামে এসএসসি পরীক্ষার্থী এক ছাত্রীকে আটকের চেষ্টা চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাকে আটকের জন্য সেনারা তাদের সাথে নারী পুলিশ সদস্য নিয়ে গিয়েছিল বলে জানা যায়।

“এছাড়া রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির ৬টি স্থানে সেনা অভিযান বা তৎপরতা চালানো হয়। অভিযানের সময় রাঙামাটির বন্দুকভাঙায় এক পাহাড়ির জুমখেত নষ্ট করে দেওয়া এবং সাজেকের মাচলঙ চিল্যেতুলি এলাকায় একজনের বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে লংগদুর কাট্টলীর আমবাগান নামক এলাকায় অভিযানের সময় সেনারা বেপরোয়া গুলিবর্ষণ ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করে এলাকার জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে জেএসএস সন্তু গ্রুপকে সেখানে অবস্থান নিতে সহযোগিতা প্রদান করে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

জেএসএস সন্তু গ্রুপের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়, “পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি বা জেএসএসের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।

“গত অক্টোবর মাসে সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের হাতে চার ব্যক্তি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে জহলাল ত্রিপুরা নামে মানসিক ভারসম্যহীন ২৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তিও রয়েছেন। গত ১৩ অক্টোবর পানছড়ির কাতালমুনি পাড়ায় এ ঘটনাটি ঘটে। অপর ঘটনায় নির্যাতনের শিকার হন সাজেকের থালকুম্ভ গ্রামের বাসিন্দা রিপন চাকমা, সাধন বিকাশ চাকমা ও চিত্তিগুলো চাকমা। গত ৩১ অক্টোবর রাতে এ নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

“এছাড়া সাজেকে সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কারণে বাবুধন চাকমা, মিলন চাকমা, জিকু চাকমাসহ কয়েকজনকে এবং চট্টগ্রামে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের আয়োজিত বিশেষ কনভেনশনে অংশগ্রহণের অভিযোগে দীঘিনালায় তিন ব্যক্তিকে সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা প্রাণনাশের হুমমি প্রদান করে বলে জানা গেছে।

“সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অক্টোবর মাস জুড়ে রাঙামাটির সাজেক, খাগড়াছড়ির পানছড়ি এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাস চালিয়েছে এবং বর্তমানেও সেখানে তাদের সশস্ত্র তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া রাঙামাটি সদর উপজেলার বন্দুভাঙার ত্রিপুরাছড়া ও লংগদু এলাকায়ও তারা সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে জনগণকে জুলুম ও বিভিন্নভাবে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

“অন্যদিকে, বন্দুকভাঙার ত্রিপুরাছড়া গ্রামের জনগণের রান্না করে দেওয়া ভাত ঝিরিতে ফেলে নষ্ট করে দেওয়া এবং সাজেকে জুমচাষী স্বামী-স্ত্রীকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ, এক ব্যক্তির বাড়ির জিনিসপত্র ভাঙচুর ও কাপড়-চোপড় পুুিড়য়ে দেওয়া, বিভিন্ন গ্রাম থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া ও বিহারের মাঠ দখল করে বাঙ্কার বানিয়ে অবস্থানসহ বিভিন্ন অপতৎপরতা চালানোর অভিযোগ উঠে এসেছে সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদর বিরুদ্ধে।”

রিপোর্টে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত সেনাবাহিনী তাদের সৃষ্ট সশস্ত্র ঠ্যাঙাাড়ে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে খুন, অপহরণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচাালনা করছে।

“গত অক্টোবর মাসে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর যোগসাজশে ইউপিডিএফ কর্মীদের ওপর একটি সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। গত ২৯ অক্টোবর খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলাধীন মাটিরাঙ্গা ইউনিয়নের অন্তর্গত ধুল্যা গ্রামে এ হামলার ঘটনাটি ঘটে। হামলায় ইউপিডিএফের দুজন কর্মী কোন রকমে সরে গিয়ে প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।

“এছাড়া আলোচ্য মাসে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের হাতে বিপিন ত্রিপুরা নামে এক ব্যক্তি (মোটর সাইকেল চালক) অপহরণের শিকার হন। গত ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের দেওয়ান পাড়ায় এ ঘটনাটি ঘটে। দীঘিনালার বাঘাইছড়ি দুঅর নামক স্থানে গত ১৪ অক্টোবর গভীর রাতে সংঘটিত অপর এক ঘটনায় ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীরা কালাচান চাকমা ও বিজয় কুমার চাকমা নামে দুই ব্যক্তির বাড়িতে তল্লাশি চালায়। তল্লাশিকালে সন্ত্রাসীরা কালাচান চাকমাকে মারধর করে এবং তার কাছ থেকে একটি বাটন মোবাইল ফোন ও তার শালিকা জামাইয়ের কাছ থেকে একটি এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নারীর ওপর সহিংসতা তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, “গত অক্টোবর মাসে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে বান্দরবানে। এক মারমা তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ অভিযুক্ত শৈক্যচিং মারমা নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বান্দরবান জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক বলে জানা গেছে।”

রিপোর্টে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের অন্যায় কর্মকাণ্ড বিষয়েও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, “পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ করে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলীকদম এলাকায় রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ও তাদের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর তৎপরতার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

“গত অক্টোবর মাসের ২৫ তারিখ রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠন আরএসও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার জালিয়াপাড়া/জাল্যা পাড়া (প্রকারান্তরে পানছড়ি/পালাইংগ্রী) নামক মারমা অধ্যুষিত গ্রামে ৩৫টি মারমা পরিবারকে উচ্ছেদ করে গ্রামবাসীদের গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন সম্পদ লুটপাট ও পুরো গ্রামটি বেদখল করে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ফলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে গ্রামটির কিছু বাসিন্দা সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন এবং আরো কিছু পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নাইক্ষ্যংছড়ি সদরের মারমা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গেছে।”



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments