বিশেষ প্রতিবেদক, সিএইচটি নিউজ
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর একজন সংগঠক পুলক চাকমা(৪২) আজ বুধবার (৩ জুন ২০২০) দুপুরে খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দায়েরকৃত বেশ কয়েকটি মিথ্যা মামলায় দীর্ঘ ২ বছর যাবত কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছিলেন।
০৩ জুন ২০২০, বুধবার
![]() |
| সমাবেশে বক্তব্যদানরত পুলক চাকমা। ফাইল ছবি |
জানা গেছে, আজ দুপুরে তিনি বুকে ব্যথাজনিত কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর মৃত্যু হয়। হাসপাতালে পৌঁছার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। কী কারণে তাঁর মৃত্যু হলো এবং কারা কর্তৃপক্ষের কোন গাফিলতি ছিল কিনা তা সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তবে গ্রেফতারের পর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের কারণে তাঁর শরীরের ওপর যে খারাপ প্রভাব পড়েছে সেটাও এই মৃত্যুর অন্যতম কারণ হতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
পুলক চাকমা খাগড়াছড়ি শহরের মহাজন পাড়ার বাসিন্দা চম্পলাল চাকমার ছেলে। তাঁর পুরো নাম পুলক জ্যোতি চাকমা। তিনি ছাত্র অবস্থা থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এরপর তিনি ইউপিডিএফের সাথে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় একনিষ্টভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আর এজন্য তাকে বার বার শাসকের রোষানলে পড়তে হয়েছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁকে অন্তত তিন বার গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে। সর্বশেষ তাকে কারাগারেই মৃত্যুবরণ করতে হলো!
![]() |
| গ্রেফতাারের পর পুলিশের হেফাজতে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় পুলক চাকমা। ফাইল ছবি |
প্রথমবার তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন সম্ভবত ২০০৫ সালে খাগড়াছড়ি সদরের স্বনির্ভর এলাকা থেকে। তখন তিনি ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। সে সময়ও তাকে বেশ কিছু সময় জেলে অন্তরীণ থাকতে হয়েছে।
এরপর ইউপিডিএফের হয়ে জুম্ম জনগণের অধিকারের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে ২০১৭ সালের ৮ মে তাকে কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া এলাকা থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা গ্রেফতার করে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠায়। বেশ কয়েক মাস জেল খাটার পর তিনি জামিনে মুক্তি লাভ করেন। এরপরও তিনি দমে না গিয়ে আবার নতুন উদ্যোমে দলীয় কাজে যোগ দেন এবং খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়িতে দায়িত্ব পালন করতে যান। ২০১৮ সালের ৩০ মে সেখানে আবারো সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের পর মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেয়।
শেষবার গ্রেফতারের পর তাঁর বিরুদ্ধে নতুন আরো বেশ কিছু মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা রুজু করা হয়। এসব মিথ্যা মামলায় তিনি দীর্ঘ ২ বছর যাবত কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছিলেন। ইতোমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত প্রায় সব মামলা আদালত থেকে জামিন হলেও ষড়যন্ত্রমূলক কারণে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়া একটি মামলার জামিন আটকে দিয়ে তাঁকে বন্দি করে রাখার বন্দোবস্ত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন বন্দি তথা নাগরিকের আইনের আশ্রয় নিয়ে জামিন লাভ ও কারগার থেকে মুক্তি পাওয়ার অধিকার তার সাংবিধানিক অধিকার। সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে বলা আছে “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী”।
এতে ৩১ নং অনুচ্ছেদে আরো বলা আছে “আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার। বিশেষত: আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোন ব্যাক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে”।
কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে এর উল্টোটাই দেখা যায়। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে অনেক কারাবন্দি নাগরিক আইনের আশ্রয় নিয়ে আদালত থেকে জামিন পেলেও তাদের মুক্তি মিলছে না। তাদেরকে কারাফটক থেকে পুনরায় গ্রেফতার করে নতুন নতুন মামলা দিয়ে আবার কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আর তাদের ওপর চালানো হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। যা স্পষ্টতই সাংবিাধানিক অধিকার ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
এখানে সন্দেহাতীতভাবে এটা বলা যায় যে, যদি আদালতের দেওয়া জামিন মোতাবেক পুলক চাকমাকে মুক্তি দেওয়া হতো তাহলে হয়তো তাঁর এমন মৃত্যু হতো না। কিন্তু রাষ্ট্র তাঁকে মুক্তি না দিয়ে ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আটকে রেখে মৃত্যুর মুখেই ঠেলে দিয়েছে। কাজেই, তাঁর এই মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্র কোনভাবেই দায় এড়াতে পারে না।
-----

