""

আলুটিলায় মসজিদ নির্মাণ সম্পর্কে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য প্রসঙ্গে




মন্তব্য প্রতিবেদন


গতকাল ১০ মে রবিবার খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো: আনোয়ার সাদাত দাবি করেছেন আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে যা নির্মাণ করা হচ্ছে তা হলো একটি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স। তিনি মসজিদ নির্মাণের তথ্যটি সরাসরি স্বীকার বা অস্বীকার না করে বলেছেনে, এই কমপ্লেক্সে নামাজের স্থানও থাকবে। তার এই বক্তব্য বেশ কিছু বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রথমত, পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন হলো জেলা পরিষদের এক্তিয়ারভুক্ত একটি বিষয়। অথচ সেখানে জেলা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে পর্যটনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে ও এখন মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হচ্ছে। মসজিদ নির্মাণ বিষয়ে ব্যাখ্যাও আমরা জেলা প্রশাসকের কাছ থেকেই পাচ্ছি।

দ্বিতীয়ত, যে জমিতে মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সের নামে মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে সে জমির মালিক ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরার ছেলে অপু ত্রিপুরা। এখানে তার একটি আম বাগান ছিল বলে জানা যায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তার উক্ত জমি অধিগ্রহণ করে একটি মসজিদ নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তাদের বাধার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি।

তৃতীয়ত, পর্যটনের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সেনসিটিভিটি তথা তাদের সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার, ঐতিহ্য, প্রথা ইত্যাদির প্রতি গুরুত্বসহকারে লক্ষ্য রাখা হয়, সম্মান দেখানো হয়। অথচ আলুটিলা কিংবা পাহাড়ের অন্যান্য জায়গায় পর্যটনের ক্ষেত্রে এই লোকাল সেনসিটিভিটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হচ্ছে। এখানে পর্যটনের নামে যা হচ্ছে তা হলো সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আগ্রাসন।

লোকাল সেনসিটিভিটির বিষয়টি উপেক্ষা করার কারণে অনেক দেশে স্থানীয়দের মধ্যে পর্যটনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। অনেক পর্যটন শহরে বড় বড় গণ বিক্ষোভও হয়ে থাকে। এমনকি কোন কোন দেশে পর্যটকদের ওপরও হামলা হতে দেখা যায়।

চতুর্থত, প্রকৃত প্রস্তাবে আলুটিলায় পর্যটন হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানেও পর্যটন চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। সম্পূর্ণ উপনিবেশিক কায়দায় পর্যটন করা হচ্ছে। যদি এখানে পর্যটন হতো, তাহলে স্থানীয় জনগণের মতামত নেয়া হতো। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর, সুশীল সমাজের মতামত নেয়া হতো।

পাহাড়ে যে সব জায়গায় পর্যটন হয় সেগুলো সবই পাহাড়ি অধ্যুষিত এলাকা। অথচ এতে তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যবস্থাপনায় তারা নেই। পর্যটকদের কাছে স্থানীয় পাহাড়িরা নিজেদেরকে কীভাবে উপস্থাপন করবে সে বিষয়ে তাদের কোন হাত নেই।

কয়েকদিন আগে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক আলুটিলা থেকে পাহাড়ি (ত্রিপুরা) দোকানদারদের উচ্ছেদের নোটিশ দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে সিএইচটি নিউজে রিপোর্ট প্রকাশ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার পর উচ্ছেদ কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সেই সাথে এটাও জানা গেছে যে, পাহাড়ি দোকানীদের উচ্ছেদের নোটিশ দেয়া হলেও সেখানে অস্থানীয় বাঙালিদেরকে দোকান খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে যদি স্থানীয়রা দোকান দিতে না পারে, নিজেদের সংস্কৃতি-ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে না পারে, তাহলে তারা পর্যটন থেকে কীভাবে লাভবান হবে? পাহাড়ে পর্যটনের উদ্দেশ্য স্থানীয়দের লাভের জন্য নয়, বরং তাদেরকে উচ্ছেদের জন্য – এই অভিযোগ যে অসত্য নয় তা আলুটিলায় পাহাড়ি দোকানীদের উচ্ছেদের নোটিশ থেকে ও আরও নানাভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

এটা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ধরে নেয়া হয় যে, যেহেতু পাহাড়ি অধ্যুষিত এলাকায় পর্যটন হয়, তাই পর্যটন ব্যবস্থাপনার ওপর পাহাড়িদের অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। উপনিবেশিক কায়দায় পর্যটন করা হলে তা দু’একজন দালাল ছাড়া কেউ মেনে নেবে না। ব্রিটিশরা তাদের ডেরায়, ট্রেনের কামরায় ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ’ করেছিল। আলুটিলা থেকে ত্রিপুরা দোকানদারদের উচ্ছেদের নোটিশ ব্রিটিশদের এই বর্ণবাদী নোটিশের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

পঞ্চমত, পর্যটন কেন্দ্র কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়। মানুষ পর্যটন স্থানে বিনোদনের জন্য, শিক্ষার জন্য যায়, ধর্মচর্চা করার জন্য নয়। পর্যটন কেন্দ্রে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থাকা বেমানান এবং সেটা কেউ আশাও করে না। সুতরাং আলুটিলায় মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সের নামে মসজিদ নির্মাণের নিগূঢ় উদ্দেশ্য পর্যটন নয়, ভিন্ন কিছু।

ষষ্ঠত, পার্বত্য চট্টগ্রামে যতই পর্যটনের বিস্তৃতি ঘটছে, ততই বেশি করে বহিরাগত সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে। এতে স্থানীয় সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে বান্দরবান জেলায়। সেখানে পর্যটকরা যে ধর্মে বিশ্বাস করে সেই ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে স্থানীয়দের কাছে তারা অবাধে টাকাপয়সা বিলিয়ে দিচ্ছে – এমন দৃশ্য সোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল করা হচ্ছে। আর স্থানীয়রাও আত্মমর্যাদাবোধ হারিয়ে ফেলছে, নিজেদের ধর্ম সংস্কৃতি বিসর্জন দিচ্ছে। এই হলো স্থানীয়দের লাভ করা পর্যটনের সুফল।

শেষ কথা হলো, পর্যটনের ক্ষেত্রে লোকাল সেনসিটিভিটিকে সম্মান করতে হবে। যে পর্যটন স্থানীয় সংস্কৃতি, ধর্মাচরণ ও রীতিনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়, সেই পর্যটন না করাই ভালো বলে আমরা মনে করি। 

১১.০৫.২০২৬


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments