সিএইচটি নিউজ ডেস্ক
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শিক্ষাবিদ এবি খীসা (অনন্ত বিহারী খীসা)-এর প্রয়াণ হয় ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি
তারিখে। এরপর তাঁর প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকী (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২) উপলক্ষে ‘পাইওনিয়ার’
নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। উক্ত স্মরণিকায় তাঁর গুণমুগ্ধ ছাত্র ও অনুরাগী-অনুসারীগণ
তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন।
নিভৃতচারী ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত প্রচারবিমুখ ও স্বল্পভাষী এবি খীসা শিক্ষাদানের
বাইরেও পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংগঠন বিকাশে সক্রিয় ছিলেন, লেখকগণ তার ওপর কিঞ্চিত আলোকপাত করেছেন। পার্বত্য
চট্টগ্রামের আগের প্রজন্মের রাজনীতি বুঝতে সহায়ক হবে বিবেচনা করে এবি খীসা’র ৫ম প্রয়াণ
বার্ষিকী (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) উপলক্ষে ধারাবাহিকভাবে কয়েক জনের লেখা এখানে প্রকাশ
করা হবে। লেখকগণ প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্বও
দিয়েছেন।
পাকিস্তান আমলে এবং বাংলাদেশের সূচনা লগ্নে জাতীয় অস্তিত্ব ও অধিকার নিয়ে
শঙ্কিত পাহাড়িদের রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাত্র, যুবসমাজ ও শিক্ষকদের ভূমিকা সম্পর্কে আগ্রহী
গবেষক ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকগণ তা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য পাবেন।
বিভিন্ন সভা-সেমিনারে শিক্ষা ও সামাজিক নানাবিধ বিষয়ে আলোচনা করলেও এবি
খীসা তার প্রথম জীবনের রাজনৈতিক কার্যকলাপের ব্যাপারে কোথাও কোন স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা
করেননি এমনকি কোন কিছুও লিখেননি, যদিও তার লেখার হাত ছিল অনেক উচ্চমানের।
১৯৫৭ সালে মস্কোতে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক ছাত্র ও যুব উৎসবে তদানিন্তন
পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে দু’জন মনোনীত হয়েছিলেন, এবি খীসা ছিলেন তার একজন। পূর্ব পাকিস্তানের
তখনকার রাজনৈতিক অস্থির পরিবেশে উক্ত অনুষ্ঠানে তার পক্ষে অংশগ্রহণ আর সম্ভব হয়নি।
সে বছরই তিনি চট্টগ্রামের কানুনগোপাড়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘ছাত্র ও অভিভাবক
সম্মেলন ১৯৫৭’ আহ্বান করেন। সে সময় তিনি ছিলেন বিএ ক্লাশের ছাত্র। এ সম্মেলনে মানবেন্দ্র
নারায়ন লারমা (৮ম শ্রেণি, রাঙ্গামাটি স্কুল প্রতিনিধি) এক জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে সবার
নজরে আসেন। সম্মেলনটি শিক্ষা বিস্তার ও চেতনা বিকাশে গভীর ছাপ ফেলে।
তার আগের বছর ১৯৫৬ সালে কানুনগোপাড়ার শ্রীপুর মেস (চাকমা স্টুডেন্টস লজ)-এ
এবি খীসা ও মৃনাল কান্তি চাকমার উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল Chittagong Hill Tracts Hill
Students’ Association. এ সংগঠনের পক্ষ থেকে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রথম
বারের মতো “আইন পরিষদ সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন” দাবি জানানো হয়।
শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করে এবি খীসা ১৯৬৬ সালে গঠন করেন
Chittagong Hill Tracts Tribal Welfare Association.
১৯৭০ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নির্বাচন পরিচালনা কমিটি’ গঠন ও নতুন নেতৃত্ব
বিকাশে ভূমিকা রাখেন।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব প্রবর্তিত ‘বাকশাল’ শাসন ব্যবস্থায় খাগড়াছড়ি জেলায়
গভর্নর হিসেবে মং রাজা মংপ্রু সাইন ও সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল এবি খীসাকে,
যদিও তিনি আওয়ামীলীগের যুক্ত ছিলেন না। পরবর্তীতে ‘বাকশাল’ ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেলে,
হাঁফ ছেড়ে বেঁচে গিয়েছেন ঘনিষ্ঠমহলে তিনি এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন।
১৯৭৯ সালে জিয়ার অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে রাজমাতা বিনীতা
রায়ের প্রবল অনুরোধ সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এবি খীসা। অর্থবিত্ত ও ক্ষমতা তাকে তাড়িত
করেনি। তার বাড়িতে সংগঠন প্রতিষ্ঠা, আলাপ আলোচনা ও রাজনৈতিক উদ্যোগ গৃহীত হলেও তিনি
বরাবরই অন্তরালে থেকে ভূমিকা রাখতে চাইতেন, প্রকাশ্যে আসতে চাননি। ভগ্নস্বাস্থ্যের
কারণে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হওয়া তার পক্ষে সহজ ছিল না। নিজে তিনি হোমিও ওষুধ সেবন
করতেন এবং পরিচিত জনরাও তার কাছ থেকে চিকিৎসা নিতেন।
শিক্ষাদান ও সামাজিক কাজের বাইরে বাগান করা ছিল তার সখ। তিনি ১৯৭৮সালে রাষ্ট্রপতি
কৃষি পুরষ্কার (ফল বাগান সৃষ্টিতে অবদান) পেয়েছেন। তিনি একজন সৌখিন ফটোগ্রাফার ও শ্যুটারও
ছিলেন। খাগড়াছড়িতে একবার জাতীয় দিবসে শ্যুটিং-এ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা সবাইকে অবাক
করে দিয়ে তিনি চ্যাম্পিয়ন হন।
ডাক টিকেট সংগ্রহও তার ছাত্র জীবনের অন্যতম হবি ছিল। তার সংগ্রহে ছিল ভারতের
প্রাচীন দেশীয় রাজ্য ত্রিভাঙ্কুর রাজ্যের ডাকটিকেটসহ বহু দেশের ডাক টিকিট।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় খাগড়াছড়ি গোলাবাড়ি বিলের সন্নিকটে বিধ্বস্ত ব্রিটিশ
বিমানের চুম্বকও তার সংগ্রহে ছিল, ভবিষ্যতে এন্টিক হিসেবে সেটির কদর বাড়বে।#
** নীচে এবি খীসাকে নিয়ে পি.
বি. কার্বারি’র একটি লেখা তুলে ধরা হলো:
----------------------------
মি.
এ. বি. খীসা সাদা মনের মানুষ ছিলেন
পি. বি. কার্বারি*
সম্ভবত: গত শতাব্দীর পঞ্চম দশকের গোড়ার দিকে অনন্তবাবুর সাথে প্রথম দেখা
ঘটে আমার। এটা উভয়ের স্কুল জীবনে। রাঙ্গামাটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে। তখন আমি তৃতীয়
কি চতুর্থ শ্রেণীতে। তিনি কিন্তু অনেক উপরের ক্লাশে। আমাদের অবস্থান-সান্নিধ্য বা আত্মীয়-পরিচিতি
কোন কিছুই ছিলনা। বিজ্ঞানের চান্স বা দৈবযোগ তো জানি না, বুঝিনা। মনে হয় আমার পরীক্ষার
ভালো রেজাল্টের কারণে তিনি আমার প্রতি আকৃষ্ট হন। পরিশেষে সম্পর্কটা অনেকটা প্রিয়পাত্র,
একান্ত ঘরোয়া বা স্বচ্ছন্দ পর্যায়ে চলে যায়।
আমার সাথে তিনি সম্পর্কটা রেখেছিলেন অনেকটা ক্ল্যাসিক। তিনি যে আমার চেয়ে
বহু বয়সী, ক্লাশেও অনেক সিনিয়র আর রীতিমাফিক সমীহযোগ্য, তা কোনবার আমাকে ভাবতে দেননি
তাঁর আলাপচারিতা এবং জীবনাচরণে। কেননা তাঁর মধ্যে কোন ধরনের মুরব্বীয়ানা, মুন্সিয়ানা,
সামন্তীয় ছাপ বা ভাব আমি দেখিনি। ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণে গত শতাব্দীর প্রায় ৬ষ্ঠ
দশকের শুরু থেকে আমাদের জানা-শোনা ছিলো না। এরপর মনে হয় ২০১০ সনে তাঁর সাথে দেখা খাগড়াছড়ি
শহরে। এটা ঘটে প্রবীণ সদস্য সভায়। সভাকক্ষে সভার সবার পিছনে বসেছিলাম। কিভাবে যেন আমার
উপস্থিতি জানতে পেরে, তিনি এক সদস্যকে পাঠিয়ে আমাকে স্টেজে আনান। 'হারানো মানিককে ফিরে
পেলাম' বলে স্টেজে আমাকে তাঁর ডান পাশে বসান। ব্যাপারটা কাকতালীয়। যদিও আমি তাঁকে বহু
বছর যাবৎ বিস্মৃতপ্রায় রেখেছিলাম, বুঝলাম তিনি তা করেননি। তাঁর ভালোলাগার বলয় থেকে
আমাকে কোথাও ছুটে যেতে দেননি।
সন ঘটনা অনেক কিছু এখন মনে নেই। না থাকার কথা। কয়েক যুগের ব্যাপার। তবে
কিছু কিছু ঘটনা এখনও মনে আছে। আমি যখন ৩য় কি ৪র্থ শেণীতে পড়ি তখন তাঁর সাইকেলটা দিয়ে
সাইকেল চড়া বা চালানো শিখি। এই সাইকেল নিয়ে আমার নিজ গ্রাম পানছড়ীতেও একবার গেছি। তবে
সাইকেল শিখাটা পরে আমার অনেক কাজে এসেছিল। ঠিক এই ৪র্থ কি ৫ম শ্রেণীতে পড়ার সময় কোন
এক বন্ধে আমি তাঁদের মুবাছড়ি বাড়ীতে যাই। প্রায় মাসের মতো ছিলাম। তখন তাদের দোতলা মাটির
ঘর (গুদাম)। এখনও মনে আছে, একদিন অনন্তবাবু তাদের পাশের এক ধেনো জলোজমির কাছে দোনালা
১টি বন্দুক নিয়ে আমাকে শিকারে নিয়ে যান। বন্দুক দিয়ে শিকার করা শিখিয়েও দেন। সঞ্চরণরত
একটা পাঁতিহাস তাক করে ট্রিগার টিপলাম। কিন্তু লক্ষ্যভেদ করতে পারলাম না। কিন্তু তিনি
আমার পাশে উচ্চ বৃক্ষচূড়ায় তাক করে গুলি ছুঁড়লেন। অমনি একসঙ্গে ৩ কি ৪টি বড় ঘুঘু (এদ্-দাগা)
গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেল। গাছটির ফল খাচ্ছিল গাছভর্তি অসংখ্য পাখী মহোৎসবে, মুখরতায়।
এই দোতলা মাটির ঘর দেখেছি অনন্তবাবুর জিনিসপত্রাদি। থরে থরে সাজিয়ে রাখা বাংলা আর ইংরেজি
পত্রিকা। কত বছরের জমা করে রেখেছেন কে জানে? আর বিভিন্ন ধরণের বই, ঔষধের শিশি; স্তূপের
পর স্তূপ। পাতলা শরীর। সেকারণে ঔষধ খান কিনা জানিনা। কিন্তু অসুস্থতায় ভোগেন, এটা তো
কোনবার শুনিও নি। জানিও না।
তখনকার দিনে রাঙ্গামাটিতে কোন লাইব্রেরি ছিল না। বই পত্রাদি প্রায়ই পার্সেল
করে কোলকাতা থেকে আনাতে হতো। জেনেছি তিনি অত্যন্ত বই পত্রিকা পড়েন। অনেক ঘটনা টুকে
রাখেন, পেপার কাটিং রাখেন। তিনি গোছগাছ, পরিপাটি, সুবিন্যস্ত। আমি যতটুকু জানি এবং
শুনেছি, তিনি ইংরেজি জানেন। লেখার বেলায় কলম তার খুবই ফ্যাসাইল। বই লিখেছেন বলে শুনিনি।
লিটারেরি করেম্পোন্ডেল ছাড়াও তিনি অনেক ব্যাপারে লেখতেন। অনুবাদ করতেন। লেখা আর পড়ার
পরিধি তাঁর ব্যাপক, নিয়মিতও। ব্রিটিশের পরে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত শিক্ষিত লোকেরা প্রায়ই
ইংরেজি জানতো। তখন অফিস আদালতেও সর্বত্রই ছিল ইংরেজির দৌরাত্ম্য, আভিজাত্য।
স্কুলজীবনে তিনি 'দি স্টেটসম্যান' ইংরেজি দৈনিকটি পড়তেন। এছাড়া বাংলা ইংরেজি
পত্রিকাও রাখতেন। অনন্তবাবু এত ইংরেজি জানেন যে তার সহপাঠি ছাত্র বন্ধু মহলে 'স্টেটসম্যান'
নামেও তাঁর পরিচিতি ছিল। আমার এখনও মনে আছে, Preamble শব্দটি। এটার অর্থ জানতাম না।
প্রথম এই শব্দটি পাই কানুনগোপাড়ায়, অনন্তবাবুর হাতে-লেখা Hill Students
Association এর bye-laws থেকে। পরে অভিধান থেকে অর্থ জেনে নিই। সেই সময় জেনেছি ভিনি
কানুনগোপাড়ায় থাকাকালে এই ছাত্র প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক বা অফিসিয়েল তত্ত্বাবধানিক কাজগুলি
করতেন। ঢাকায় কলেজে পড়ার সময় অনন্তবাবু আমাকে ইংরেজিতে চিঠি লিখতেন। আমার এখনও মনে
আছে তাঁর পাঠানো ইংরেজি প্রবাদবাক্য: A man is known by the company he keeps. এই প্রবাদ
বাক্যটি আমার প্রথম শেখা ইংরেজি প্রবাদ বাক্য। পেপার কাটিং পাঠাতেন। বিভিন্ন কোটেশন
বা বাণী। আজ যিনি অনস্ত মাস্টার বা অনন্তবাবু নামে পরিচিত, এককালে তিনি এ.বি. খীসা
নামেও পরিচিত ছিলেন। সেই সময়ে অনেকেই নামীয় সাহেবী এব্রিভিয়েশন ব্যবহার করে নাম লিখতেন।
ব্রিটিশ বিদায় নিলেও পাকিস্তানের আমলেও ব্রিটিশের এসব রাজকীয় সংস্কৃতি সর্বত্র ছিল।
এখনও কি কম!
দূর থেকে অনন্তবাবুকে ক্লাসিক মনে হলেও, তাঁর কলেজ জীবনে এক সময় তাঁকে বেশ
রোমান্টিক দেখা গেছে, তার বেশ-ভূষা, চাল-চলনে, জীবন-যাপনে। ইয়া বড়া ঢিলেঢালা পোশাক
পড়তেন, যেন কাবুলিওয়ালা। তাঁর বন্ধু জ্ঞানলাল চাকমা (চেঙ্গিস খানের বাবা) পাঠানের পোশাক
পড়তেন আর এক বন্ধু জটিল বিহারী বীসা পড়তেন নেভির পোশাক, নেভির টুপি, সম্পূর্ণ সাদা।
নৌবাহিনীর বড় অফিসারের মতো। এটা অনেকটা বৈচিত্র্য বা ফুর্তির জন্য তাঁরা করতেন। ওই
পোশাকেই তাঁরা ট্রিও একসঙ্গে বেড়াতেন। তাঁদের আস্তানায় আমার স্বচ্ছন্দ আনাগোনা ছিল।
তাঁরা আমাকে আপ্যায়নও করতেন। বলিখেলা বা দর্শনীয় জায়গায় গেলে আমিও প্রায় সহযাত্রী হতাম।
নিয়মিত পরীক্ষা আর বৃত্তি পরীক্ষায় আমার রেজাল্ট ভাল হওয়ার সুবাদে বাসায় এবং স্কুলে
আমি স্বায়ত্তশাসিত ছিলাম। এমনিতে তখন থেকে আমার ছাত্রজীবনটা ছিল অনেকটা বোহিমিয়ান।
তাই যথা-ইচ্ছা গমনে বা যথা-ইচ্ছা অবস্থানে আমার উপর কোথাও কোন সেন্সরশিপ ছিলনা।
খাগড়াছড়িতে অনন্তবাবুর বাসায় যাই ২০১৭ শেষদিকে বা ২০১৮ সনে। আমার বন্ধু-সহপাঠি
ননীগোপাল ত্রিপুরার সঙ্গে। উদ্দেশ্য ছিল তাকে দেখে আসা। আর ২০১৭ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
'কিজিঙৎ পুগোবেল' (বাংলা-ইংরেজি অনূদিত) এবং জীবনীগ্রন্থ 'আলোর পথ দেখালো যারা' বই
দুটির সৌজন্য কপি দেয়া। তখনও তিনি শারীরিকভাবে মোটামুটি মজবুত এবং গতিশীল ছিলেন। তখন
তাঁকে বলেছিলাম, যা লিখেছেন, তা ছাপান। একটা ব্যবস্থা করা হবে। জানালেন, তিনি ছাপাতে
দিয়েছেন। কিন্তু দু'বার তিনি সংশোধন করে পাঠিয়েও বহু ভুল দেখে তিনি তা আর ছাপাতে দেননি।
আমি ইস্টার্ন মডেল স্কুলের সাথে জড়িত থাকাতে রাঙ্গামাটিতে থাকতাম। যার ফলে আমার নিজ
বাড়ি খাগড়াছড়ি শহরে খুব কম আসতাম। এই অবস্থায় পরে শুনি যে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
এত আগে যাবেন ভাবিনি।
রাশিয়া চীনে কমিউনিস্টদের বিজয়ের পরে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের খবর সারা
বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে শোষিত নিপীড়িত জাতি ও শ্রেণীর লোকদের কাছে এটা ছিল উপছে
পড়া জোয়ারের মত। অনন্তবাবুও তাঁর পূর্বসুরী ও উত্তরসূরীদের মতো এই জোয়ারের প্রভাবমুক্ত
ছিলেন না। তখন বামপন্থী রাজনীতির বই পাওয়া যেত। ভারতবিরোধী বলে চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক
ভাল থাকায় এটা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান বামপন্থীদের সক্রিয়ভাবে বা চরমপন্থায়,
প্রকাশ্য বা গোপন রাজনীতি করতে দেয়নি। সেই সময়ে বামপন্থী কমিউনিস্ট জননেতা মৌলানা ভাসানীর
আস্তানায় গিয়ে অনেকের মতো অনন্তবাবুও হয়ত নারিকেলের হুকো টেনেছিলেন। পরে রাশিয়া ও চীন
সংশোধনবাদী হয়ে যাওয়াতে এই জোয়ারে ভাটা পড়ে।
দেখেছি আনন্তবাবু হাসিমুখে কথা বলেন, যদিও তিনি অনেকটা পরিমিতভাষী, ব্যবহারে
অমায়িক, বাহুল্যবর্জিত। সহজ সরল জীবনাচার, যেন সাদা মনের মানুষ। সুশৃংখল, অবজেক্টিভ,
ধীরস্থির, আত্মনির্ভরশীল। উচ্চমধ্য পরিবারের লোক হলেও চিন্তায় চেতনায়, কর্মে সংস্কৃতিতে
অনন্তবাবু প্রগতিশীলই ছিলেন। তাই বহুমুখী জ্ঞান লাভে সবসময় সচেষ্ট ও সচেতন ছিলেন। অনন্তবাবুকে
আমি কোন সম্বোধনে 'সম্বোধন' করি নাই। গ্রামীণ বা শহুরে, বন্ধুত্ব বা আত্মীয়তা সূচক,
কোনটাই না। আমার তেমন মনে পড়ে না। আমাকেও তিনি নাম ধরে কোনবার সম্বোধন করেছেন বলে মনে
হয় না। এটা একটা কেমন যেন অদ্ভদ মনে হয়।
অনন্তবাবুর যথাযথ ভূমিকা এবং অবদান হচ্ছে শিক্ষক হিসেবে। তবে বেতনধারী চাকুরে
শিক্ষক হিসেবে নয়। পারিবারিক আর্থিক অবস্থান থেকে দেখলে তাঁর চাকুরি না করলেও চলে।
রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল বা প্রতিকূল হলে, অনেকে শিক্ষকতাকে মহান পেশা হিসেবে বেছে
নেয়। অনন্তবাবুও সম্ভবত: একারণে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মিশন-ভিশনধারী
একধরনের শিক্ষক। যার উদ্দেশ্য যুগোপযোগী শিক্ষা বিস্তার। ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং বিভিন্ন
সীমাবদ্ধতার কারণে যদিওবা তা সংস্কারবাদী, বৈপ্লবিক না। তিনি অনেকটা জনগণের শিক্ষক
মনিষীদের মতো। তাই চাকুরি শেষ হলেও, তাঁর শিক্ষকতা বা শিক্ষাদান শেষ হয় না। অনন্তবাবু
শিক্ষা বিস্তার তথা জাতীয় উন্নয়নের আদর্শের শিক্ষক। শুধু চাকুরি শিক্ষক নন। তাই তাঁকে
সমাজের উন্নয়নের জন্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদচারণা করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে
তিনি নিজেকে আমৃত্যু সম্পৃক্তও রেখেছিলেন। সবদিকের আপেক্ষিকতা বজায় রেখে এবং জীবনকে
ব্যালেন্সড রেখে কর্মময় জীবন যাপন করে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সফল সার্থক বলে আমার মনে
হয়। উপনিবেশমুক্ত স্বদেশে নয়া-উপনিবেশায়নের যুগে কোন বড় ঐতিহাসিক বিপর্যয় না ঘটলে,
আশা করি, অনন্ত মাস্টার পাড়ার সাথে অনন্তবাবুর নামও চির অক্ষত এবং চির ভাস্বর হয়ে থাকবে।
* বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক এবং অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক।
# লেখা সৌজন্যে: ‘পাইওনিয়ার’ (অনন্ত বিহারী খীসার ১ম মৃত্যুবার্ষিকীর
স্মরণিকা)
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
