সোহেল চাকমা
দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় দেশ-কাল-পাত্র ভেদে সমাজের বিভিন্ন স্তরে মানুষের
মনন-মগজে নানা পরিবর্তন সাধিত হয়। চিন্তার এই পরিবর্তন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক
আচার-বিন্যাসের পরিবর্তনের সূচনা করে। সমাজে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা হলে তা মানুষের
চেতনার মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামে
সংস্কৃতির যে পরিবর্তন বহমান তা পাহাড়িদের মৌলিক চেতনার মান বৃদ্ধি করেনি বরং এক জগাখিচুড়ি
বাঙালিয়ানা চিন্তায় নিমজ্জিত করেছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে
সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির দৈন্যদশা অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অন্যতম
একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা কারোর অস্বীকার করার জো নেই যে, রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা
বা অপসংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে সমাজে বা জাতিতে নৈতিক অধঃপতন ঠেকানো সম্ভব নয়। জুলাই
গণঅভ্যুত্থান আমাদের এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছে যেখানে শুধুমাত্র আবেগের বশবর্তী হয়ে
রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা রাজনৈতিক কোন দলকে বিচারের সুযোগ নেই। এখন সময় বস্তুনিষ্ঠ রাজনৈতিক
পাঠ ও বিচার-বিশ্লেষণ। শ্রেণী বিভাজনের কল্পে নিপীড়িত সচেতন নাগরিক সমাজকে অবশ্যই রাজনৈতিক
পক্ষাবলম্বন করে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের মূল্যায়ন করতে হবে। প্রগতি ও প্রতিক্রিয়াশীল,
ন্যায় ও অন্যায়, নিপীড়ক ও নিপীড়িত এই দুইয়ের মাঝে যেমন নিরপেক্ষতা বলতে কোনকিছুই নেই
তেমনি গণ-অধিকারবিরোধী শক্তিকে হটানোর জন্য রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বনেও কোন নিরপেক্ষতা
থাকতে পারে না। এজন্য দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট চেতনা থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
লেনিন বলেছিলেন, নির্দ্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দ্দিষ্ট বিশ্লেষণই হলো দ্বান্দ্বিকতার
মর্মবস্তু। তা ব্যতীত পার্বত্য চট্টগ্রামে সঠিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার
সংগ্রামে নেতৃত্বধারী রাজনৈতিক দল বেছে নেয়া যথেষ্ট কঠিন হতে পারে। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামে
বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্র বুঝতে হলে মার্কসবাদ বোঝার প্রয়োজন পড়ে না। চোখের
সম্মুখে যা ঘটছে সেগুলো সাদা চোখে না দেখে খানিকটা অর্ন্তদৃষ্টি প্রয়োগ করলে কোনকিছুই
আর অপরিস্কার থাকে না।
মোঘল- ব্রিটিশ সময় থেকে শোষণের শিকার হওয়া পাহাড়িদের রাজনৈতিক সচেতনতা জন্ম
নিতে অনেক বেশী সময় লেগেছিল। ফলে রাজনৈতিক দল গঠনও হয়েছিল অনেক বিলম্বে। আজও যে পাহাড়ি
জনগোষ্ঠীরা রাজনৈতিকভাবে খুব বেশী সচেতন তা বলা যাবে না, কিন্তু পূর্বের তুলনায় কিছুটা
ওয়াকিবহাল বলা যেতে পারে। একজন রাজনৈতিকভাবে সচেতন ব্যক্তি ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটি অন্যায়-শোষণের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্ম দেয়, আন্দোলিত হয় ও আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে এবং এটা আসে চেতনার
গভীরতা থেকে। কারোর দেখাদেখিতে বা আবেগের বশবর্তী হয়ে কিংবা আন্দোলনের স্রোতে পড়ে নয়।
অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সম্যক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকায় পাহাড়ের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম
আজ নানাভাবে বিভক্ত, দ্বিধাগ্রস্ত ও রাজনৈতিকভাবে দিশাহীন। অথচ তরুণ প্রজন্ম চাইলে
উদ্বুদ্ধ ধারালো চেতনায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে পরাজিত করা কঠিন কোন বিষয় নয়। জাতিগত
অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনায় আন্দোলিত তরুণ প্রজন্ম সবসময় প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর
ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পার্বত্য চট্টগ্রামেও তার ব্যতিক্রম নয়। সেজন্য সমাজে, জাতিতে
ওঁৎপেতে থাকা কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তিদের দিয়ে, অনুগত রাজনৈতিক সংগঠনকে দিয়ে শাসকগোষ্ঠী
তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত রাখার চেষ্টা করে এবং জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলকে বাধাগ্রস্ত
করার প্রচেষ্টা চালায়।
দেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাত ও বৈষম্য বিরোধী
পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন শাসকগোষ্ঠীর ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার পরও কেন ব্যর্থ হয়েছিল? কেনইবা
নতুন করে পাহাড়ি-ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে উঠতে পারেনি? এই দুটি প্রশ্নের সদুত্তর
খুঁজতে গেলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে আপামর পাহাড়ি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কারা প্রতিবন্ধক
ও কারা প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা পালন করছে তা পরিস্কার বুঝা যায়। গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬
অনুষ্ঠিত হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তা আরো স্পষ্ট হয়েছে। প্রকৃত অর্থে যারা
পাহাড়ের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সবচেয়ে বড় বাধা, যারা চায় না পাহাড়ে অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক,
যারা শুধুমাত্র নিজেদের ধন-সম্পদ, পরিবার-পরিজন সুরক্ষিত রাখতে চায়, যারা সরকারের সুযোগ
সুবিধা ভোগ করে আরাম-আয়েশে জীবন-যাপন করতে চায় কিংবা সেনা-শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে থেকে ক্ষমতা
উপভোগ করতে চায় তারা সকলেই পাহাড়ের প্রত্যেকটি আন্দোলনে বা সংঘাত ও বৈষম্য বিরোধী ঐক্যবদ্ধ
ছাত্র আন্দোলনের বিরোধীতা করেছে। আপামর জুম্ম জনগণ যখনই ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ডাক দিয়েছে,
রাজপথে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরেছে তখনই গণবিরোধী শক্তিগুলো হুমকি-ধমকি
দিয়ে, ট্যাগিং করে, বাধা দিয়ে কিংবা বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে জুম্ম জনগণকে নিবৃত্ত
করার চেষ্টা করেছে। নির্বাচনেও এইসব দালাল সংগঠনগুলো জুম্ম জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে
গিয়ে সেনা-শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করেছে। এরচেয়ে এত স্বচ্ছ ও সত্য আর কি থাকতে পারে?
বিপরীতে ছাত্র-জুম্ম-জনতা কি করেছে? তাও আমাদেরকে প্রশ্ন করতে হবে। বিপ্লব
হচ্ছে একটি সহিংসতার পথ। সেজন্য আন্দোলনে প্রতিক্রিয়াশীল, শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নতজানু
কৌশল কখনো সফলতা বয়ে আনতে পারে না। আমরা দেখেছি আন্দোলনে অনেকে প্রাণ হারিয়েছে, পঙ্গুত্ববরণ
করেছে, অনেকে স্বামী- সন্তান হারিয়েছে। প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে জুম্মদের জাতীয়
মুক্তির আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অথচ জুম্ম-ছাত্র-জনতা এখনো জুম্ম স্বার্থবিরোধী
সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কোন কর্মসূচী দাঁড় করাতে পারেনি। প্রতিক্রিয়াশীল, সেনা-শাসকগোষ্ঠীর
সহচরদের বিরুদ্ধে স্ট্যান্ড নিতে না পারাও বৈষম্য বিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আনেন্দালন ও
জুম্ম-ছাত্র-জনতার আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার একটি অন্যতম কারণ। আপামর জুম্ম জনগণকে মনে
রাখতে হবে, সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই ঐক্য আসে এবং ঐক্যের মধ্যেও সংগ্রাম পরিচালনা করতে
হয়। শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হলে সর্বপ্রথম জুম্ম দালাল,
প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে জুম্ম-ছাত্র-জনতাকে রুখে দাঁড়াতে হবে। আপামর পাহাড়ি জনগণের
প্রতিরোধে যখন দালাল প্রতিক্রিয়াশীলরা বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে, বারবার উপেক্ষিত হবে তখন
তারা কখনো সমগ্র জুম্ম জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কাজ করার সাহস করবে না। এটিই হবে পার্বত্য
চট্টগ্রামে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সমগ্র জুম্ম-জনতার প্রাথমিক বিজয়। এজন্য প্রয়োজন সঠিক
রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব। অন্যথায় জুম্ম জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন আশা করা যায় না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ দুই শিবিরে বিভক্ত। একদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত, উগ্র
ব্যবসায়ী বাঙালি বুর্জোয়া, সেনাবাহিনীর একাংশ, সেটলার, জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (এমএন),
পাহাড়ের মধ্যষত্বভোগী সুবিধাবাদী দালালগোষ্ঠী, ভাড়াটে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী (এককথায় সরকার-শাসকগোষ্ঠী),
অন্যদিকে ইউপিডিএফ ও পার্বত্য জুম্ম জনগণ। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতটা মূলত এই দুই
শিবিরের মধ্যেই চলছে। ভেবে দেখুন পার্বত্য চট্টগ্রামে ভাগ করো, শাসন করো নীতি কতটা
কার্যকর রয়েছে। শুধুমাত্র দলীয়গত স্বার্থে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে জলাঞ্জলী দিয়ে জেএসএস
(উভয়দল) শাসকগোষ্ঠীর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। সেনা-শাসকগোষ্ঠীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নই
এখন জেএসএসের (সন্তু ও এমএন) রাজনৈতিক এজেন্ডা। পাহাড়ের রাজনীতিতে এই দুই প্রতিক্রিয়াশীল
(জেএসএস) শক্তির ভয়ে জনগণ এখনো ইউপিডিএফকে নিজেদের দল বলতে সংকোচবোধ করে। ফলশ্রুতিতে
শাসকগোষ্ঠী বিভাজনের রাজনীতি সমগ্র জুম্ম-জনতার ওপর জিইয়ে রাখার সুযোগ পাচ্ছে।
বিদ্যমান পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বলতে হয়, একপ্রকার
অন্ধের কাছেই যেন আয়না বিক্রি করছে ইউপিডিএফ। জনগণ এখনো বুঝতে সক্ষম হয়নি পার্বত্য
চট্টগ্রামে অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইউপিডিএফই একমাত্র দল যে দলটি সমগ্র জুম্ম জনগণকে সঙ্গে
নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পারে। প্রয়োজনের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত
গ্রহণের দক্ষতা ইউপিডিএফ নেতৃত্বের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এটা স্বীকার্য বিষয় যে, ইউপিডিএফের
অনেক ঘাটতি, দুর্বলতা ও সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু ইউপিডিএফ কখনো জুম্ম জাতীয় স্বার্থের
বিরুদ্ধে গিয়ে শাসকগোষ্ঠীর কাছে নিজেকে সঁেপ দেয়নি। এমন কোন সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ ইউপিডিএফ
এখনো গ্রহণ করেনি যা দ্বারা জুম্ম জনগণ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। বরং জুম্ম জনগণের
নিরাপত্তা, ভূমি রক্ষা ইত্যাদির আন্দোলন করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে শত শত নেতাকর্মী
জেল-জুলুমের শিকার হয়েছে। খালি হয়েছে অসংখ্য মায়ের বুক। এতদসত্ত্বেও ইউপিডিএফ দমে যায়নি,
শত্রুর সাথে আপোষ করেনি। এখনো বীরদর্পে জনগণের সঙ্গে মিশে আত্মনিয়ন্ত্রণাধীকার প্রতিষ্ঠার
আন্দোলন জারী রেখেছে।
তখন ইউপিডিএফ গঠন হয়নি, আজ থেকে ২৮ বছর পূর্বে তৎকালীন পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলনের
নেতৃত্ব যারা পরে ইউপিডিএফ গঠন করেছিল তারা জেএসএসের পার্বত্য চুক্তির ফলাফল সম্পর্কে
১০ জুন ১৯৯৭ সালে স্বাধিকার বুলেটিনে আসন্ন চুক্তি: অধিকার প্রতিষ্ঠা না জলাঞ্জলি?
শিরোনামে এক রাজনৈতিক ভাষ্যকারের মাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এই চুক্তি বাস্তবায়ন হবে
না এবং বাস্তবায়ন হলেও পার্বত্য চুক্তি দিয়ে জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না।
এই ভবিষ্যদ্বাণী কোন তন্ত্রমন্ত্র কিংবা গণকের ভূমিকা নিয়ে তারা করেননি। এটি ছিল ইউপিডিএফ
নেতৃত্বের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও দুরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির এক বাস্তবসম্মত
রূপ। যা বর্তমান সময়ে এসে বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
সেসময় শতকরা ৯৯% মানুষের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইউপিডিএফের নেতৃত্ব পার্বত্য চুক্তির
দুর্বলতাগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। ভূমি সমস্যা সমাধান, সেটলার প্রত্যাহার,
সেনাশাসন বন্ধ, চুক্তির সাংবিধানিক স্বীকৃতি, চুক্তি বাস্তবায়নে নির্দ্দিষ্ট সময়সীমা
ও সরকারের বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি কোনকিছুই পার্বত্য চুক্তিতে সুষ্পষ্ট নয়। এছাড়া স্ব
স্ব জাতিসত্তার স্বীকৃতির পরিবর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে
স্বীকৃতির বিধান পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে জেএসএস মেনে নিয়েছে। এটিও চুক্তির অন্যতম
দুর্বলতা। সবচেয়ে বড়কথা হচ্ছে, জেলা পরিষদ আইনে বহিরাগত সেটলার বাঙালিদের পার্বত্য
চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সেটলার বাঙালিরা যদি স্থায়ী
বাসিন্দা হয় তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান যে সমস্যা “ভূমি সমস্যা” সমাধান হবে
কিভাবে? সাংবিধানিক ও আইনগতভাবেও পার্বত্য চুক্তিটি অকার্যকর। ফলে শাসকগোষ্ঠী চাইলে
এটি বাতিলও করতে পারে আবার বাস্তবায়নের আশা দেখিয়ে মূলার মতো ঝুলিয়েও রাখতে পারে। পার্বত্য
চুক্তিতে এরকম বহু অসংগতি, অপূর্ণতা ও গলদ রয়েছে যা জুম্ম জনগণকে অধিকারের পরিবর্তে
দিয়েছে বুক ভরা হতাশা, সংঘাত ও আর্তনাদ।
যাইহোক, এই নিবন্ধটির উদ্দেশ্য পার্বত্য চুক্তি আলোচনা করা নয়। বর্তমান
সময়ে পার্বত্য চুক্তি একটি ডেড ইস্যু। মূলত ইউপিডিএফ গঠনের পূর্ব থেকেই পার্বত্য চুক্তির
দুর্বলতাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছে, সমালোচনা করেছে কিংবা ২৭টি বছর ধরেই জুম্ম জনগণকে
বোঝানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু জনগণ এখনো পার্বত্য চুক্তিতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। এটি
স্পষ্ট যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি একটি অপরিপক্ক চুক্তি। যার মাধ্যমে জেএসএস নিজেদের
নেতাকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে, সুযোগ সুবিধা আদায় করতে পেরেছে, আঞ্চলিক
পরিষদ পেয়েছে ঠিকই কিন্তু জুম্ম জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। শাসকগোষ্ঠী এই পার্বত্য
চুক্তির মাধ্যমে জেএসএসের কতিপয় নেতাকর্মীদের যা দিয়েছে তার থেকেও বেশী আদায় করে নিয়েছে।
পার্বত্য চুক্তির বিনিময়ে শেখ হাসিনা আর্ন্তজাতিক শান্তি পুরস্কার নিতেও ভুল করেননি।
পার্বত্য চুক্তিকে ‘শান্তি চুক্তি’ নাম দিয়ে জেএসএস ও আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর অনেক রমরমা
ব্যবসা হয়েছে। এতে জুম্ম জনগণকে বিভ্রান্ত করা গেছে। ‘পার্বত্য চুক্তি’ তরুণ প্রজন্মকে
আন্দোলন থেকে সরিয়ে সুবিধাবাদীতে উজ্জীবিত করেছে। সেজন্য দীর্ঘ দ্ইু যুগ ধরে পার্বত্য
চট্টগ্রামে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রকৃত আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। ইউপিডিএফ
জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করার চেষ্টা করলেও জেএসএস ও শাসক-সরকার নানাভাবে আন্দোলন
দমনের চেষ্টা করেছে, প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ভ্রাতৃ সংঘাত সৃষ্টি করেছে।
যা এখনো বিদ্যমান। সুতরাং পার্বত্য চুক্তি সমগ্র জুম্ম জনগণের জন্য আশির্বাদ নয় বরং
ঘোর অন্ধকার ও ‘অভিশাপে’ পরিণত হয়েছে।
অধিকারের প্রশ্নে বৃটিশরা দীর্ঘ সময় চীনের জনগণকে আফিম খাইয়ে নিবৃত্ত রেখেছিল।
ফাঁকে তারা যতটা সম্ভব চীনের সম্পদ লুন্ঠন ও জনগণকে শোষণ করেছিল। পার্বত্য জুম্ম জনগণকেও
শাসকগোষ্ঠী ‘পার্বত্য চুক্তির’ নেশায় প্রায় ৩ দশক ধরে ঘুমে আচ্ছন্ন রেখেছে। জুম্ম জনগণের
এখনো হুশ ফেরেনি। এমনই এক চরম সংকটকালীন মূহুর্তে ইউপিডিএফ এখনো জনগণকে নিয়ে অধিকার
প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বুনছে। আপাতদৃষ্টিতে অনেকের মনে হতে পারে, পাহাড়ের সমস্তকিছু আজ
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু তা সত্য নয়। চীনে যখন জাপানি আগ্রাসন শুরু হয়, যখন জাপান
একের পর এক চীনের ভূখন্ড দখল করতে থাকে তখন চীনের জনগণও ভেবেছিল জাপান চীনের সবকিছু
দখল করে ফেলেছে। কিন্তু মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে ঠিকই চীন ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, জাপানকে পরাজিত
করে ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়। তেমনি আমাদেরও কোন কিছুই শেষ হয়ে যায়নি।
চতুর্দিকে শত্রুর ঘেরাকলে থেকে উদ্দীপ্ত সূর্যের মতো আলো বিকিরণের মহত্তম
দায়িত্ব নিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিজ্ঞ ইউপিডিএফ নেতৃত্ব। শত দমন-পীড়নে নত
না হয়ে মুক্তির নেশায় বিভোর থাকা মুক্তিকামী জনগণকে কেউই পরাজিত করতে পারে না। তাই
পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে অবশ্যই প্রকৃত আন্দোলনকারী শক্তিকে চিনতে হবে এবং ইউপিডিএফ
নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও ত্যাগের প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন থাকতে হবে। একই সঙ্গে গণপ্রতিরোধ ও
শৃঙ্খল ভাঙার মন্ত্রে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে। অন্যথায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে
প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ব্যর্থ হলে আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এটাই
সর্বাংশে সত্য।
* সোহেল চাকমা, সহ-সাধারণ সম্পাদক, পিসিপি, কেন্দ্রীয় কমিটি।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
