![]() |
| পাড়ার পাশেই আকাশচুম্বী লতানো গাছে ভরা। এখান থেকেই শুরু নিজেদের সংরক্ষণে রাখা লুংথাউসি পাড়ার পাড়াবন। ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। |
অন্য মিডিয়া ডেস্ক, সিএইচটি নিউজ
রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬
সেই ১৯৫৭ সালের কথা। তখন অন্য জায়গা ছেড়ে দু-তিনটি বম পরিবার
চলে আসে বনের আরও গভীরে; লোকালয় থেকে অনেক দূরে। সেখানে পৌঁছানোর রাস্তা বিপদজনকভাবে
খাঁড়া। কেওক্রাডং পাহাড়ের নিচে দার্জিলিং পাড়া থেকে তিন ঘণ্টারও বেশি শ্বাপদসংকুল হাঁটা
পথ পারি দিয়ে এখানে পৌঁছেছিলেন তারা।
রুমা সদর ইউনিয়নে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া কেওক্রাডংয়ের
পাদদেশের এই জায়গাটার পাহাড়-শ্রেণি একটু লবণাক্ত, হালকা নরম পাথুরে। পাহাড়ের ভাঁজে
ভাঁজে পাথর।
একটা বিশেষ সময় সেই নরম পাথরে লবণাক্ততা তৈরি হয়, তার উপরে
জন্মায় ঘাস, লতাগুল্ম। তখন হরিণ, বন্য শুকর ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী এগুলো খেতে আসত।
লবণাক্ত নরম পাথরের পাহাড়কে বম ভাষায় বলা হয় ‘লুংথাউসি’। সে
থেকেই ‘লুংথাউসি পাড়া’ নাম। এ পাড়ার প্রধান লালমিনঙাক বম; যাকে ‘কারবারি’ বলা হয়।
লালমিনঙাক বলেন, পাড়াটির যখন গোড়াপত্তন হয়; তখন আদিবাসী রীতি
মেনেই জীবনধারণের প্রয়োজনে পাড়াসংলগ্ন একটি প্রাকৃতিক বন গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। প্রায়
৭০ বছরে ধরে বংশপরম্পরায় লালিত-পালিত হচ্ছে সেই প্রাকৃতিক বন। পাড়ার নামে বনটির নামকরণ
হয়েছে ‘লুংথাউসি পাড়াবন’।
![]() |
| পাড়াবনের ভেতর দীর্ঘ লম্বা কয়েকটি গাছ; যার বয়স ৭০ থেকে ৮০ বছর হবে (গাছের বয়স কারবারি দেওয়ার হিসাবে। গাছের নাম জানা যায়নি।) ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম |
বান্দরবান জেলায় সবচেয়ে পুরনো পাড়াবনের মধ্যে এটি একটি। আয়তনের
সঠিক কোনো হিসাব না থাকলেও কারবারি লালমিনঙাক বমের ধারণা, ২০০ একরের কম হবে না।
বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বন দিবস উদযাপিত হয়েছে ২১ মার্চ-শনিবার।
এ দিবসকে সামনে রেখে পাহাড়ের গহীনের এ পাড়াবন নিয়ে এ প্রতিবেদন, যা টিকে আছে সাত দশক
ধরে।
লুংথাউসি পাড়ার ২৪টি বম পরিবারের সামাজিক সম্পত্তি এই বন এখন
পাড়াবাসী, বন্যপ্রাণী ও জীব-বৈচিত্র্যের আশ্রয় ও আধারে পরিণত হয়েছে। তবে অন্যান্য পাড়ায়
পরিবার বা মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ে, সেভাবে দুর্গম অঞ্চলের এই পাড়াটি বাড়েনি। কেন
বাড়েনি?
সম্প্রতি সেই পাড়ায় গিয়ে পাড়াবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,
মূলত জুম চাষকে কেন্দ্র করে অন্যত্র চলে যাওয়ায় সেভাবে এখানে পরিবারে সংখ্যা বাড়েনি।
পাড়ার সবকটি ঘর বাঁশ ও কাঠের তৈরি। পাশে একটা ছড়া থেকে পাইপে
করে নিয়ে এসে পানির চাহিদা মেটাতে পারে সবাই। পাড়ার সব বাসিন্দাই জুমচাষি।
পাড়ার পূর্ব-দক্ষিণ সীমানা থেকে পাড়াবন শুরু। বেশ ঘন বন। বড়
গাছগাছালি রয়েছে। প্রায় শতবর্ষী গাছ আছে। কোনো কোনো গাছ মারা গেছে। কোনো গাছ ভেঙে পড়ে
আছে।
![]() |
| পাড়াবনের ভেতর দীর্ঘ লম্বা কয়েকটি গাছ; যার বয়স ৭০ থেকে ৮০ বছর হবে (গাছের বয়স কারবারি দেওয়ার হিসাবে। গাছের নাম জানা যায়নি।) ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম |
তবে কোনো কোনো গাছের সঠিক নাম পাড়াবাসীও জানে না। আরেক পাশে
কেবল ঘন বাঁশ ঝাড়। বড় জাতের প্রচুর বেতের গাছও রয়েছে।
এই পাড়াবনে বড় কোনো পাখি দেখা যায়নি। তবে বনের একটু পর পর ছোট
ছোট পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যায়।
কারবারি লালমিনঙাক বম বলেন, তার বাবার আমলে ১৯৫৭ সালে যখন পাড়ার
সূচনা হল, তখন থেকেই এ পাড়াবন সৃষ্টি করা হয়।
জীবন ধারনের জন্য পানি প্রয়োজন হবে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত
বাঁশ লাগবে। এই চিন্তা থেকে বমরা যেখানে বসবাস করে সেখানে বাধ্যতমূলকভাবে একটি নির্দিষ্ট
এলাকা নিয়ে বন সংরক্ষণ করে রাখে। যেখান থেকে কেউ ইচ্ছেমত গাছ, বাঁশ ও জ্বালানি কাঠ
সংগ্রহ করতে পারবে না।
লালমিনঙাক বলেন, “বড় কোনো গাছ কাটতে পারবে না। বাঁশ ও জ্বালানি সংগ্রহ করলেও পাড়াবনের কমিটি বা কারবারির অনুমোদিত নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই সংগ্রহ করতে পারবে। বম সম্প্রদায়ের একটা সামাজিক চর্চা হল, তারা যেদিন থেকে যেখানে বসতি স্থাপন করবে, তখন থেকেই একটা নির্দিষ্ট আয়তনে পাড়াবন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।”
পার্বত্য এলাকায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং বাস্তুসংস্থান বজায়
রেখে স্থানীয়দের জীবনযাত্রায় নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছে এই পাড়াবন বা ভিলেজ
কমন ফরেস্ট। বহুমুখী সংকটের মধ্যেও পাড়ার পাশে সংরক্ষণ করে রাখা ‘পাড়াবন’ই প্রাকৃতিক
বনাঞ্চল হিসেবে টিকে আছে এখন।
তবে সাম্প্রতিক ভ্রমণে মনে হল, পাড়াটি আর দুর্গম, নির্জন থাকবে
না। খাড়া পাহাড় কেটে গাড়ি (স্থানীয়ভাবে বলা হয় চাঁদের গাড়ি) ও মোটরসাইকেল চলাচলের উপযোগী
করে রাস্তা তৈরি করছে সেনাবাহিনীর নির্মাণ প্রকৌশল ব্যাটালিয়ন।
পাড়াবন বা ‘পাড়াবাম’
আদিবাসী কোনো একটি পাড়ায় তার আশপাশে অ-শ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চলে
একটি নির্দিষ্ট বড় এলাকা নিয়ে বনভূমি সংরক্ষণ করে রাখা হয়। মৌজা প্রধান হেডম্যান ও
গ্রামপ্রধান কারবারি এটাকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের মাধ্যমে
পরিচালিত এই সংরক্ষিত বনকে পাড়াবাসী ‘পাড়াবন’ বলে থাকেন। পাড়াবন অনেকের কাছে ‘পাড়াবাম’
ও ‘রিজার্ভ বন’ নামেও পরিচিত।
পাড়াবনের প্রাকৃতিক সম্পদ সামাজিকভাবে ব্যবহার করা হয়। পাড়াবন থেকে বনজ সম্পদ আহরণের সুযোগ আছে স্থানীয়দের। তাই এ পাড়াবনের মালিকানা সম্পূর্ণ সামাজিক। সামাজিক মালিকানার ভিত্তিতেই গড়ে উঠে যে কোনো পাড়াবন।
পাড়াবাসী মূলত গাছ, বাঁশ, জ্বালানি কাঠ ও পানির চাহিদা মেটাতে
এ ধরনের পাড়াবন ঐতিহ্যগতভাবে সংরক্ষণ করে। এই পাড়াবনের মধ্যে পাড়াবাসীর জুমচাষ করার
কোনো নিয়ম নেই। বন্যপ্রাণীও শিকার করতে পারে না কেউ। পাড়াবাসী বা বহিরাগত কেউ পাড়াবনে
এসে বণ্যপ্রাণী শিকার করে ধরা পড়লে জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
আগে থেকে পাড়াবাসী নিজেদের মত করে পাড়াবন পরিচালনা করে এলেও
১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তির পর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপি’র হাত
ধরে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কাজ করায় পাড়াবন বা ‘ভিলেজ কমন ফরেস্ট’ ধারণাটি
বেশ পরিচিতি পেয়েছে।
তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ে ১১টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের যার যার
এলাকায় এই পাড়াবন রয়েছে। সম্প্রদায় ভেদে ধারণাগত কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও সংরক্ষণ ও ব্যবহার
পদ্ধতি প্রায় একই রকম।
২০ থেকে হাজার একরের বন
পার্বত্য চট্টগ্রামে কয়েকটি ক্যাটাগরিতে বনাঞ্চল রয়েছে। এর
একটি ‘অ-শ্রেণিভুক্ত’ বনাঞ্চল; যা মৌজার ভূমিকে বন বিভাগের ভাষায় অ-শ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল
বলা হয়।
এছাড়া রয়েছে ‘রক্ষিত বনাঞ্চল’; সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মতই ‘রক্ষিত
বনাঞ্চল’। তবে এই বনে প্রবেশে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মত কড়াকড়ি থাকে না।
‘সংরক্ষিত বনাঞ্চল’ বনবিভাগ কঠোরভাবে সংরক্ষণ করে রাখে। বনবিভাগ
অনুমতি ছাড়া এই বনে প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
সাধারণত একটা পাড়াবন ২০ একরের নিচে হয় না। হাজার একরেরও হতে
পারে। তার কারণ পাড়াবন মূলত প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের জন্য। এটি পাড়ার পাশে কিংবা
পাড়ার অদূরে নির্দিষ্ট সীমানার আয়তনে সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
পাড়াবনে শতবর্ষী গাছগাছালি, বিভিন্ন বন্যপ্রাণি, জলজ, স্তন্যপায়ী, নানা রকম উদ্ভিদ, লতাগুল্ম ও পানির উৎস থাকতে হয়। সে কারণে পাড়াবন সংরক্ষণের জন্য একটি বিশাল এলাকাজুড়ে বনভূমির প্রয়োজন হয়।
কত পাড়াবন
পাড়াবন রক্ষণাবেক্ষণ, সংরক্ষণ এবং তদারকি করার জন্য তিন পার্বত্য
জেলা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিসিএফ নেটওয়ার্ক নামে একটি কমিটি রয়েছে। তার মধ্যে জেলা
ও উপজেলা পর্যায়েও কমিটি রয়েছে।
ভিসিএফ নেওয়ার্ক কমিটি থেকে পাওয়া তথ্যমতে, রাঙ্গামাটি জেলায়
ভিসিএফের সংখ্যা ১৬২টি এবং বান্দরবান জেলায় ১৬১টি। সবচেয়ে কম ভিসিএফ খাগড়াছড়ি জেলায়।
সেখানে মোট ভিসিএফ ৬২টি।
বান্দরবান জেলা ভিসিএফ নেটওয়ার্ক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও নাইক্ষ্যছড়ি
উপজেলা দোছড়ি ইউনিয়নে তুরুগু মৌজার হেডম্যান মংনু মারমা বলেন, বান্দরবানে সাতটি উপজেলার
মধ্যে চারটি উপজেলায় কমিটি রয়েছে। সেগুলো হল রুমা, রোয়াংছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি ও আলীকদম।
তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ে ভিসিএফ নেটওয়ার্ক কমিটি মূলত বিভিন্ন
উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে কমিটিকে সমন্বয় করা হয়। তালিকাভুক্ত পাড়াবনগুলো তদারকি করে
রাখা হয়। কোনো এলাকায় পাড়াবন নিয়ে সমস্যা হলে সেগুলো সমাধান করে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া কোনো কোনো পাড়াবন পরিদর্শন করে সংরক্ষণের জন্য করণীয়
বিষয়গুলো পাড়াবাসীদের মধ্যে সচেতনতামূলক সভা আয়োজন করা হয়ে থাকে।
![]() |
| দেখতে গাছের মত হলেও এটি কোনো গাছ নয়। গাছের পাশে বেয়ে উঠা এক ধরনের লতা। ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম |
শিকার করলে জরিমানা
কারবারি লালমিনঙাক বমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্যপ্রাণীদের
মধ্যে বন্য শুকর, হরিণ, বন মোরগ, বানর ও ঈগল পাখি রয়েছে এই পাড়াবনে। তাদেরকে সবসময়
দেখা যায়। তবে ভালুক দেখা যায় মাঝে মধ্যে। বনে ঢুকে যে কোনো বন্যপ্রাণি ও পাখি শিকার
সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পাড়াবনের আশপাশে জুমচাষ করাও নিষেধ। এই পাড়াবনটি দেখভাল করার জন্য
নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি করা হয়নি।
“পাড়ার প্রত্যেক পরিবার প্রধানই কমিটির মেম্বার। তাদের সম্মতিই
চূড়ান্ত। সবার মতামতের ভিত্তিতে বলা আছে, বনের কোনো নির্দিষ্ট এলাকা থেকে জ্বালানি
কাঠ সংগ্রহ করতে পারবে। কোনো নির্ধারিত জায়গা থেকে বাঁশ কোরোল সংগ্রহ করতে হবে। কেউ
অমান্য করে নিজেদের মত সংগ্রহ করলে জরিমানা হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে।”
পাড়াবাসী বলছে, পাড়াবনটি এভাবে সংরক্ষণ করে না রাখলে কারও ঘর
তৈরির জন্য কিংবা অন্যান্য কাজে বাঁশের প্রয়োজন হলে দূরে অন্য কোথাও থেকে সংগ্রহ করে
নিয়ে আসতে হত। অথবা কারও ব্যক্তিগত বাঁশ বাগান থেকে টাকা দিয়ে কিনতে হত। পাড়াবন থাকায়
ঘরের প্রয়োজনীয় বনজ সম্পদের চাহিদা মেটাতে পারে এখন।
বৈয়াম কিংবা ‘ফার্মার অব দ্য ফরেস্ট’
পাড়াবন (ভিসিএফ) নিয়ে র্দীঘদিন ধরে কাজ করে আসছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান
আরণ্যক ফাউন্ডেশন। বর্তমানে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বনাঞ্চলের প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার সম্প্রসারণ
প্রকল্প’ নামে একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন তারা।
এই প্রকল্পের ব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, “ভিসিএফ বা পাড়াবন
সমতলে নেই। বিভিন্ন সময় পাড়াবনে ৩০০টির বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ২৫০ প্রজাতির বেশি
পাখি পাওয়া গেছে। বন্যপ্রাণির মধ্যে বন্য শুকর, মায়া হরিণ, বানর ও ভালুক রয়েছে।
![]() |
| বড় কাটাযুক্ত বেতের গাছ। ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম |
“ধনেশ পাখিকে বলা হয় ‘ফার্মার অব দ্য ফরেস্ট’। তারা বনে যত
থাকবে বন তত বৃদ্ধি পাবে। সেই ধনেশ পাখি কিন্তু কিছু রিজার্ভ ফরেস্টে আছে। আর কিছু
আছে দুর্গম এলাকার ভিসিএফে।
“এ ছাড়া পাড়াবনে এখনও বিপন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। সাম্পান নামে
একটা গাছ আছে এটা অনেকেই জানেন না। গাছটা প্রচুর পানি ধরে রাখে। গাছটার ব্যাপারে আমি
ব্যক্তিগতভাবে প্রচার চালাচ্ছি। বাংলাদেশ ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট এবং চটগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে
ফরেস্ট্রিকে দেওয়া হয়েছে।”
কামরুল ইসলাম বলেন, “এই সাম্পান গাছটার ব্যাপারে তেমন কোনো
প্রচার নাই। এটা কিন্তু হারিয়ে যাবে। আমার দেখার মধ্যে তিন পার্বত্য জেলার এখন মাত্র
১০টি সাম্পান গাছ আছে। গর্জন ও বৈয়াম আছে মাত্র ২৬টা। একদম গণনার মধ্যে চলে আসছে। তাও
সেগুলো আছে পাড়াবনে। পানির স্তর উপরে রাখতে চাইলে এই গাছগুলো সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।
তার জন্য পাড়াবাসীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে টেকসই ব্যবস্থপনার মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে পাড়াবন
আরও সমৃদ্ধ হবে।”
সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ
পাড়াবন নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা
যায়, পাড়াবনের মাধ্যমে স্থানীয়রা উপকার পাওয়ার পাশাপাশি বন হিসেবে সংরক্ষণে বেশ কিছু
চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সামাজিক মালিকানা হওয়ায় কমিটির সদস্য ছাড়া পাড়াবাসীদের কেউ কেউ পাড়াবন
সংরক্ষণে মনোযোগী নয়। অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র কমিটি রয়েছে। তেমন সক্রিয় নয়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) পাড়াবন নিয়ে যতদিন প্রকল্প
হিসেবে কাজ করে ততদিন পর্যন্ত পাড়াবাসীরাও সক্রিয় থাকে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কাজ করার
মানুষও আর থাকে না।
পাড়াবন টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জগুলো
# পাড়াবন মূলত সংশ্লিষ্ট পাড়ার কারবারির সুপারিশের মাধ্যমে
হেডম্যান থেকে মৌখিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সামাজিক মালিকানা বন। কিন্তু লিখিত কোনো নথিপত্র
নেই।
# অনেক পাড়াবনে সীমানা পিলার দেওয়া থাকে না। কোনো পাড়াবন ৩০০
একর কিংবা ৪০০ একর বলা হলেও তাদের পাড়াবন ঠিক কোন সীমানা পর্যন্ত তা জানা থাকে না।
# অনেক পাড়াবন কেবল কমিটিকেন্দ্রিক। বাকি পাড়াবাসীদের সম্পৃক্ততা
কম। ফলে পাড়াবাসীর অনেকেই ‘সামাজিক মালিকানা’ হিসেবে অনুভব করে না।
# কিছু পাড়াবন কমিটি এনজিও প্রকল্প মেয়াদ পর্যন্ত থাকে। প্রকল্প
শেষ হলে পাড়াবন সংরক্ষণের উদ্যোগ থেমে যায়।
# পাড়াবনের শতবর্ষী গাছের নাম কিছু কিছু সম্প্রদায়ের নিজেদের
ভাষায় জানা নেই।
# দুর্গম এলাকায় সড়ক নির্মাণের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুবিধা
হওয়ায় গাছ কেটে বিক্রির আশঙ্কা রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন কমিটির
বান্দরবান জেলা সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, “যে সময় প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে,
বনভিাগের সংরক্ষিত বন উজাড় হচ্ছে- তখন পাড়াবাসীরা নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের উদ্যোগ
পাড়াবন সৃষ্টি করেছে।
“গৃহ নির্মাণ থেকে শুরু করে যাবতীয় বনজ সম্পদের চাহিদা মেটাচ্ছে
এই পাড়াবনের মাধ্যমে। পানির সংকট সমাধানে পাশাপাশি জীববৈচিত্র রক্ষা পাচ্ছে। কিছুটা
হলেও ফিরে পাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে গ্রামীণ বন ব্যবস্থাপনায়
পাড়াবাসীদের এই মহতি উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করা দরকার।”
বান্দরবান বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. তৌফিকুল ইসলাম
বলেন, “এখানে এসে কয়েকটি ভিসিএফ (পাড়াবন) পরিদর্শন করে দেখেছি। কোনোটা ভালো আছে; আবার
কোনোটা ভালো নেই। যেখানে পাড়াবাসী সচেতন, সক্রিয় সেগুলো ভালো অবস্থায় আছে। তারা সেখান
থেকে বনজ সম্পদ আহরণ করে নিজেদের মত কাজে লাগাতে পারছে।
“বনজ সম্পদ, প্রাণ-বৈচিত্র্য ও প্রাণ-প্রকৃতি যাই বলি না কেন, সবকিছু নির্ভর করছে বন সংরক্ষণের উপর। পাড়াবন ব্যবস্থাপনা যেহেতু সম্পূর্ণ স্থানীয়দের ব্যাপার। সে কারণে একটা ভিসিএফ কেমন হবে সেটা তাদের সংরক্ষণ করে রাখার উপর নির্ভর করে।”
প্রতিবেদন: উসিথোয়াই মারমা, সৌজন্যে: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।




