""

পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন মেনে নিতে বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পিসিপি


ঢাকা প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশে বসবাসরত সকল সংখ্যালঘু জাতিগুলোকে নিজ নিজ জাতিগত পরিচয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও প্রথাগত ভূমি অধিকার নিশ্চিতসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জনগণের ন্যায্য দাবি পূর্ণস্বায়ত্তশাসন মেনে নেওয়ার জন্য বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)।

আজ শুক্রবার (৩ এপ্রিল ২০২৬) বিকাল ৫টায় ২৮তম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল পরবর্তী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাস বিরোধী রাজু ভাস্কর্যে আয়োজিত ছাত্র সমাবেশে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ এই আহ্বান জানান।

সমাবেশের আগে একটি মিছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাস্কর্যে এসে মিলিত হয়। 

“পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের উস্কানি, রুখে দাঁড়াও গণতান্ত্রিক শক্তি” এই আহ্বানে এবং “অব্যাহত সেনা অভিযান দমন-পীড়ন বন্ধ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত কর” এই দাবিতে আয়োজিত ছাত্র সমাবেশে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নবগঠিত কমিটির সভাপতি সমর চাকমার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সোহেল চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাবেক সভাপতি অমল ত্রিপুরা ও গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সমন্বয়ক দীলিপ রায়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক রোনাল চাকমা। এসময় সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি ছয়েদুল হক নিশান, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের সহ-সভাপতি নাঈম উদ্দীন।

সমাবেশে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃবন্দ বলেন, ‘স্বাধীনতর ৫৫ বছর পরেও এদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘু জাতিগুলোর সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তাদেরকে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদেরকে হেয় করা হয়েছে। তাদের জাতিগত পরিচয় মুছে দিতে বাঙালি হয়ে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাদের জাতিগত পরিচয় ও অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।’

নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশে বসবাসরত সকল সংখ্যালঘু জাতিগুলোকে নিজ নিজ জাতিগত পরিচয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং তাদের প্রথাগত ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নতুন বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

তারা আরো বলেন,‘বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি জনগণের ওপর নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনা ও দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে। অতীতে বিভিন্ন সরকার পাহাড়ের সমস্যাকে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে সামরিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছে। ১৯৯৭ সালে জনসংহতি সমিতির সাথে আওয়ামী লীগ সরকার একটি চুক্তি করলেও সমস্যার প্রকৃত সমাধান হয়নি। এখনো সেখানে অতীতের মতো সেনাশাসন বলবৎ রাখা হয়েছে।’

তারা স্পষ্টভাবে বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সমস্যা সামরিক শাসন কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এই সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। তাই সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান সেনাশাসন প্রত্যাহারপূর্বক শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এবং পাহাড়িদের ন্যায্য দাবি পূর্ণস্বায়ত্তশাসন মেনে নিতে হবে।’

পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে পিসিপির নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত ১১ মার্চ ‘সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজিস, বাংলাদেশ’ আয়োজিত সেমিনারে বাংলাদেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের হুমকির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এক্তিয়ারের বাইরে রাখতে হবে বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সেনাবাহিনী ও সেটলারদেরকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে প্ররোচনা ও উৎসাহিত করার সামিল। আমরা তার এই মানবাধিকার-বিরোধী বক্তব্যের নিন্দা জানাই এবং উক্ত বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানাই।’

পিসিপির নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শাসন আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের জারি করা ১১-দফা গোপন নির্দেশনার মাধ্যমে সেনাশাসনকে বৈধ্যতা দেওয়া হয়েছিল। বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও এক ধাপ এগিয়ে সেনাবাহিনীকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের লাইসেন্স প্রদান করলেন এবং একই সাথে তাদেরকে দায়মুক্তি দিলেন।’

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন তুলে নিয়ে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করার দাবি জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘সমতলে গণতন্ত্র থাকবে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকবে সেনাশাসন, সেটা হতে পারে না। পাহাড়ি জনগণ কী অপরাধ করেছে যে, তাদেরকে সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়া হবে! এমন বৈষম্যের জন্য ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান হয়নি।’

তারা আবু সাঈদ ও মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ অভ্যুত্থানে শহীদদের বৈষম্য-বিরোধী চেতনার সাথে বেঈমানী না করার জন্য বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সমাবেশে ছাত্র জোটের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি দীলিপ রায় বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বম জাতিগোষ্ঠীকে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। একটা পুরো জাতিগোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী চিহ্নিত করে বন্দী করে রাখাটা আমরা পশ্চিম পাকিস্তান আমলে দেখেছিলাম। বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা যেভাবে নির্যাতন করেছে বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী সেভাবে পাহাড়িদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। শেখ মুজিব আমলে পাহাড়ে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, জিয়াউর রহমানের আমলে সেটলার পুনর্বাসন করেছে।

তিনি পাহাড়কে মুক্ত করতে এদেশের পাহাড় সমতলের শ্রমিক, কৃষক, নিপীড়িত জাতি ও মেহনতি মানুষের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রনেতা সমর চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ ৫ দশক ধরে চলা সেনাশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে পাহাড়িদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য পাহাড়ি জনগণ আন্দোলন করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠি ও সেনাবাহিনী পাহাড়িদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘সন্ত্রাসী’ ইত্যাদি তকমা দিয়ে নিপীড়ন চালাচ্ছে। কিন্তু আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী কিংবা সন্ত্রাসী নই, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ অংশ নিয়েছে।

তিনি ২০২৪ ও ২০২৫ সাালে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী কর্তৃক হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনার কথা তুলে ধরেন এবং কোন ঘটনারই বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, সেনাশাসন দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধান হবে না। রাজনৈতিকভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। 


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments