ডেস্ক রিপোর্ট, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
ইউপিডিএফের মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেলের মাসিক রিপোর্ট “পরিবীক্ষণ’-এ গত মার্চ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, জেএসএস(সন্তু), সেটলার কর্তৃক সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাবলীসহ নারীর ওপর সহিংস ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। গত ২ এপ্রিল ২০২৬ এটি প্রকাশ করা হয়।
রিপোর্টটিতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী দ্বারা সংঘটিত ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, গত মার্চ মাসে এক গ্রাম প্রধান (কার্বারি) ও ইউপিডিএফের এক সংগঠকসহ অন্তত ৮ ব্যক্তি আটক-গ্রেফতারের শিকার হন। এদের মধ্যে ৭ জনকে হয়রানির পর ছেড়ে দেওয়া হলেও ইউপিডিএফ সংগঠক প্রদীপ চাকমাকে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসারত থাকা অবস্থায় চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ এলাকা থেকে র্যাব-৭ এর সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করে।
আলোচ্য মাসে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক ব্যক্তি। দুই গ্রামবাসীর
বাড়িতে হয়রানিমূলক তল্লাশির ঘটনা ঘটেছে।
আরও গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে
ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত জিইয়ে রাখতে জেএসএস সন্তু গ্রুপকে গুলি সরবরাহ করার অভিযোগ করা হয়েছে।
পানছড়িতে অবস্থানরত জেএসএস সদস্যদের কাছে উক্ত গুলি তুলে দেয়া হয় বলে জানা যায়।
মার্চ মাসে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৭টি সেনা অভিযান
পরিচালিত হয়েছে। এ সময় সেনারা বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে টহল অভিযান পরিচালনা
করে। এ সময় সাধারণ জনগণকে হয়রানিমূলক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এছাড়াও সাজেকের জনপ্রতিনিধি ও মুরুব্বীরা রাঙামাটির বাঘাইহাট জোনের সেনা
কর্মকর্তার অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হন। উক্ত জোনের সেনাদের বিরুদ্ধে সাজেক কলেজে
বাংলাদেশের ৫৫তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করারও অভিযোগ রয়েছে।
জেএসএস (সন্তু) দ্বারা সংঘটিত ঘটনা তুলে ধরে এতে বলা
হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি বা জেএসএসের বিরুদ্ধে
খুন, অপহরণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
গত মার্চ মাসে জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা খাগড়াছড়ির পানছড়িতে আপন ত্রিপুরা
নামে এক ইউপিডিএফ সদস্যকে গুলি করে হত্যা, শন্তা ত্রিপুরা নামে এক নারীকে জখম, খাগড়াছড়ির
দীঘিনালা ও রাঙামাটির লংগদুতে এক নারীসহ ২ জনকে মারধর এবং কুদুকছড়ির পুটিছড়ি এলাকা
থেকে ১৯ গ্রামবাসীর মোবাইল ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও মাটিরাঙ্গার
তাইন্দং এলাকায় সেনাবাহিনীর সহযোগীতায় অবস্থান ও সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে জনমনে ভীতি
সঞ্চারসহ দীঘিনালার ধনপাদা ও লংগদুর কাট্টলীতে সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সেটলার বাঙালি দ্বারা সংঘটিত ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়েছে,
পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুনর্বাসিত সেটলার বাঙালিরা প্রতিনিয়ত পাহাড়িদের
জায়গা-জমি বেদখলে মরিয়া প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো সরাসরি সেটলারদের
পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার ফলে তারা এ ধরনের কার্যক্রম চালাতে সক্ষম হয়।
গত ১৮ মার্চ খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি ইউনিয়নের জয়সেন পাড়ায় এক
পাহাড়িকে নিজের ভোগদখলীয় জায়গায় ঘর নির্মাণে বাধা দেয় সেটলার বাঙালিরা। উদ্দেশ্য ছিল
উক্ত পাহাড়ির জমি বেদখল করা। এতে পাহাড়ি ও সেটলারদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। খবর
পেয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও তারা সেটলারদের পক্ষাবলম্বন করে বলে
পাহাড়িরা অভিযোগ করেছেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
এর আগে গত বছর উক্ত জায়গাটি সেটলাররা বেদখল করতে চেয়েছিল বলে জানা যায়।
অপরদিকে, একই উপজেলায় ক্যায়াংঘাট ইউনিয়নের ভিতর-করল্যাছড়ি নামক স্থানে পাহাড়িদের
ভোগদখলীয় জায়গার ওপর তিন শতাধিক সেটলার পরিবারকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনার খবর পাওয়া
যায়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। গত ৩০ মার্চ রাতেও
সেনাবাহিনীর সদস্যসহ একদল সেটলার বাঙালি উক্ত জায়গায় প্রবেশ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এখনো পুনর্বাসনের খবর পাওয়া না গেলেও আগামীতে পুনর্বাসন করা হতে পারে বলে আশঙ্কা
করছেন সেখানকার স্থানীয় পাহাড়িরা।
নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়েছে,
গত মার্চ মাসে পাহাড়ি নারীর ওপর ৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে নিজ
বাড়ির রান্নাঘর থেকে এক নারীর রক্তাক্ত মরদেহ এবং বান্দরবানে উঁচু পাহাড়ের খাদ থেকে
মা-মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। উভয় ঘটনায় পুলিশ জড়িত কাউকে গ্রেফতার করেছে বলে জানা
যায়নি।
অপর দুটি ঘটনার মধ্যে খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়িতে এক নারীকে অপহরণের অভিযোগ পাওয়া
যায়। ঘটনায় অভিযুক্ত দু’জনকে (একজন পাহাড়ি ও আরেকজন বাঙালি) পুলিশ আটক করেছে বলে জানা
গেছে।
অপর ঘটনায় খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে এক নারী ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হন। মো. মিজান
(৩৪) নামে অভিযুক্তকে স্থানীয়রা আটক করে বিএনপি নেতার হাতে তুলে দেয় বলে জানা গেছে।
তবে এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
