চবি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে ৮ জন গ্রামবাসীকে নির্বিচারে হত্যা
ও লোগাং গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)
চবি শাখা ও মহানগর শাখার উদ্যোগে স্মরণসভা ও প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল ২০২৬)) সন্ধ্যায় চবি’র বুদ্ধিজীবী চত্ত্বরে এ
কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
স্মরণসভার শুরুতে নিহতদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা
পালন করা হয়।
পিসিপি চবি শাখার সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন চাকমা'র সঞ্চালনায় ও সভাপতি ভূবন চাকমার সভাপতিত্বে স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির
সাধারণ সম্পাদক সোহেল চাকমা।
সোহেল চাকমা বলেন, ১০ এপ্রিল ১৯৯২ সালে লোগাং গণহত্যা
পার্বত্য চট্টগ্রামে সবচেয়ে জঘন্য ও বর্বর গণহত্যা। বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকাকালীন সেনা-আনসার-ভিডিপি'র
সহায়তার সেটলারদের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল। এ ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে
দুই শতাধিক [প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা মতে ১২শ’জন) নিরীহ পাহাড়ি নারী-শিশু-বৃদ্ধ-বণিতাকে
নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং ৪ শতাধিক বাড়ি-ঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়েছিল।
কিন্তু তৎকালীন সরকারি হিসেব মতে মৃত সংখ্যা মাত্র ১৩ জন দেখানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন,
২১ এপ্রিল ১৯৯২ সালে ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাতকারে একজন প্রত্যক্ষদর্শী
বৈশিষ্ট্য মুনি চাকমার মতে, সে নিজে ১৪৭টি মৃতদেহ গুনেছে। সেসময় জাতীয় সংসদের বিরোধী
দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাও মৃতের সংখ্যা সরকারের হিসেব থেকে অনেক বেশি বলে দাবী করেছেন।
পরে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসলেও লোগাং গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধের
দাবি জানিয়ে সোহেল চাকমা বলেন, ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে রাষ্ট্রীয়
মদদপুষ্ট ঠ্যাঙারে বাহিনী রুমার পাইন্দু ইউনিয়নের জুরভারাং গ্রাম থেকে ২২ জন নিরস্ত্র
গ্রামবাসীকে অপহরণ করে। সেখান থেকে ১৫ জনকে ছেঁড়ে দিলেও পরে ৮জন গ্রামবাসীকে নির্বিচারে
হত্যা করে। শুধু তাই নয় ২০২৪ সালে বিনা অপরাধে
বম জাতিসত্তার মানুষগুলোকে কারাগারে বছরের পর বছর বন্দী করে রাখা হয়েছে। সরকারি হেফাজতে
বন্দী অবস্থায় বিনা বিচারে, বিনা চিকিৎসায়
অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু সরকার এ কাঠামোগত হত্যার দায় নেয়নি।
অবিলম্বে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যা
সমাধানের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে সোহেল চাকমা আরো বলেন, গণঅভ্যুত্থানের
মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন-শোষণ
নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের চাপিয়ে দেয়া
দমনমূলক ১১ নির্দেশনা এখনো বাতিল করা হয়নি। এই নির্দেশনার ফলে সেনাবাহিনী পাহাড়ের নিয়ন্ত্রকের
ভূমিকা পালন করছে। সমতলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কিছুটা কার্যকর থাকলেও পার্বত্য
চট্টগ্রামকে মিলিটারি কলোনি হিসেবে রাখা হয়েছে। অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে বিএনপি
নেতৃত্বাধীন সরকার যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে চায়
তাহলে পাহাড়ের সমস্যাকে জাতীয় রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তা সমাধান করতে হবে
এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে বেসামরিকীকরণ করে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপি'র
কাছে আপামর পাহাড়ি জনগণের সেটাই প্রত্যাশা।
সভাপতির বক্তব্যে ভূবন চাকমা বলেন, লোগাং গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার পর ১১ এপ্রিল
বৈ-সা-বি উদযাপন কমিটির আমন্ত্রণে ঢাকা থেকে ২৩ জন রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, লেখক, আইনজীবী,
সাংবাদিক, ছাত্রনেতা ও মানবাধিকারকর্মী পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন। পরের দিন তারা
ঘটনার সত্যটা জানার জন্য লোগাং যাত্রাপথে পানছড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করলে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে
যেতে বাধাদান করে। এ থেকে বুঝা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন কতটা ভয়াবহ অবস্থায়
বিরাজ করছে। অপারেশন উত্তরণের নামে ঘরে ঘরে সেনা তল্লাশি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যা
সরকারের দ্বিমুখী আচরণ ছাড়া কিছু নয়। একটা গণতান্ত্রিক ও বহু জাতির রাষ্ট্র নির্মাণের
জন্য পাহাড়ে সেনাশাসন ভয়াবহ প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। এটা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার।
তিনি অবিলম্বে লোগাং গণহত্যাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত ডজনের অধিক গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার এবং বম নাগরিকদের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং নিরপরাধ বম জনগোষ্ঠীর মানুষগুলোকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়ার দাবি জানান।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।


