""

বিএনপি কি শেখ হাসিনার পদাঙ্ক অনুসরণ করছে?



প্রণব চাকমা


সপ্তদশ শতাব্দীর ইংরেজ কবি জন মিল্টন তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্য Paradise Regained (১৬৭১)-এর চতুর্থ খণ্ডে লিখেছিলেন — "The childhood shows the man, as morning shows the day." সকালের সূর্য দেখে যেমন বোঝা যায় দিনটি কেমন যাবে, তেমনি একটি সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোই বলে দেয় তার শাসন কেমন হবে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বর্তমান কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় মিল্টনের সেই উক্তিটিই যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

পরিবর্তনের যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছিল, ক্ষমতার মসনদে বসে বিএনপি কি তবে সেই স্বপ্নের বিপরীত স্রোতে হাঁটতে শুরু করেছে? গত দুই মাসের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো অন্তত সেই আশঙ্কার দিকেই ইঙ্গিত করছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসের শাসনামলে দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এর মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরপরই বিএনপি এই স্কারগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে।

গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ মোট ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে নির্ধারিত সময়ে উত্থাপন না করায় সেগুলো ১২ এপ্রিলের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে।

এটিকে সরকারের গাফিলতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং মনে হচ্ছে এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছ পদ্ধতি রহিত করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে ২০০৯ সালের সেই অকার্যকর মানবাধিকার কমিশন আইনটিই আবার পুনর্বহাল হচ্ছে, যা বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

বিএনপির নির্বাচনী স্লোগান ছিল 'সবার আগে বাংলাদেশ'। তাদের ৯টি মূল প্রতিশ্রুতি ও ৫১ দফার ইশতেহারে ইনসাফভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসার পর দেখা যাচ্ছে, নিজস্ব ইশতেহারের বিরুদ্ধেই দলটি অবস্থান নিয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালনের ঘোষণা দিলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। ক্ষমতার কেন্দ্রে বসার পর সংস্কারের প্রশ্নে এই পিছুটান শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সেই চেনা ছককেই মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ক্ষমতার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য।

বিগত দেড় দশকে গুমের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিকার ছিল খোদ বিএনপি। অথচ আজ ক্ষমতায় এসে তারাই গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে অনীহা দেখাচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে গুমের সংজ্ঞা থেকে 'আটক' বিষয়টি বাদ দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি নেওয়ার যে শর্ত তারা যুক্ত করতে চাইছে, তা হুবহু শেখ হাসিনার আমলের যুক্তি।

বিচার বিভাগকে দলীয়করণের যে সংস্কৃতি হাসিনা সরকার প্রবর্তন করেছিল, বিএনপি বর্তমানে সেই পথেই হাঁটছে। বিচারপতি নিয়োগে নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠনের অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য মারাত্মক হুমকি।

একই চিত্র আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই গণপিটুনিতে পঞ্চাশ জনের কাছাকাছি মানুষের মৃত্যু প্রমাণ করে রাষ্ট্র তার প্রাথমিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। পুলিশের সংস্কার না করে একে 'জাতীয়তাবাদী পুলিশ বাহিনীতে’ রূপান্তরের চেষ্টা সেই পুরোনো দলীয়করণেরই নতুন সংস্করণ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতার পালাবদল হলেও পাহাড়ের মানুষের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের পরিবর্তে সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে সামলানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। একদিকে সামরিক শাসন, অন্যদিকে সন্তু লারমাকে অনির্বাচিতভাবে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারি পদে রেখে, বিনিময়ে তার সশস্ত্র ক্যাডারদের দিয়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত চালানোর কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। গত ১৭ এপ্রিল সন্তু লারমার সশস্ত্র ক্যাডাররা রাঙামাটির কুতুকছড়িতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা ধর্মশিং চাকমাকে নিজ বাড়িতে হত্যা করে। সন্তু লারমাকে যেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারের বিনিময়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার টেন্ডার দেয়া হয়েছে।

ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশে যে দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তারা একসময় নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি যেমন তিন জোটের রূপরেখা থেকে বিচ্যুত হয়েছিল, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশেও কি তারা সেই একই ভুল করছে?

জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের পথ চিরতরে বন্ধ করা। কিন্তু অধ্যাদেশ নিয়ে টালবাহানা এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের চেষ্টা সেই ঋণের সঙ্গে বেইমানির শামিল। বিএনপির সামনে এখনো সময় আছে নিজেদের ভুল সংশোধন করার। জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং জুলাই সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে যদি তারা সংস্কারের পথে না ফেরে, তবে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। ভোরের আলো যদি ঝোড়ো হাওয়ার সংকেত দেয়, তবে দিনের শেষে স্বস্তির আশা করা কঠিন। বিএনপি সামনে আয়নার মতো পরিষ্কার ইতিহাস রয়েছে, জেনেশুনে তারা যদি শেখ হাসিনার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে থাকে, তাহলে এর পরিণতি কী হতে পারে তা এই মুহুর্তে অন্তত ঝাপসা করে হলেও তাদের দেখতে পাওয়া উচিত।

* প্রণব চাকমা, সচেতন শিক্ষার্থী।



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments