ঢাকা প্রতিনধি, সিএইচটি নিউজ
বুধবার, ২০ মে ২০২৬
বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর গৌরবোজ্জ্বল
৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ঢাকায় আলোচনা সভা করেছে পিসিপি ঢাকা মহানগর শাখা।
আজ বুধবার (২০ মে ২০২৬) বিকাল ৪টার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
“পাহাড় ও সমতলে গণতান্ত্রিক শক্তির সংগ্রামী ঐক্য সুদৃঢ় করুন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে
ফ্যাসিস্টদের আস্তানা বানানোর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলুন” এই স্লোগানে আয়োজিত
সভায় সভাপতিত্ব করেন পিসিপি’র ঢাকা শাখার সাধারণ সম্পাদক বাহাদুর ত্রিপুরা।
একই শাখার দপ্তর সম্পাদক অংসালা মারমার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন, পিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রোনাল চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামে কেন্দ্রীয় সভাপতি জিকো ত্রিপুরা ও পিসিপির সাবেক সভাপতি অমল ত্রিপুরা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপি’র ঢাকা শাখার তথ্য প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক প্রদর্শন চাকমা।
আলোচনা সভার শুরুতে পিসিপির গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামে ৩৭ বছরের পাহাড়িদের অধিকার
আদায়ের লড়াই সংগ্রাম করতে গিয়ে মংশে, ক্যজই , তপন, এল্টন, সুনীল, বিপুল, লিটন, রূপক,
অনিমেষসহ যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সভায় পিসিপির সাবেক সভাপতি অমল ত্রিপুরা বলেন, ৮০-এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে
শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির পরিবর্তনের লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালের ২০ মে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের
জন্ম হয়েছিল। পিসিপি গঠনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জনগণের ওপর দীর্ঘদিন ধরে
চলা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, নির্যাতন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছিল।
পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ
হয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা করেছিল। ছাত্রসমাজের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে
নব্বই দশকে যে ছাত্র-গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার জেএসএসের
সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল। যদিও চুক্তিতে নানা দুর্বলতা ছিল।
অমল ত্রিপুরা আরও বলেন, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে পিসিপির নামধারী অনেক
ছাত্র সংগঠন রয়েছে। তারা অধিকারের কথা বলে ছাত্রসমাজকে বিভক্ত করেছে। চুক্তির আগেও
তৎকালীন ছাত্রনেতারা স্বায়ত্তশাসন ও চুক্তির প্রশ্নে পিসিপিকে বিভক্ত করেছিল। কিছু
ছাত্রনেতা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, আর যারা সংগ্রামী
ও আপোষহীন ছিল, তারা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করেছে। স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত
পিসিপি পরবর্তীতে ইউপিডিএফ গঠন করে এবং এখনো পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম অব্যাহত
রেখেছে।
তিনি পিসিপির দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ঐতিহ্যকে ধারণ করে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের
দাবিতে আন্দোলনরত পিসিপির পতাকাতলে সমবেত হয়ে ছাত্রসমাজের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার
আন্দোলন বেগবান করার আহ্বান জানান।
অমল ত্রিপুরা বলেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর
করে রেখেছে। পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ-বাণিজ্যের মাধ্যমে
শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পাহাড়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা
মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কাজেই শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে
পিসিপিকে আন্দোলন করতে হবে। শাসকগোষ্ঠীর সকল ধরণের ষড়যন্ত্র, অন্যায়-অবিচার ও নিপীড়নের
বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায় করতে হবে।
রোনাল চাকমা বলেন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ শুধুমাত্র একটি নিছক সংগঠন নয়। আপোষহীন
এই সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, সুশাসন ও বৈষম্যহীন
সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে লড়াই-সংগ্রাম করে যাচ্ছে। পিসিপিকে তার কর্মের মাধ্যমে বুঝতে,
বুঝতে হবে।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘অপারেশন উত্তরণ’-এর নামে সেনা দমন-পীড়ন, অভিযান
ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, আমাদের সকলকেই স্বপ্ন দেখতে হবে হবে এবং স্বপ্ন দেখার অভ্যাস করতে হবে। অধিকার প্রতিষ্ঠায় পিসিপির পতাকাতলে সমবেত হয়ে আপোষহীন লড়াইয়ে যুক্ত হওয়ার জন্য তিনি ছাত্র সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।
জিকো ত্রিপুরা বলেন, শাসকগোষ্ঠীর ভয়ের নাম হচ্ছে পিসিপি। পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের
তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে ডাক দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এই সংগঠন।
১৯৮৯ সালের ৪ঠা মে লংগদু গণহত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সে বছর ২০শে মে পিসিপির আত্মপ্রকাশ
হয়। আজ পিসিপি’র আপোষহীন গৌরবময় সংগ্রামের
৩৭ বছর পূর্ণ হয়েছে। গঠনের পরবর্তী সময় থেকে পিসিপি পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে
সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে, বর্তমানও করছে এবং আগামী দিনেরও লড়াই জারি রাখবে।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর মাধ্যমে ডজনের অধিক গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে কিন্তু কোন গণহত্যার বিচার হয়নি।
তিনি বলেন, সরকারপন্থী ও সুবিধাবাদী দালালদের ছাত্র সংগঠনগুলোর চরিত্রকে চিনতে হবে
এবং তাদের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে আওয়াজ তুলতে হবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য বলেন, সঠিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়ে নিপীড়িত জনগণের
অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে ছাত্র সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং
পূর্ণস্বায়ত্তশাসন আদায়ের লড়াইয়ে সামিল হতে হবে।
বাহাদুর ত্রিপুরা বলেন, স্ব-ভূমিকে রক্ষার জন্য হলেও ছাত্রসমাজকে রাজনৈতিক
চিন্তা করতে হবে এবং ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত হতে হবে। পার্বত্য চট্টগামে যেসব সুবিধাবাদী
ধারার ছাত্র সংগঠন রয়েছে সেগুলোতে চিনতে হবে। তারা কাদের স্বার্থে কাজ করছে সে বিষয়ে
ধারণা রাখতে হবে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার
করতে লড়াই-সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।


