""

পিসিপি’র চট্টগ্রাম মহানগর শাখার ১৬তম কাউন্সিল সম্পন্ন

অংহ্লাচিং মারমা সভাপতি, দেবাশীষ চাকমা সাধারণ সম্পাদক ও সজীব ত্রিপুরা সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত


চট্টগ্রাম প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর চট্টগ্রাম মহানগর শাখার ১৬তম কাউন্সিল সম্পন্ন হয়েছে। আজ শুক্রবার (৮ মে ২০২৬) সকাল ১০টায় নগরের সাংবাদিক সমিতি হলরুমে এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংহ্লাচিং মারমাকে সভাপতি, দেবাশীষ চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক ও সজীব ত্রিপুরা সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

জাতিগত দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজ গর্জে ওঠো, শৃঙ্খল ভাঙার চেতনায় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদে যুক্ত হও” এই আহ্বানে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ১৬তম কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক অংহ্লাচিং মারমা।

কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব পার্থ খীসার সঞ্চালনায় কাউন্সিল অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সোহেল চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সদস্য জেসী চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শুভ চাক। এতে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন ইউপিডিএফ-এর সংগঠক জিকো মারমাসহ পিসিপি, ডিওয়াইএফ, এইচডব্লিউএফের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির সদস্য দেবাশীষ চাকমা।

অধিবেশন শুরুতে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সজীব ত্রিপুরা।

এরপর পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

কাউন্সিলে ব্যবহৃত ফেস্টুনে লেখা ছিল, “এসো বন্ধু লড়াইয়ের ময়দানে, স্পর্ধা নিয়ে আওয়াজ তোলো ভূমি রক্ষার সংগ্রামে; কিসের এত ভয়? এখনই সময় জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার।”

কাউন্সিল অধিবেশনে ছাত্রনেতা সোহেল চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ প্রতিষ্ঠার পর থেকে শাসকগোষ্ঠীর নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ সময় লড়াই-সংগ্রাম জারী রেখেছে। নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষার এই লড়াইয়ে ছাত্রনেতা বিপুল, সুনীল, মিটন, রমেলসহ অসংখ্য সহযোদ্ধার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে মাতৃভূমি। কিন্তু থামেনি জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। শেষ হয়ে যায়নি নিপীড়িত-নির্যাতিত পাহাড়ি জনগণের পূর্ণস্বায়ত্তশাসন'র লক্ষ্য অর্জনের স্বপ্ন। একটি ছাত্র সংগঠন হিসেবে যেটি ত্যাগ করা ও বিলিয়ে দেয়া সবচেয়ে কঠিন ও গৌরবের তা হচ্ছে নিজ মাতৃভূমির জন্য রক্ত দেয়া, সেটি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ-এর লড়াকু যোদ্ধারা দিতে সমর্থ হয়েছে। সুতরাং পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ শাসকগোষ্ঠীর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে আজ আদর্শিকভাবেও বিজয় অর্জন করেছে।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে উদীয়মান তরুণ নেতৃত্বকে শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে হত্যা করতে চায়, কারণ তাদের উদ্দেশ্য হলো পাহাড়ে তরুণ প্রজন্মকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখা ও সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হতে না দেওয়া। সেনা-শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে নিজেদের বৈধতার প্রশ্নে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের আদর্শকে চ্যালেঞ্জিং মনে করে। সেজন্য পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবিচল যোদ্ধাদের একটা সামান্য মিছিলও সেনা-শাসকগোষ্ঠীর কাছে আজ বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সংগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশের ছাত্রসমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির সংগ্রাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ভূমি রক্ষা, নারীর সম্ভ্রম রক্ষা ও জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার সংগ্রামও জারী রেখেছে। পাহাড়ের শিক্ষার করুণ দশা, শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও জাতিগতভাবে পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের নিজেদের মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চনার অবসান ঘটাতে ২০০১ সাল থেকে শিক্ষা সংক্রান্ত পাঁচ দফা দাবি নিয়ে সংগ্ৰাম করছে। এ যৌক্তিক লড়াইয়েও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ একধাপ বিজয় অর্জন করেছে। যার ফলস্বরুপ ২০১৭ সালে তৎকালীন সরকার পাহাড়িদের ৫টি ভাষায় প্রাথমিক পর্যায়ে বই প্রদান করতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি বলেন, ৯০ দশকের ছাত্রসমাজ একত্রিত ছিল, ছাত্রসমাজের ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে সেসময় প্রতিক্রিয়াশীল, দালাল শাসকগোষ্ঠী খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছিল। ছাত্রসমাজের এই ঐক্য বিনষ্ট করতে শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ছাত্রসমাজকে বিভক্ত করে এবং ছাত্রদের সুবিধাবাদী অংশকে ভাগিয়ে নিয়ে ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে দেয়। এতে দাবার গুটি হিসেবে কাজ করেন ক্ষমতালিপ্সু সন্তু লারমা। পার্বত্য চুক্তির পর ছাত্র সমাজের একাংশ হয়ে যায় চুক্তিপন্থী। বর্তমান সময়ে ছাত্র আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে না ওঠার অন্যতম কারণ এই সুবিধাবাদী অংশটির দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়া। প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যূত্থানের মতো ছাত্র সমাজকে সামনে এসে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং সুবিধাবাদী, সুবিধাভোগী সেসব মেকি বিপ্লবীদের কাছ থেকে আমাদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। একই সাথে শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা না দিয়ে একত্রিত থেকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই জোরদার করতে হবে।

নারী নেত্রী জেসি চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারী ধর্ষণ, নির্যাতন বেড়ে চলেছে। ১৯৯৬ সালে ১২ জুন কল্পনা চাকমা নিজ বাড়ি থেকে লে. ফেরদৌস গঙ কর্তৃক অপহরণের শিকার হন। অনেকগুলো সরকার পরিবর্তন হলেও তার কোন হদিশ দিতে পারেনি। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া সোহাগী জাহান তনুর বিচার শুরু হয়েছে কিন্তু কল্পনা চাকমার চিহ্নিত অপহরণকারীরা প্রকাশ্যে আয়েশে জীবনযাপন করছে। আইনের এই পক্ষপাত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি।

তিনি বলেন, পাহাড়ে ধর্ষণের ঘটনার কোন সুষ্ঠু বিচার হয় না। বর্তমান সময়ে পাহাড়ে নারীরা নিজ বাড়িতেও নিরাপদ নয়। যুগ যুগ ধরে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, নারীদের বাদ দিয়ে কোন সংগ্রামই সফল হয়নি। তিনি নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে সামিল হতে নারী সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।

যুবনতা শুভ চাক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্তিত্ব খুব সংকটে। সরকার-শাসকগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত পাহাড়িদের ওপর খুন, গুম, অপহরণ, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করছে। পাহাড়ে প্রতিটি ঘটনার পেছনে রাষ্ট্রীয় বাহিনী প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে। গত ১৭ এপ্রিল গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ধর্মশিং চাকমাকে জেএসএস সন্তু লারমা সশস্ত্র ক্যাডাররা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে এর কোন সুষ্ঠু বিচার আমরা পাইনি।

তিনি বলেন, শাসকগোষ্ঠীর মদদে সন্তু লারমার সংঘাত জিইয়ে রাখার রাজনীতির বিরুদ্ধেও বর্তমান ছাত্র সমাজকে আওয়াজ তুলতে হবে এবং সকল বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম জারী রাখতে হবে। তিনি মা-মাটি রক্ষার সংকল্প নিয়ে ছাত্রদের লড়াই জারী রাখার আহ্বান করেন।

সভাপতির বক্তব্যে অংহ্লাচি মারমা বলেন, ১৯৮৯ সাল থেকে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ পাহাড়ি জাতিসত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল।

তিনি আরও বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ছাত্রদের নৈতিক দায়িত্ব। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের সমস্যা ও সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ছাত্রদের সক্রিয় ভূমিকা থাকা অপরিহার্য। শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের যারা লড়াই সংগ্রাম করছে তাদের টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করলেও ঐক্যবদ্ধ শক্তির কাছে পরাজিত হতে বাধ্য। তিনি পূর্ণস্বায়ত্তশাসন দাবিকে সামনে রেখে এ লক্ষ্য পূরণের সংগ্রামে ছাত্র সমাজকে একত্রিত হয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

কাউন্সিলের ২য় অধিবেশনে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে অংহ্লাচিং মারমাকে সভাপতি, দেবাশীষ চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক ও সজীব ত্রিপুরা সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন

কমিটি ঘোষণা ও নবগঠিত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সোহেল চাকমা।

এরপর নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ চাকমার উপস্থাপনায় ও সভাপতি অংহ্লাচিং মারমার সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে কাউন্সিল অধিবেশন সমাপ্ত করা হয়।



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments