নূতন কুমার চাকমা, সহসভাপতি, ইউপিডিএফ
(১)
১৯৯৭-৯৮ সলের দিকে যখন ইউপিডিএফ ও জেএসএসের মধ্যে প্রথমে দ্বন্দ্ব ও পরে
সংঘাত শুরু হয়, তখন ইউপিডিএফ ছিল দুর্বল পক্ষ, আর জেএসএস ছিল শক্তিশালী পক্ষ। সে সময়
ইউপিডিএফ জেএসএসের হামলায় প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেএসএস অভিজ্ঞতা, সংগঠন, শক্তি ও
জনসমর্থনসহ সব দিক দিয়ে ইউপিডিএফের চাইতে ছিল অনেক এগিয়ে। কিন্তু ইউপিডিএফ সঠিক নীতি
ও কৌশলের ভিত্তিতে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে শক্তি অর্জন করে।
ফলে জেএসএস আর আগের মতো ইউপিডিএফের গায়ে হাত তুলতে পারে না। হাত তোলার চেষ্টা
করলে তার যথার্থ জবাব পেয়ে যায়। অর্থাৎ সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় জেএসএস তার শক্তিশালী
অবস্থান থেকে দুর্বল অবস্থানে চলে গেছে, তারা দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ইউপিডিএফ
দুর্বল অবস্থান থেকে শক্তিশালী অবস্থানে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে জেএসএস সন্তু গ্রুপের
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া তার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব কীনা
যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
(২)
এতো গেল ইউপিডিএফ ও জেএসএসের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের বিশ্লেষণ। এখন ইউপিডিএফ ও সেনাশাসকগোষ্ঠীর মধ্যেকার দ্বন্দ্ব সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা দরকার।
ইউপিডিএফ ও সেনাশাসকগোষ্ঠী – এই দুই পক্ষের মধ্যে ইউপিডিএফ দুর্বল পক্ষ
ও সেনাশাসকগোষ্ঠী শক্তিশালী পক্ষ। এটা হলো প্রথম বাস্তবতা, যা সবাই দেখতে পায়। যেহেতু
ইউপিডিএফ দুর্বল পক্ষ, তাই শক্তিশালী পক্ষ সেনাশাসকগোষ্ঠীর আঘাতে ইউপিডিএফ প্রথমদিকে
অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সেনাশাসকগোষ্ঠী তার সকল প্রকার ক্ষমতা ব্যবহার করে কিছু
স্পাই সৃষ্টি করতে পারবে, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে কিছু কর্মীকে বাগিয়ে নিতে পারবে।
লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে কিছু দালাল ও ঠ্যাঙাড়ে সৃষ্টি করতে পারবে। শত্রুর শক্তিকে খুব
বেশী বড় করে দেখে ইউপিডিএফের কিছু নেতাকর্মী ভয়ে আন্দোলন থেকে সরে যাবে। এই অবস্থায়
ইউপিডিএফ স্বাভাবিকভাবে আত্মরক্ষাত্মক কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হবে। এটা হলো দ্বিতীয়
বাস্তবতা, যা অনেকের কাছে বোধগম্য হবে।
কিন্তু তৃতীয় বাস্তবতা হলো এত শক্তি ব্যবহারের পরও সেনাশাসকগোষ্ঠী ইউপিডিএফের
বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে সক্ষম হবে না। কারণ প্রথমত, ইউপিডিএফ জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার
আদায়ের জন্য সংগ্রাম করছে। কাজেই জনগণ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, ইউপিডিএফ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির মতো সাধারণ কোন পার্টি নয়, এই পার্টি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত মতাদর্শ দ্বারা চালিত একটি রাজনৈতিক দল, যার রয়েছে আন্দোলনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ইউপিডিএফ নেতৃত্ব প্রধান শত্রু ও গৌণ শত্রু সম্পর্কে জানে। কোথায়, কখন ও কীভাবে আঘাত করতে হবে তা জানে। সে কারণে সেনাশাসকগোষ্ঠী চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরে আঘাত হানার পরও ইউপিডিএফ টিকে আছে ও প্রতিদিন তার শক্তি বৃদ্ধি ও সংহত করতে সক্ষম হচ্ছে।
তৃতীয়ত, যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির তুলনা ও ব্যবহার নয়। যুদ্ধ হলো মূলত রাজনীতির
বিষয় এবং সে কারণে আদর্শগত বিষয়। যদি কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে জয়লাভ করা সম্ভব হতো,
তাহলে বাংলাদেশ আজও পশ্চিম পাকিস্তানীদের শাসনাধীন থাকতো, ভিয়েতনাম থেকে আমেরিকাকে
লেজ গুটিয়ে আসতে হতো না, আফগানিস্তান থেকেও সরে যেতে হতো না।
বর্তমানে চলমান ইরান-আমেরিকা যুদ্ধেও দেখা যাচ্ছে এত সামরিক শক্তি থাকার
পরও আমেরিকা তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। যুদ্ধের প্রথম দিকে ইসরায়েল-আমেরিকার
যৌথ বিমান ও ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বসহ সামরিক ও গোয়েন্দা বিভাগের
উচ্চ নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়েছে। সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালিয়ে ব্যাপক
ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক
লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
ইরান শত্রুর প্রথম দিকের হামলা সহ্য করে (Absorb করে) পাল্টা হামলা শুরু
করে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এই যুদ্ধে সামরিকভাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে জয়লাভ করা
ইরানের পক্ষে অসম্ভব, এই সত্য সবাই জানে। ইরানের দিক থেকে বিজয়ের অর্থ হলো আমেরিকা
ও ইসরায়েলের হামলার মুখেও টিকে থাকতে সক্ষম হওয়া। এই সক্ষমতা ইরান ইতিমধ্যে দেখিয়েছে।
ফলে আমেরিকা যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের সাথে আলোচনা চালাতে
বাধ্য হয়েছে।
আমেরিকার দিক থেকে বিজয়ের অর্থ হলো ইরানকে সামরিকভাবে পরাজিত করা, আত্মসমর্পনে
বাধ্য করা। কিন্তু প্রবল সামরিক হামলা চালিয়েও ইরানকে পরাজিত করা আমেরিকার পক্ষে সম্ভব
হয়নি। ইরান যুদ্ধ আজ সবার কাছে স্পষ্ট করেছে যে, কোন দেশ সামরিকভাবে যতই শক্তিশালী
হোক, তারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পূর্ব তিমোরের অভিজ্ঞতা কী? পূর্ব তিমোরীদেরকেও তাদের স্বাধীনতা অর্জনের
জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। ১৯৭০ দশকে তাদের জনসংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখের মতো।
তাদেরকে প্রথমে পর্তুগিজ ও পরে ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছে। জাপানও দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধে এই দেশটি (পূর্ব তিমোর) দখল করেছিল। ফলে পূর্ব তিমোরীদেরকে কয়েক জেনারেশন
ধরে সংগ্রাম চালাতে হয়েছিল। এজন্য তাদের জনসংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমে গিয়েছিল। প্রথমদিকে
গেরিলাদের সংখ্যা ছিল ১৫ থেকে ২০ হাজার। ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর আক্রমণে পর্যুদস্ত
হয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের সংখ্যা ২/৩ হাজারে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু তারপরও তারা হার মানেনি।
তারা জেএসএসের মতো অস্ত্র জমা দেয়নি। তারা সংগ্রাম অব্যাহত রাখে এবং ১৯৯৯ (অফিসিয়ালি
২০ মে ২০০২ সালে) সালে স্বাধীনতা অর্জন করে।
(৩)
অন্যদের আন্দোলন ও বিভিন্ন ঘটনাবলী থেকে জুম্ম জাতিগুলোকেও শিক্ষা নিতে
হবে। একটি শিক্ষা হলো মুক্তি বা অধিকার অর্জনের জন্য মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকতে হয়,
যেমন পূর্ব তিমোরীদের দিতে হয়েছে। ছোট একটি জাতি হয়েও তারা কঠোর সংগ্রাম করে স্বাধীনতা
লাভ করেছে। এজন্য তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। যে জাতি মুক্তি ও অধিকারের জন্য মূল্য
দিতে রাজী নয়, তার পক্ষে মুক্তি ও অধিকার অর্জন সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, নিপীড়ন-আক্রমণ যতই প্রবল হোক,
কখনই হার না মানা, কখনও হতাশ না হওয়া, বরং দৃঢ় চিত্তে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। পূর্ব
তিমোরীরাও বিভিন্ন দলে বিভক্ত ছিল। কিন্তু তা সত্বেও তারা সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিল।
তৃতীয় শিক্ষা হলো, শত্রু যেহেতু শক্তিশালী, তাই প্রথমদিকে আমাদের মতো দুর্বল
কিন্তু সংগ্রামী জাতি ও পার্টিকে অনেক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু তা সত্বেও
সংগ্রাম চালিয়ে গেলে এই অবস্থার পরিবর্তন হয় এবং বিজয় অর্জিত হয়।
ইউপিডিএফের ওপরও আজ শাসকগোষ্ঠী আঘাত হানছে এবং এতে পার্টির ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।
এতে কেউ কেউ হতাশা প্রকাশ করছে। ইউপিডিএফকে অবশ্যই যতদূর সম্ভব ক্ষয়ক্ষতি যাতে কম হয়,
তার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। তবে তার চাইতেও বড় কথা হলো সঠিক নীতি কৌশল
প্রয়োগ করে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। শাসকগোষ্ঠীকে আপাতভাবে যতই শক্তিশালী মনে হোক, তাদের
সেই শক্তিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জুম্ম জাতিগুলোকে এবং বর্তমান সময়ে সবচেয়ে অগ্রসর পার্টি
ইউপিডিএফকে পূর্ব তিমোরীদের মতো হার-না-মানা জাতি ও দল হয়ে গড়ে উঠতে হবে। তবেই একদিন
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশে মুক্তির লাল সূর্য হেসে উঠবে। (১৭
মে ২০২৬)
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
