""

শিক্ষায় বর্গা প্রথা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও রাজনৈতিক পেশিশক্তির মধ্যে সম্পর্ক




প্রণব চাকমা



পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালে যে গভীর কাঠামোগত বঞ্চনা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় নীরবে ডালপালা মেলছে, তা অধিকাংশ সময়ই দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে যায়। কিন্তু মাঝেমধ্যেই এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা পাহাড়ের রুগ্ন শাসনব্যবস্থার আসল চিত্রটি আমাদের সামনে নগ্ন করে দেয়। চলতি মাসে রাঙামাটির সাজেকের ছয়নালছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ঘটনা ঠিক তেমনই এক ভয়ংকর অশনিসংকেত। রিতা চাকমা নামের এক স্থানীয় প্রতিবাদী নারী তাঁর ফেসবুক আইডি (Ri Jang Ci) থেকে লাইভে এসে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ধারাবাহিক অনুপস্থিতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। বিদ্যালয়টিতে কাগজে-কলমে চারজন শিক্ষক নিয়োগপ্রাপ্ত থাকলেও, বাস্তবে উপস্থিত থাকেন মাত্র দুজন। যাঁদের মধ্যে একজন আবার 'বর্গা শিক্ষক' বা প্রক্সি। একজন সাধারণ নাগরিকের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ কোনো কাঠামোগত সমাধানের পথ তৈরি করেনি, বরং উল্টো জন্ম দিয়েছে এক নির্মম কাঠামোগত নিপীড়নের। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে করা এই সাধারণ নাগরিক প্রতিবাদের প্রতি সরকারি প্রশাসন বা ব্যবস্থাপনা কমিটির যে আইনি সাড়া দেওয়ার কথা ছিল, তা আসেনি। এর পরিবর্তে অভিযুক্ত শিক্ষিকা আশ্রয় নেন রাজনৈতিক পেশিশক্তির। গত ১৮ মে স্থানীয় কারবারীদের মাধ্যমে রিতা চাকমাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জেএসএস (সন্তু গোষ্ঠী)-এর সশস্ত্র কমান্ডারদের নেতৃত্বে তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। শুধু তা-ই নয়, প্রতিবাদী এই নারী ও তাঁর পরিবারকে গ্রাম থেকে উচ্ছেদের হুমকিও দেওয়া হয়। যখন একজন সাধারণ নাগরিকের মৌলিক শিক্ষার অধিকার আদায়ের ন্যূনতম দাবি প্রশাসনিক সুরাহার বদলে পেশিশক্তি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখোমুখি হয়, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। 

সাজেকের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন উপাখ্যান নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা 'বর্গা শিক্ষক' সংস্কৃতির একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি মাত্র। পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর (HDC) মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার পরিবর্তে লক্ষ লক্ষ টাকার ঘুষ লেনদেনের যে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেছে, এটি মূলত তারই অনিবার্য ফসল। বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে যাঁরা শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় প্রবেশ করেন, তাঁদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই পেশাগত দায়বদ্ধতা বা নৈতিকতা থাকে না। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পদায়ন হলেও তাঁরা সেখানে যান না; বরং জেলা বা উপজেলা সদরে আরামদায়ক জীবনযাপন করে, নিজেদের সরকারি বেতনের সামান্য একটি অংশ দিয়ে স্থানীয় কোনো বেকার তরুণ-তরুণীকে 'প্রক্সি' হিসেবে ক্লাসে পাঠান। প্রাতিষ্ঠানিক এই পঙ্গুত্বের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে পাহাড়ের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। 

পাহাড়ের এই মাইক্রো-লেভেলের দুর্নীতি ও অনিয়মের শেকড় আসলে প্রোথিত আছে ম্যাক্রো-লেভেলের এক দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক শূন্যতার মাঝে। আইন অনুযায়ী পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে তা ঘটছে না। যুগ যুগ ধরে পর্যায়ক্রমিক সরকারগুলো আইনের ফাঁক গলে নিজেদের দলীয় অনুগতদের দিয়ে 'অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ' গঠন করে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গত ২৮ বছর ধরে কোনো ধরনের নির্বাচন ছাড়াই একই নেতৃত্বের (সন্তু লারমা) অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদগুলো হয়ে পড়েছে শাসকগোষ্ঠীর পদলেহী দালালদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। 

এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে যখন গণতান্ত্রিক চর্চা ও জনগণের ম্যান্ডেট থাকে না, তখন সেখানে এক নিরঙ্কুশ জবাবদিহিহীনতার জন্ম হয়। শীর্ষ পর্যায়ের এই জবাবদিহিহীনতা ও অগণতান্ত্রিক চর্চা খুব সহজেই তৃণমূল পর্যন্ত সংক্রমিত হয়। সাধারণ জনগণের ভোটের ওপর নির্ভর করতে হয় না বলে স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, বর্গা শিক্ষক এবং সশস্ত্র ক্যাডাররা নিজেদের একটি শক্তিশালী, অলঙ্ঘনীয় সিন্ডিকেট হিসেবে গড়ে তোলে। ছয়নালছড়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া যে তারা ভয় ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে পুরো সমাজকে জিম্মি করে রাখতে চায়। শিক্ষিকার দুর্নীতির সুরক্ষায় যখন জেএসএস এর সশস্ত্র কমান্ডাররা লাঠিয়াল হিসেবে অবতীর্ণ হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক পেশিশক্তি কীভাবে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। 

রিতা চাকমার ওপর হওয়া শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নকে তাই নিছক কোনো স্থানীয় অপরাধ বা দুই পক্ষের বিবাদ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি মূলত একটি ক্ষয়িষ্ণু, পচনশীল শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর অনিবার্য উপসর্গ। পাহাড়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং আগামী প্রজন্মকে একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ উপহার দিতে হলে সবার আগে এই কাঠামোগত অচলাবস্থা ভাঙতে হবে। আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদগুলোতে অবিলম্বে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের মধ্যকার সুবিধাবাদী দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে পাহাড়ের এই নীরব কান্না কোনোদিনই থামবে না। কাঠামোগত পরিবর্তন না এলে রিতা চাকমারা হয়তো বারবার নিজেদের অধিকারের কথা বলবেন, কিন্তু একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক কাঠামোর অনুপস্থিতিতে সেই প্রতিবাদ কেবল পেশিশক্তির অহংকার আর বুটের তলাতেই পিষ্ট হতে থাকবে।

* প্রণব চাকমা, সচেতন শিক্ষার্থী।


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।









0/Post a Comment/Comments