""

মে মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র


ডেস্ক রিপোর্ট, সিএইচটি নিউজ

শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

ইউপিডিএফের মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেলের মাসিক মানবাধিকার রিপোর্ট “পরিবীক্ষণ”-এ গত মে মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, জেএসএস(সন্তু), ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসী ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাবলীসহ ভূমি বেদখল, ধর্মান্তরকরণ ও নারীর ওপর যৌন সহিংসতার চিত্র উঠে এসেছে। গত গত ৩ জুন ২০২৬ এই রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়।

উক্ত রিপোর্টে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় বাহিনী বিশেষত সেনাবাহিনী দায়মুক্তভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে। বেআইনী গ্রেফতার, নির্যাতন, ঘরবাড়ি তল্লাশি, হয়রানি ইত্যাদি নিত্য ˆনমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

গত মে মাসে সেনাবাহিনী কর্তৃক ইউপিডিএফ সদস্য-সহ অন্তত ৪ জন বেআইনী গ্রেফতারের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে খাগড়াছড়ির রামগড়ে সুইথোয়াই মারমা নামে এক মোটর সাইকেল চালককে গুলি করে গুরুতর আহত অবস্থায় আটক করা হয়। আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্য থেকে জনগণের প্রতিবাদের মুখে একজন মুক্তি পেলেও বাকীদের জেল হাজতে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।

আলোচ্য মাসে ২ জনকে শারীরিক নির্যাতন, ১৪টি বাড়িতে হয়রানিমূলক তল্লাশি ও ৫ ব্যক্তিকে হয়রানি-তল্লাশির অভিযোগ রয়েছে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।

এছাড়া জনমনে ভীতি সঞ্চারের লক্ষ্যে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির অন্তত ৮টি জায়গায় সেনা অপারেশন চালানো হয়েছে। ইউপিডিএফকে টার্গেট করেই এ অপারেশন চালানো হয়। অপারেশনের সময় বিদ্যালয়ে অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যেমন বিঘ্ন ঘটেছে, একইভাবে এলাকার জনগণের স্বাভাবিক চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রিপোর্টে জেএসএস (সন্তু)-এর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে বলা হয়েছে, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা পিসিজেএসএস-এর বিরুদ্ধেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনের নামে তারা খুন, অপহরণসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত রয়েছে। শুধু তাই নয়, ইউপিডিএফের নেতৃত্বে জনগণের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনেও বাধা সৃষ্টি করছে তারা।

গত মে মাসে রাঙামাটির কাউখালীতে এক শিক্ষককে অপহরণের অভিযোগ রয়েছে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে। এছাড়া সাজেকে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনিয়মের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লাইভ ভিডিও করার কারণে সন্তু গ্রুপের স্থানীয় নেতৃবৃন্দের যোগসাজশে এলাকার কার্বারিরা এক নারী কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও উদ্যোক্তাকে শারীরিকভাবে অপদস্থ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আলোচ্য মাসে জেএসএস (সন্তু)-এর সশস্ত্র সদস্যরা বাঘাইছড়ি ও পানছড়িতে ইউপিডিএফ কর্মী-সমর্থকদের ওপর দু’টি সশস্ত্র হামলা পরিচালিত করে| এছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা থেকে লক্ষ লক্ষ টাকার চাঁদাবাজি ও কাউখালী সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।

ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে মদত ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। ফলে তারা খুন, অপহরণসহ বিভিন্ন অপকর্ম সংঘটিত করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।

গত মে মাসে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ঠ্যাঙাড়ে (নব্যমুখোশ) সন্ত্রাসীরা হেগেরা চাকমা তরুণ (৪৯) নামে ইউপিডিএফের এক সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে। গত ৯ মে সংঘটিত এ হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশ কোন উদ্যোগ নেয়নি।

এছাড়া আলোচ্য মাসে রাঙামাটির নান্যাচর উপজেলার দোজর পাড়া গ্রাম থেকে শম্ভু বিকাশ চাকমা নামে এক ব্যক্তিকে অপহরণের পর হত্যার অভিযোগ রয়েছে সেনাবাহিনীর সাথে ঘনিষ্ট অপর একটি সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে। অপহরণের ৩ দিন পর নান্যাচরের বুড়িঘাট এলাকায় চেঙ্গী নদী থেকে তার হাত বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ভুক্তভোগী ব্যক্তি এলাকায় কবিরাজি (বৈদ্য) চিকিৎসা করতেন বলে জানা গেছে।

রিপোর্টে নারী-শিশুর ওপর যৌন সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী-শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা বিদ্যমান রয়েছে। গত মে মাসে রাঙামাটি ও বান্দরবানে বহিরাগত বাঙালি কর্তৃক নারী-শিশুর ওপর তিনটি যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে ১৫ মে রাঙামাটির বন্দুকভাঙায় এক প্রতিবন্ধী পাহাড়ি কিশোরীকে ধর্ষণ, ২৩ মে বিলাইছড়িতে ৯ম শ্রেণির পাহাড়ি শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের চেষ্টা ও একই দিন বান্দরবানের থানচিতে ৫ বছর বয়সী এক পাহাড়ি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। থানচিতে সংঘটিত উক্ত ঘটনায় বিচার চাইতে গেলে বিজিবি হস্তক্ষেপ ও বাধা প্রদান করলে স্থানীয় ছাত্র-জনতা ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

ভূমি বেদখল বিষয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত বাঙালি কর্তৃক পাহাড়িদের ভূমি বেদখল ও বেদখল চেষ্টার ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পাহাড়িদের উচ্ছেদ করা।

গত মে মাসে বান্দরবানের লামা উপজেলার ছিয়াছড়া পাড়া এলাকায় রাবার বাগান সৃজনের নামে স্থানীয় ম্রোদের ভোগদখলীয় জায়গা বেদখলের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। একটি কোম্পানির লোক পরিচয় দিয়ে সামমিয়া নামে এক ব্যক্তি ম্রোদের ভোগদখলীয় জায়গায় সীমানা পিলার স্থাপনের চেষ্টা করলে ম্রোরা তাতে বাধা প্রদান করে বলে জানা যায়। 

অপরদিকে, পাহাড়ি অধ্যুষিত খাগড়াছড়ির আলুটিলা পর্যটন এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পাহাড়িদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। তারা এ উদ্যোগকে জমি বেদখল ও পাহাড়ি উচ্ছেদের পরিকল্পনা হিসেবে আখ্যায়িত করে এর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিবাদ জানায়। পরে এ নিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক উক্ত স্থাপনাকে “মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স” হিসেবে দাবি করেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উক্ত স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ বন্ধের কোন ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র কর্মকাণ্ড নিয়েও রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের তৎপরতা চলে আসছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তারা সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তুলেছে। ফলে ওই এলাকায় তাদের সশস্ত্র তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। গত ২৪ মে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের রাখাইন রাজ্যের সীমান্তবর্তী ভালুকিয়া পাড়া এলাকায় মাটিতে পুঁতে রাখা স্থল মাইন বিস্ফোরণে স্থানীয় তিন তঞ্চঙ্গ্যা বাগানচাষীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠন আরসাকে দায়ি করে বলেছে, তাদের কারণে গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই এলাকায় তারা নিরাপত্তাহীনতা, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা এ মাইন পুঁতে রাখার ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।

ধর্মান্তরকরণের বিষয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানে বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার নামে দরিদ্র প্রান্তিক ম্রো জনগোষ্ঠীর শিশুদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণ করা হচ্ছে। অভিভাবকদের অজ্ঞাতে বদলে ফেলা হচ্ছে তাদের নাম। গত ৩ মে ২০২৬ সুইডেন ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম নেত্র নিউজের এক প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি সংবাদ মাধ্যমটির ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে এ ধরনের ধর্মান্তরকরণের কাজে জড়িত বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

উক্ত প্রতিবেদনে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বান্দরবানের আলীকদম, থানচি ও চিম্বুকে ধর্মান্তরিত করা ২২ জন ম্রো শিশুর সন্ধান পাওয়ার কথ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ইকরা তাহসীনুল কুরআন মাদ্রাসা, আস আদ একাডেমি, চৈক্ষ্যং এবং ১১ কিলো মডেল একাডেমি- এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নাম ও ধর্ম পরিবর্তন করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ম্রো অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

 


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments