মন্তব্য প্রতিবেদন
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তারেক
রহমান সরকারের পথচলা শুরু হয়েছে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারি
অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভের পর
তার নেতৃত্বে নতুন সরকার দেশের শাসন ক্ষমতায় আসীন হলো। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে তিনটি
সংসদীয় আসন রয়েছে, সেগুলোও লাভ করে বিএনপি। সংসদে দলটির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায়
সংবিধান সংশোধনে তার সরকার কোন বাধার সম্মুখীন হবে না।
শপথ গ্রহণের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তারেক রহমান
তার সরকারের তিনটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। এগুলো হলো: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন,
দুর্নীতি দমন ও শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেছেন, “দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি
অথবা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।”
কী ধরনের বাংলাদেশ তিনি গড়তে চান সে প্রসঙ্গে তারেক রহমান তার ভাষণে বলেন,
“মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিস্টান তথা দলমত ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ে কিংবা সমতলে
বসবাসকারী, এই দেশ আমাদের সবার। প্রতিটি নাগরিকের জন্যই এই দেশকে আমরা একটি নিরাপদ
ভূমিতে পরিণত করতে চাই। একটি স্বনির্ভর নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই
বিএনপি সরকারের লক্ষ্য।”
তারেক রহমান তার সরকারের মন্ত্রণালয় বণ্টন করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন দীপেন দেওয়ানকে। তবে একইসাথে চট্টগ্রামের মীর মোহাম্মদ
হেলাল উদ্দিনকে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যা অনেক সন্দেহ
ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে এত ছোট একটি মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী
নিয়োগ দেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা
লক্ষ্য করা গেছে।
বিএনপি দলটি পাহাড়ি কিংবা সমতলবাসী কারো কাছে অপরিচিত নয়। দলটির প্রতিষ্ঠাতা
জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০শে মে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত ৪ বছর শাসন করেছিলেন। এরপর
তার সহধর্মিনী খালেদা জিয়া দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত
ছিলেন। ১৯৯১ – ১৯৯৬ এবং ২০০১ – ২০০৬। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কয়েক দিন
পর ৩০ ডিসেম্বর তিনি প্রয়াত হন।
এরপর দীর্ঘ ১৯ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি আবার
শাসন ক্ষমতা ফিরে পেলো এবং তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচনের মাধ্যমে
বাংলাদেশ আবার সেই পুরোনো ডাইনাস্টিক শাসনে পতিত হলো, যা বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে
অন্তর্বর্তী ও সামরিক সরকার বাদ দিলে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে।
তারেক রহমান তার ভাষণে ‘পাহাড় ও সমতলের’ কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি পাহাড় ও সমতলের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বাংলাদেশকে নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক হিসেবে
গড়ে তুলতে চান। তার এই ভাষণ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। কিন্তু পাহাড় ও সমতলের
পার্থক্য যদি তার জানা না থাকে, তাহলে তার সেই ভাষণ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান
রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারবে না।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি কী? ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর হাসিনার
ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান হলেও পাহাড়ে দীর্ঘদিনের সামরিক-ফ্যাসিবাদ আজও বলবৎ রয়েছে। এখানে
গণতন্ত্রের সুবাতাস নেই, সর্বত্র অপারেশন উত্তরণের নামে চলছে অঘোষিত সেনাশাসন ও নিয়ন্ত্রণ।
শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন করেননি, তিনি এই অঞ্চলের শাসনভার চট্টগ্রামের ২৪
পদাতিক ডিভিশনের হাতেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশ্নে সেনাবাহিনীর
কথাই ছিল শেষ কথা। অথচ রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান কখনই সামরিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পাওয়া
যায় না। হাসিনা সরকারের এই ভুল নীতির কারণে ১৯৯৭ সালের “ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির” পরও
গত ২৮ বছরে পাহাড়ে শান্তি আসেনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে কতিপয় প্রাথমিক
পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী। এক, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর ওপর পূর্ণ রাজনৈতিক
কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শেখ হাসিনা নামে প্রধানমন্ত্রী হলেও তিনি কেবল সমতলের
প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, পাহাড় ছিল তার শাসনের বাইরে। তিনি সেনাবাহিনীকে পার্বত্য চট্টগ্রামে
যা খুশী তাই করতে দিয়েছিলেন, অথবা তাদের কথামত নীতি-পলিসি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।
সে কারণে তার আমলে পাহাড়ে অসংখ্য সাম্প্রদায়িক হামলা, জ্বালাও-পোড়াও, ভূমি বেদখল, পাহাড়ি
নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কথিত সন্ত্রাস দমনের নামে সশস্ত্র ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী গঠন করে
পাহাড়ে চরম অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়েছে।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও হাসিনার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তাই তার ১৮
মাসের শাসনামলেও পাহাড় বেশ কয়েকটি বড় আকারের সাম্প্রদায়িক হামলা প্রত্যক্ষ করে।
এই অশান্ত পাহাড়কে শান্ত করা দরকার, এবং সেটা করতে হলে প্রথমেই সেনাবাহিনীর
ওপর তারেক রহমান সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামেরও
প্রধানমন্ত্রী হতে হবে। হাসিনার মতো তিনি যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসনের দায়িত্ব
অন্য কোন বাহিনী বা সংস্থার হাতে ছেড়ে না দেন।
দ্বিতীয়ত, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক হিসেবে বিবেচনা করে তার
সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। অতীতে সেনাবাহিনীর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের
চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু তাতে সমস্যা আরো বেশি জটিল হয়েছে।
তৃতীয়ত, অতীতে যেসব ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেগুলো সংশোধনের জন্য প্রক্রিয়া
শুরু করতে হবে। গোড়ার ভুলটি রেখে দিয়ে কোন সমস্যাকে সমাধানের চেষ্টা করা হলে তা কখনই
সফল হবে না। বরং একটি ভুলের ওপর আরো অনেক ভুলের লেয়ার সৃষ্টি হবে মাত্র। ১৯৭০ ও ১৯৮০
দশকের শুরুর দিকে যেসব ভুল সিদ্ধান্তের ফলে পাহাড়ের সমস্যা শুরু ও জটিল হতে থাকে, সেসব
ভুল সংশোধন করার এক ঐতিহাসিক সুযোগ এখন তারেক রহমানের সরকারের সামনে হাজির হয়েছে। তিনি
যদি এই সুযোগ কাজে না লাগিয়ে আরও নতুন ভুলের জন্ম দেন, তাহলে ইতিহাস তাকেও ক্ষমা করবে
না। আর তার সেই ভুলের মাসুল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভোগ করতে হবে। কাজেই তার উচিত
সংকীর্ণ রাজনীতির উর্ধে উঠে স্টেটসম্যানসুলভ বা রাষ্ট্রনায়কোচিত দুরদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে
অতীতের ভুলকে শুধরানো। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের ওপর যুগের পর যুগ যে অন্যায় অবিচার
করা হয়েছে, তার প্রতিকার করা। বাংলাদেশে একমাত্র তিনিই এখন অতীত সংশোধনের এই দুর্লভ
সৎসাহস দেখাতে পারেন।
চতুর্থত, অতিদ্রুত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনের
ব্যবস্থা করা। জেলা পরিষদগুলো ১৯৮৯ সালের পর থেকে আর কোন নির্বাচন দেখেনি। গত ৩১ বছর
ধরে প্রত্যেকটি সরকার নিজ দলের মনোনীত লোক দিয়ে এই পরিষদগুলো চালিয়ে আসছে। ফলে সাধারণ
জনগণ নিজ প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মোট কথা, পাহাড়ে সত্যিকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করা হলে এবং অতীতের
ভুলের সংশোধনের ব্যবস্থা নেয়া হলে ধীরে ধীরে শান্তির মৃদুমন্দ হাওয়া ফিরে আসবে। তারেক
রহমানের সরকারকে এখন এই সাহসী প্রথম পদক্ষেপটিই নিতে হবে। পাহাড়ে তার শাসন কেবল আইনের
নয়, ন্যায়ভিত্তিক হতে হবে।
(২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
