[শিক্ষাবিদ এবি খীসা (অনন্ত বিহারী খীসা)-এর প্রয়াণ হয় ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে। এরপর তাঁর প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকী (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২) উপলক্ষে ‘পাইওনিয়ার’ নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। উক্ত স্মরণিকায় তাঁর গুণমুগ্ধ ছাত্র ও অনুরাগী-অনুসারীগণ তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন।
আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এবি খীসার ৫ম প্রয়াণ বার্ষিকী। এ উপলক্ষে “পাইওনিয়ার” স্মরণিকায়
তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণকৃত কয়েকজন লেখকের লেখা ধারাবাহিকভাবে এখানে প্রকাশ করা হচ্ছে-
সম্পাদকমন্ডলী]
* নীচে এডভোকেট জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা’র এবি খীসাকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি তুলে ধরা হলো:
----------------------------------------
আমার দেখা অনন্ত বিহারী খীসা
জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা*
ঠিক কবে এবং কি উপলক্ষ্যে অনন্ত বিহারী খীসার (অনন্তদা) সাথে আমার প্রথম
দেখা হয়েছে, তা এখন মনে নেই। এইটুকু ধারণা করতে পারি যে, সম্ভবত আমার শিক্ষা জীবন শেষে
(১৯৬৪) খ্রিঃ তার সাথে আমার কোথাও দেখা হয়েছে।
আমি ১৯৫৪ খ্রিঃ রাঙ্গামাটির সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণীতে বি ফাইনালে
ভর্তি হয়েছিলাম। সেই বছর যারা রাঙ্গামাটি বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়েছিলেন,
আমি তাদের সবাইকে চিনতাম। কিন্তু সেই ব্যাচে অনন্ত বিহারী খীসা নামে কেউই ছিলেন না।
অর্থাৎ তিনি ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের আগেই ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে গেছেন। তাই আমার কলেজ
এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও সম্ভবত তার সাথে দেখা হয়নি।
![]() |
| প্রয়াত অনন্ত বিহারী খীসা |
রাঙ্গামাটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় (১৯৫৪-৫৮) খ্রিঃ অনন্তদার আপন
ছোট ভাই সুরথ বিহারী খীসা এবং চাচাত ভাই ললিত বিহারী খীসাকে চিনতাম। তারা দুজনই আমার
চেয়ে এক ক্লাস উপরে পড়তেন। তাদের সাথে পরিচয়ের সূত্রে স্কুল জীবনে হয়ত অনন্তদার নাম
শুনেছিলাম। আমার যতদূর মনে আছে, অনন্তদার মুবাছড়ি গ্রামের বাসিন্দা অমরেন্দ্র লাল খীসার
(পরবর্তী জীবনে সরকারী কলেজের অধ্যাপক) বিয়েতে যোগদানের জন্য ১৯৬৭ খ্রিঃ (মাস এবং তারিখ
মনে নেই) সেখানে (মুবাছড়িতে) গিয়েছিলাম। সেই বিয়ে উপলক্ষে সেখানে অনন্তদার বাবা এবং
তার চাচাতো ভাই ললিত বিহারী খীসার বাবার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। তবে অনন্তদা সেই বিয়েতে
ছিলেন কিনা বা তার সাথে আমার দেখা এবং পরিচয় হয়েছে কিনা, তা এখন আমার মনে নেই। তখন
থেকেই আমি তার বাবা এবং চাচাকে চিনতাম।
আমি ১৯৬৪ খ্রি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমাসহ আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক বিভাগে মাষ্টার্স পাশ করার কিছু দিনের মধ্যে একটা সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী
নিয়েছিলাম। আনুমানিক ছয় মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে আমি বেকার হই। কিছু দিন
বেকার থাকার পর আবার ডিসেম্বর ১৯৬৫ খ্রি: দৈনিক সংবাদ' নামক পত্রিকায় সহ-সম্পাদক পদে
চাকুরী পাই। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার ঐ পত্রিকার Declaration বন্ধ করে দিলে পত্রিকা
বন্ধ হয়ে যায়। আমি আবার বেকার হই। পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমি রাঙ্গামাটি চলে আসি।
রাঙ্গামাটিতে চলে আসার পর আমি বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা থানার অন্তর্গত
তারাবনিয়া মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদান করেছিলাম। আমার যতদূর
মনে আছে সেই সময় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, ধবজ চাকমা এবং আরও কয়েকজন দীঘিনালা উচ্চ
বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। আমি ১৯৬৯ খ্রি: তারাবুনিয়া মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে
বর্তমান বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন রূপালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করি।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ষাট এবং সত্তরের দশকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেসব যুবক
(ছাত্র-ছাত্রী) উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, সরকারী চাকুরীর অভাবে এবং বিশেষত দেশ সেবার
আগ্রহে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান উচ্চ বিদ্যালয়সমূহে এবং নতুন উচ্চ বিদ্যালয়
স্থাপনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা এবং
নতুন উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনে ভূমিকা রাখার জন্য যারা নিজ জেলায় ফিরে গেছেন, তারা প্রায়
সবাই তাদের কলেজ জীবনে পরস্পরের সাথে পরিচিত ছিলেন। উচ্চ শিক্ষিত যুবক হিসাবে তারা
সবাই রাজনৈতিকভাবেও সচেতন ছিলেন। নিজ জাতিকে শিক্ষা দীক্ষায় উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে
যাওয়ার চেতনা রাজনৈতিক চেতনার পরিচয় বহন করে। তাই তারা জেলার বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ে
নিযুক্ত থাকলেও তাদের পরস্পরের মধ্যে একটা নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। আমি রূপালী উচ্চ বিদ্যালয়ে
প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব
ও পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সূচী ঘোষণা করা হয়।
নির্বাচনের সময়সূচী পাওয়ার পর পরই আমরা যারা উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করে খাগড়াছড়ি,
পানছড়ি, দীঘিনালা, মারিশ্যা (বর্তমান বাঘাইছড়ি উপজেলা) লংগদু, নানিয়ারচর, মানিকছড়ি
(খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত) ইত্যাদি স্কুলে শিক্ষকতা করছিলাম তারা পরস্পরের সাথে যোগাযোগ
করে যুব সমাজের পক্ষ থেকে প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিষয়ে আলোচনার তাগিদ অনুভব
করি। আমার মনে আছে যে, আমরা জেলার বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়সমূহের শিক্ষকরা খাগড়াছড়ি এবং
রাঙ্গামাটিতে বেশ কয়েকবার আলোচনা বৈঠকে মিলিত হয়েছিলাম। আমার মনে হয় তখন অনন্ত দা খাগড়াছড়ি
উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন। কারণ আমার জানামতে তিনি ১৯৫৯ খ্রি: গ্রেজুয়েশান
ডিগ্রি নিয়েছিলেন। আবার ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে খাগড়াছড়ি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়টা উচ্চ
বিদ্যালয়ে উন্নতি হয়েছে।
আমরা যারা পাহাড়ী যুব সমাজের পক্ষ থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলাম সেখানে অনন্তদার
নিশ্চয়ই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। হয়ত এমনও হয়ে থাকতে পারে যে, অনন্তদার উদ্যোগেই
আমাদের যুব সমাজের বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। কারণ অনন্তদা ছিলেন আমাদের যুব সমাজের
সিনিয়র (জ্যেষ্ঠতম) চিন্তাবিদ। যুব সমাজের এইরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অনন্তদার
একটা ভূমিকা ছিল। তাই আমার মনে হয় যে, প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার
লক্ষ্যে আয়োজিত বৈঠক সমূহের কোন না কোন একটা বৈঠকে অনন্তদার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল।
১৯৭০ খ্রিঃ এর পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের আগে থেকে আমরা
যারা শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিলাম তারা সবাই জানতাম যে, অনন্ত বিহারী খীসা এ পেশায় আমাদের
অগ্রদূত। কারণ তিনি আমাদের সবার আগে তার কলেজ (শিক্ষা) জীবন শেষ করেছেন। তাই তার সাথে
দেখা হওয়ার পর থেকেই আমি তাকে ‘দাদা’ ডাকতাম। সেই অর্থেই তিনি প্রথম পরিচয় থেকেই আমার
দাদা। তার নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছাড়া তৎকালীন (উচ্চ শিক্ষিত) যুব সমাজের রাজনৈতিক সচেতন
এবং দেশ প্রেমিক সদস্যদের কাছে ছিলেন একজন স্বীকৃত এবং অঘোষিত নেতা, যদিও তিনি পূর্ব
পাকিস্তানের কোন রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য সমর্থক ছিলেন না।
(ক) মুক্তিবাহিনীর একটা দলের পানছড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ: ৮ই ডিসেম্বর
১৯৭১ খ্রিঃ তারিখে সুবাদার খায়রুজ্জামানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি দল মাটিরাঙ্গা
হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পানছড়ি পৌঁছার সাথে সাথে দলটি স্থানীয় বাঙ্গালী বাসিন্দাদের
যোগসাজসে বর্তমান পানছড়ি উপজেলার কালানাল গ্রাম, পানছড়ি বাজার ইত্যাদি এলাকায় স্থানীয়
পাহাড়ীদের মূলত চাকমাদের বাড়ীঘরে হামলা, লুটতরাজ এবং হত্যাকান্ড চালায় এবং বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ
করে শতাধিক বাড়ী জ্বালিয়ে দেয়। মুক্তি বাহিনীর হামলায় পুরুষ, নারী, যুবক মিলে কয়েকজন
লোক নিহত হয়। সুবাদার খায়েরুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন মুক্তি বাহিনীর এই দলটি পানছড়ি থেকে
খাগড়াছড়ি চলে যায়। সেখানে গিয়ে দলটি জানতে পারে যে, মিজোদের (বাহিনী) একটি দল তাদের
দেশ মিজোরামে চলে যাওয়ার পথে তখন দীঘিনালার বোয়ালখালী বাজারের মাইনী নদীর অপর পারে
শান্তি-লক্ষীপুরে অবস্থান করছিল। মুক্তিবাহিনীর দলটি বোয়ালখালী বাজারের মাইনী নদীর
অপর পারে গিয়ে মিজোদের উপর আক্রমণ চালায়। মিজোরা পালিয়ে গেলে মুক্তি বাহিনীর দলটি স্থানীয়
শান্তি-লক্ষীপুর গ্রামবাসীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৮/১০ জনকে হত্যা করে এবং
অন্তত ২ জন আহত হয়।
(খ) ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশে প্রবেশ: এদিকে ১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ
তারিখে বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি মারিশ্যা হয়ে ভারতীয় বাহিনী যে বাংলাদেশে
প্রবেশ করে তা আমরা রাঙ্গামাটি বাসীরা সেই দিনই এ খবর জেনেছি। তারপর তারা ১৭ই ডিসেম্বর
তারিখে রাঙ্গামাটি পৌঁছে এবং এখানেই অবস্থান নেয়।
(গ) পানছড়ি ও দীঘিনালার হত্যাকান্ডের ঘটনা রাঙ্গামাটিতে জানাজানি:
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর রাঙ্গামাটি (শহর) বাসিন্দারা বিশেষত রাজনৈতিক, নেতাকর্মী, বুদ্ধিজীবী,
ছাত্র যুবক এবং ঐতিহ্যবাহী নেতৃবৃন্দ ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের কোন একদিন তৎকালীন
সুপরিচিত কৃষ্ণ মোহন খীসার (মহাজন) বাড়ীতে একটা বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকে যোগদানের
জন্য স্থানীয় বাঙ্গালী নেতাদেরও আহ্বান করা হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, খাগড়াছড়ি মহকুমার
(তৎকালীন) পাহাড়ী আদিবাসীদের জানমাল এবং সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অবিলম্বে
ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি দল খাগড়াছড়িতে পাঠাতে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ করা হবে। সেই
বৈঠকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে খাগড়াছড়ি যাওয়ার জন্য প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা (বাংলাদেশ
সরকারের উপ-সচিব হিসাবে বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), জ্ঞানদত্ত খীসা (ব্যবসায়ী) এবং আমাকে
মনোনীত করা হয়।
(ঘ) ভারতীয় বাহিনীর (তিব্বতী) খাগড়াছড়ি গমন: সভার সিদ্ধান্ত ও স্থানীয়
প্রশাসনের নির্দেশ মতে আমরা উল্লেখিত তিনজন (ব্যক্তি) ৩১, ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিঃ তারিখে
এক প্লাটুন তিব্বতী সৈন্য নিয়ে দুপুরের পর খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিই। সেদিন (রাত)
সময়ের কারণে নানিয়ারচর বাজারে এবং পরদিন খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি বাজারে এবং তৃতীয়দিন
২ জানুয়ারি, ১৯৭২ খ্রিঃ তারিখে সকালে আমরা খাগড়াছড়ি পৌঁছি। তারপর খাগড়াছড়িতে ভারতীয়
সেনা বাহিনীর একজন কর্ণেল জনৈক পুরকায়স্ত তিব্বতী বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
(ঙ) খাগড়াছড়িতে আমাদের ভূমিকা: সেদিন খাগড়াছড়ি পৌঁছার সাথে সাথে
আমরা স্থানীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় ব্যক্তি বর্গ, যথা খাগড়াছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান
শিক্ষক, অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় অন্যান্য নেতৃবৃন্দের
সাথে দেখা করি। সেদিন দুপুরে আমরা চাই হ্লা প্রু চেয়ারম্যানের বাড়ীতে খাওয়া-দাওয়া করি।
সেদিন পরে আমরা, প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা এবং আমি অনন্ত বিহারী খীসার (অনন্ত দা) বাড়ীতে
যাই। সেখান থেকে আমরা যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরার (পরবর্তীকালে সংসদ সদস্য) সাথে দেখা করার
জন্য তার বাড়ীতে যাই। সেই রাতে আমরা আবার অনন্তদার বাড়ীতে ফিরে যাই এবং তার বাড়ীতেই
খাওয়া ও রাত্রি যাপন করি।
আমার খাগড়াছড়ি সফরে সেই যাত্রায় ২ জানুয়ারি থেকে ২২ জানুয়ারী ১৯৭২ খ্রিঃতারিখ
পর্যন্ত খাগড়াছড়িতে ছিলাম। তবে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এবং আমি ১০ই জানুয়ারী থেকে
১৬ই জানুয়ারী পর্যন্ত খাগড়াছড়ির বাইরে ছিলাম। ১৮ই জানুয়ারী আমরা দুজন খাগড়াছড়ি ফিরে
আসি। ২ জানুয়ারী ১৯৭২ ইং থেকে ৯ জানুয়ারী এবং ১৮ জানুয়ারী থেকে ২২ জানুয়ারী পর্যন্ত
খাগড়াছড়ি অবস্থান কালে ৯ বার বা ৯ দিন অনন্তদার বাড়ীতে খাওয়া-দাওয়া এবং রাত্রি যাপন
করেছিলাম। তারপর ২৪ জানুয়ারী তারিখে আমি রাঙ্গামাটি ফিরে আসি। অনন্তদার চেয়ে বয়সে আমি
অনেক ছোট হলেও তিনি আমার সমসাময়িক এবং রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে সমমনা ছিলাম বলেই
সব সময় আমাকে তার বাড়ীতে সাদরে গ্রহণ করতেন।
(চ) পানছড়ি ও দীঘিনালায় মুক্তিবাহিনী কর্তৃক পাহাড়ী আদিবাসীদের হত্যা
ও তাদের বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেওয়ায় আদিবাসীদের প্রতিক্রিয়া:- আদিবাসী পাহাড়ীদের হত্যা
এবং তাদের গ্রামকে গ্রাম মুক্তিবাহিনী কর্তৃক জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাবলী স্বাধীন বাংলাদেশে
তাদের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যত নিয়ে পাহাড়ী আদিবাসীদেরকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। তাদের অস্তিত্বের
এই সংকটকে মোকাবেলা করার একটা পন্থা উদ্ভাবনের জন্য আমার খাগড়াছড়ি অবস্থান কালে তৎকালীন
আদিবাসী বুদ্ধিজীবী ও যুব সমাজ দিনকে দিন আলোচনা চালিয়ে যায়। অবশেষে তারা তাদের অস্তিত্ব
রক্ষার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সাংবিধানিক গ্যারান্টি আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে
নেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছান। ২১ জানুয়ারী, ১৯৭২ ইং তারিখে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সভায় বিশেষ
সাংবিধানিক মর্যাদাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য চার দফা দাবী সম্বলিত একটা বিশেষ শাসন
ব্যবস্থা দাবী করার সিদ্ধান্ত হয়। ১৫ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৭২ ইং তারিখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পেশ করার জন্য এই দাবী নামা প্রস্তুত করা হয়। এখানে উল্লেখ্য
যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদার বিষয়ে অনুষ্ঠিত বুদ্ধিজীবী,
রাজনৈতিক (আদিবাসী) নেতৃবৃন্দ এবং যুব সমাজের যত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এর মধ্যে অন্তত
দুই-তিনটা অনন্তদার বাড়ীতে হয়েছে এবং তিনি প্রতিটি সভায় আদিবাসীদের দাবীর পক্ষে জোরালো
যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন করেছিলেন।
(ছ) খাগড়াছড়িতে মিশন শুভেচ্ছা প্রেরণ:- ৮ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ইং তারিখে
পানছড়ির কালানালসহ কয়েকটি গ্রামে ভারত থেকে আগত মুক্তি বাহিনীর একটা দল কর্তৃক বাড়ীঘর
জ্বালানোর ঘটনায় পাহাড়ী আদিবাসীদের মন থেকে আতঙ্ক দূর হতে না হতেই খাগড়াছড়ি সদর এবং
দীঘিনালায় (উপজেলায়) পাহাড়ী আদিবাসীদের গ্রামে ব্যাপক আকারে লুটতরাজ শুরু হয়।
খাগড়াছড়ি সদর এবং দীঘিনালা থানা এলাকার এসব ডাকাতির ঘটনার খবর রাঙ্গামাটিতে
জানাজানি হলে সেই ব্যাপারে রাঙ্গামাটিতে একটি সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ডাকাতি ও লুটতরাজের
কারণ তদন্ত ও তা বন্ধ করার সুপারিশ পেশ করার জন্য ৭ (সাত) সদস্য বিশিষ্ট একটি শুভেচ্ছা
মিশন প্রেরণ করার জন্য রাঙ্গামাটিতে এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়। বর্তমান লেখক সে মিশনের
একজন সদস্য মনোনীত হন। শুভেচ্ছা মিশন ২১ মার্চ, ১৯৭২ খ্রি: তারিখে খাগড়াছড়ি রওনা হয়ে
যায়। আমি ২৩ মার্চ পর্যন্ত শুভেচ্ছা মিশনে খাগড়াছড়ি যাওয়ার আগেই আমি জানতাম যে, অনন্ত
দা কয়েকদিন আগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তখন তিনি রাঙ্গামাটি জেলে অন্তরীণ ছিলেন। তাই খাগড়াছড়িতে
তার সাথে দেখা করার কোন সুযোগ নেই। তাই সেদিন সন্ধ্যায় আমি অনন্তদার বাড়ীতে গিয়ে তার
স্ত্রী চঞ্চলা বৌদির সাথে দেখা করি। দুর্ভাগ্যবশত আমার ডাইরীতে তার প্রেপ্তার হওয়ার
দিন তারিখ লেখা নেই।
রাঙ্গামাটি ফিরে আসার পর ২৬ শে মার্চ, ১৯৭২ খ্রিঃ তারিখে আমি জেল গেইটে
অনন্তদা এবং খুলারাম চাকমার সাথে দেখা করি। এই তারিখটা ২৬ অথবা ২৭ও হতে পারে। কারণ
আমার ডাইরীতে তাদের মুক্তির তারিখ আবার ২৭ হতে পারে। কারণ দুটো তারিখও এক সাথে লেখা
আছে। আমার ডাইরী মতে অনন্তদা, খুলারাম চাকমা এবং বংশী নাথ চাকমা (আমার ভাইরা ভাই) ২৬
শে জুন তারিখেই জেল থেকে মুক্তি লাভ করেছেন। পাহাড়ী ছাত্র সমিতি তাদের মুক্তির সম্মানে
২৭শে জুন, ১৯৭২ খ্রিঃ তারিখ একটা সংবর্ধনার আয়োজন করে। একজন আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে
আমিও সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম।
(জ) অনন্তদার সাথে শেষ দেখা:- মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং এর চূড়ান্ত
পর্যায়ে তৎকালীন রামগড় মহকুমার বর্তমান মাটিরাঙ্গা উপজেলার তবলছড়ি, বড়বিল এবং আচলং
মৌজাসহ ফেনী নদীর অববাহিকা এবং আরও কয়েকটা মৌজ আদিবাসীদেরকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী আখ্যা
দিয়ে তাদের বাড়ী-ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে এবং জমি থেকে (পার্শ্ববর্তী এলাক বাঙ্গালীরা) উচ্ছেদ
এবং বিতাড়িত করে। বিতাড়িত আদিবাসীরা সবাই খাগড়াছড়ি, পানছড়ি এবং অন্যান্য এলাক অশ্রয়
গ্রহণ করে। আর তাদের পরিত্যক্ত জমিগুলো দখল করে দখলদাররা স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। স্থানীয়দের
সে সব জমিতে পুনবার্সন করার লক্ষ্যে ২১/০৯/৭৪ খ্রিঃ তারিখে রামগড় মহকুমা প্রশাসকের
সভাপতিত্বে খাগড়াছড়ি এবং রামগড় মহকুমার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের এক সভা খাগড়াছড়িতে
অনুষ্ঠিত হয়।
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসক পরামর্শদাতা হিসাবে সেই সভায় প্রধান
অতিথি ছিলেন। স্থানীয় (রাঙ্গামাটি মহকুমার) নেতৃবৃন্দের মধ্যে আমি এবং অনন্তদা (রামগড়
মহকুমার) সেই সভায় উপস্থিত ছিলাম। সভার সিদ্ধান্তক্রে "অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ কমিটি"
নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির আহবায়ক করা হয় রামগড় মহকুম প্রশাসককে। অনন্তদা
খাগড়াছড়ি মহকুমা থেকে এবং আমি রাঙ্গামাটি মহকুমা থেকে কমিটির সদস্য নির্বাচিত হই।
আমার জানা মতে, খাগড়াছড়ির ঐ সভায় সাক্ষাতের পর তার সাথে তার মৃত্যুর আগে
আমার আর দেখা হয়নি। কি আমার কাছে থাকা সরকারের কাছে পরবর্তী কালে দাখিলকৃত কিছু স্মারকলিপিতে
তাঁর নামের সাথে আমার নাম আছে। এতে ধারণা করা যায় যে, আমরা দু'জনেই হয়ত আমাদের আদিবাসীদের
কোন না কোন সমাবেশে উপস্থিত থেকেই ঐ সব স্মারক লিপিতে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেছিলাম।
অনন্তদার একটা বড় গুণ হল যে, আমরা যারা তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী ছিলাম,
তিনি তাদের সবাইকে সম চোখে দেখতেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত কোন বিষয়ে আলোচনায়
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মত বিরোধ দেখা দিলে অনেকে উত্তেজিত হতেন। কিন্তু অনন্তদা সে
ধরণের মতবিরোধে তেমন উত্তেজিত হতেন না কিংবা নিজের মতকে জোর করে অন্যের উপর চাপিয়ে
দিতে চাইতেন না।
আমরা যারা সরাসরি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী, তিনি তাদেরকে অত্যন্ত
স্নেহের চোখে দেখতেন। অনন্তদা এমন অমায়িক ছিলেন যে, পারত পক্ষে তিনি আমাদেরকেও নাম
ধরে ডাকতে চাইতেন না। তাই তিনি যেমন আমাদেরকে একান্তই আপন মনে করতেন, আমরাও তাকে সেভাবে
শ্রদ্ধার চোখে দেখতাম।
অনন্তদা সম্পর্কে আমার এই লেখা পড়ে অনেকের কাছে এটাও মনে হতে পারে যে, অনন্তদার
সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমি যেন নিজেরই গুণগান গেয়েছি। আমি আন্তরিকতার সাথে বলতে চাই যে,
অনন্তদার মত একজন জ্ঞানী গুনী মানুষের সাথে নিজেকে তুলনা করার কোন সাহস আমার নেই। আমার
বরং মনে হয়েছে যে আমার এই লেখা অনন্তদার মত একজন গুণী-জ্ঞানী এবং একজন রাজনৈতিক চিন্তাবিদ
সম্পর্কে কিছুই লিখা হয়নি। আমার এই লেখা যে একেবারেই অসম্পূর্ণ।
*এডভোকেট, জেলা জজকোর্ট, রাঙ্গামাটি।
# লেখা সৌজন্যে: ‘পাইওনিয়ার’ (অনন্ত বিহারী খীসার ১ম মৃত্যুবার্ষিকীর
স্মরণিকা)
আরও পড়ুন:
>> শিক্ষক ও অন্তরালের কারিগর এবি খীসা (১৯৩৭-২০২১)
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
