""

তনু ও কল্পনা: ন্যায়বিচার কি সবার জন্য সমান?




মাইকেল চাকমা


বাংলাদেশে ন্যায়বিচার কি সত্যিই সবার জন্য সমান- এই প্রশ্নটি নতুন নয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও তীক্ষ্ণ, আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো বারবার রাষ্ট্রকে বিব্রত করে, বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। তেমনই দুটি ঘটনা- কল্পনা চাকমার অপহরণ ও গুম (১৯৯৬) এবং সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকাণ্ড (২০১৬)।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামে অপহৃত হন কল্পনা চাকমা। তিনি শুধু একজন সাধারণ নারী ছিলেন না; ছিলেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনের এক সাহসী কণ্ঠস্বর। তাঁর অপহরণ দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশকে কঠিন প্রশ্ন ও জবাবদিহির মুখে দাঁড় করায়।

কল্পনা চাকমাকে অপহরণের সাথে বাঘাইছড়ির কজইছড়ি ক্যাম্পের তৎকালীন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তারপরও আজ পর্যন্ত তাকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়নি। অভিযোগপত্র থেকে তার নাম সুকৌশলে বাদ দেয়া হয়েছে।

বিচার প্রক্রিয়ার নামে চলে বছরের পর বছর প্রহসন- তদন্তের ধীরগতি, শুনানির অন্তহীন বিলম্ব, আর দায় এড়ানোর সংস্কৃতি। অবশেষে ২৮ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল রাঙামাটি জেলা আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়। এর মধ্য দিয়ে কোনো জবাবদিহিতা, কোনো বিচার কিংবা সত্য উদঘাটন ছাড়াই একটি গুরুতর রাষ্ট্রীয় অপরাধকে কার্যত ধামাচাপা দেয়া হয়।

অন্যদিকে, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে নির্মম ও নৃশংসভাবে খুন হন কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। এ ঘটনা মুহূর্তেই দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, শোক ও প্রতিবাদের ঢেউ সৃষ্টি করে। তনুর পরিবার মামলা দায়ের করে, ন্যায়বিচারের দাবি তোলে। সেই দাবির আওয়াজ ক্ষীণ হলেও, কখনও নিভে যায়নি। দীর্ঘসূত্রিতা ও নানা প্রশ্নের মধ্যেও তদন্ত প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। অবশেষে কয়েকদিন আগে একজন সাবেক সেনা সদস্যকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে- যা বিচার প্রাপ্তি বিষয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। বলা যায়, বিলম্বিত হলেও, তনুর জন্য ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাটি অন্তত এখনও জীবিত রয়েছে।

এখানেই প্রশ্নটি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে: কেন এই ভিন্নতা?

দুটি ঘটনায়ই ভুক্তভোগী নারী, উভয় ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তবুও বিচার প্রক্রিয়ার গতিপথ এত আলাদা কেন? একটি ঘটনায় রাষ্ট্র ন্যূনতম হলেও সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়, আর অন্যটিতে বছরের পর বছর টালবাহানার পর শেষ পর্যন্ত মামলা খারিজ হয়ে যায়।

এটি কি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো কাঠামোগত বৈষম্য রয়েছে?

পার্বত্য চট্টগ্রাম বরাবরই একটি সংগ্রামমুখর, সংবেদনশীল অঞ্চল, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ প্রায় সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কল্পনা চাকমার ঘটনা সেই বাস্তবতার এক নির্মম উদাহরণ। আইনের জটিলতা, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ এবং দীর্ঘসূত্রিতার বেড়াজালে তাঁর পরিবারের ন্যায়বিচারের আশা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, সমতলের একটি বহুল আলোচিত ঘটনায় অন্তত রাষ্ট্রকে কিছুটা হলেও জবাবদিহির পথে হাঁটতে দেখা যায়। যদিও সোহাগী জাহান তনুর হত্যার বিচার এখনও সম্পূর্ণ হয়নি, তবুও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

তাহলে কি এই দেশে বিচারপ্রক্রিয়াও ভৌগোলিক ও জাতিগত বিভাজনে আক্রান্ত?

কাগজে-কলমে আইন সবার জন্য সমান- এটি একটি বহুলকথিত মৌলিক নীতি। কিন্তু বাস্তবতা যখন বারবার ভিন্ন ছবি তুলে ধরে, তখন সেই নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন।

কল্পনা চাকমার পরিবারের জন্য প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত: তারা কি কোনোদিন বিচার পাবে? নাকি এই ঘটনা ইতিহাসের আরেকটি চাপা পড়ে যাওয়া অধ্যায় হয়ে থাকবে?

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু তার ক্ষমতা বা বলপ্রয়োগে নয়, বরং তার ন্যায়বিচারের সমতায় নিহিত। যখন সেই সমতা ভেঙে পড়ে, তখন বিচারব্যবস্থা আর ন্যায়ের প্রতীক থাকে না- তা পরিণত হয় এক নিষ্প্রাণ আনুষ্ঠানিকতায়, যেখানে কিছু মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের দুয়ার উন্মুক্ত, আর অন্যদের জন্য তা চিরতরে রুদ্ধ।

যতদিন চিহ্নিত অভিযুক্ত লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসকে গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো না হবে, ততদিন কল্পনা চাকমার অপহরণ শুধু একটি অমীমাংসিত ঘটনা হয়ে থাকবে না; এটি রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ওপর এক গভীর, বেদনাদায়ক ক্ষত হিসেবে বহমান থাকবে- একটি দগদগে স্মারক, যা প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতাকে, ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে পাহাড় ও সমতলের বৈষম্যকে সামনে নিয়ে আসবে।

তনু ও কল্পনা- দুই নাম, দুই প্রেক্ষাপট, কিন্তু প্রশ্ন একটাই:

এই দেশে ন্যায়বিচার কি সত্যিই সবার জন্য সমান?

* মাইকেল চাকমা, সংগঠক, ইউপিডিএফ



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।










0/Post a Comment/Comments