""

জান্তব হিংস্রতা: সভ্য মানুষের লজ্জা

[আগামীকাল ১০ এপ্রিল লোগাঙ গণহত্যার ৩৪ বছর পূর্ণ হবে। এ উপলক্ষে ঘটনার বিষয়ে জানার সুবিধার্থে পুরোনো কিছু লেখা এখানে পুনঃপ্রকাশ করছি- সম্পাদক]

------------------------

 

জান্তব হিংস্রতা: সভ্য মানুষের লজ্জা

- আহমদ শরীফ

১৯৯২ সনের ১০ এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার লোগাং গুচ্ছগ্রামের তিনজন পাহাড়ি যুবতী মাঠে গরু চড়াতে গেলে পার্শ্ববর্তী বাঙালি গুচ্ছগ্রাম থেকে কিছু উচ্ছৃংখল যুবক জোরপূর্বক তাদের ধর্ষণের চেষ্টা করে। পাহাড়ি যুবতীরা দা দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। এতে একজন বাঙালি আহত হয় এবং পরে রক্তকরণের ফলে মারা যায়। [বেনামা ইস্তেহার] ধর্ষণ শাস্ত্রনামা সভ্যজগতে এবং সংস্কৃতিমান মানুষের নৈতিক চেতনায় গর্হিত অমানবিক কর্ম আচরণ। জোরে জুলুমে ও জবরদস্তীতে তাদের লাঞ্ছিত করার হামলা তারা হাতের অস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ করেছে। এ জন্য সভ্য-সংস্কৃতিমান এবং শাস্ত্রমানা নীতি-নিয়মনিষ্ঠ ব্যক্তি মাত্রই নারীদের তারিফে মুখর হওয়ার কথা। কিন্তু স্থানীয় পর্ষদ সদস্য ও পর্ষদ চেয়ারম্যানের ভাই এবং শান্তি-শৃংখলা রক্ষক দুর্বল অসহায় আক্রান্ত মানুষের ভ্রাতা আনসার প্রভৃতির মধ্যে মনুষ্যত্ব ছিলো না, ছিলো না শাস্ত্র চেতনা, ছিলো না মানবিক বিবেক-বিবেচনা, ছিলো না নীতি-নিয়মে, রুচি-আইনে আনুগত্য। তারা তখন মানুষ হিসেবে নয়, কেবল মুসলিম হিসেবে, জান্তব হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো গাঁয়ে মুসলিম হত্যারূপ অবমাননার প্রতিশোধ নেবার জন্য প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যে। ফলে প্রাণ হারালো প্রায় দেড় হাজার নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, রুগ্ন নির্বিশেষে ভস্মীভুত হলো ঘরবাড়ি, অর্থ-সম্পদ, ধান-চাল, পশু-পাখি এ যেন আর এক মাইলাই !     

১৯৯২ সনের এপ্রিল মাসে সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের গ্রামরক্ষী দল, আনসার ও সরকারের অনুগত পর্ষদ সদস্যরা এ শক্তি, এ সাহস কোথায় পেলো, কেন পেলো তা এখন আর গুহায়িত নেই। সরকার এ হিংস্র পশ্চাচারকে যে সমর্থন করল, শান্তিবাহিনীর অপকর্ম বলে যে রটাল, তাতেই বোঝা গেলো সরকার পাশবশক্তির সমর্থক এবং শাসক মুসলিম গোষ্ঠীর মান-মর্যাদা রক্ষায় প্রয়াসী। সরকারী নীতি ‘দুর্বলেরে রক্ষা আর দুর্জনেরে হানা নয়, দুষ্ট-দুর্জন-দুর্বৃত্ত-দুষ্কৃতি-স্বধর্মীকে আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে পোষণ। সরকারের অনুগত সৈন্যবাহিনীও এ সরকারী নীতির বাস্তবায়নে নিষ্ঠ এবং কার্যতঃ পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী প্রতিরোধের নামে সামরিক শাসনই চলে। বেনামা ইস্তেহারে এগারো জন হত্যাকারীর নামও দেয়া হয়েছে, কিন্তু তাদের গ্রেফতারের কোনো খবর জানা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তার ও সংস্কৃতির প্রতীক, প্রতিম ও প্রতিভূস্বরূপ বার্ষিক বর্ষশেষ ও নববর্ষ উৎসব “বৈসাবি” উপলক্ষে এ বছর ঢাকার তেইশ জন রাজনীতিক, শিক্ষক, লেখক, আইনজীবি,সাংবাদিক, ছাত্রনেতা ও মানবাধিকার কর্মী আমন্ত্রিত হয়ে ওই বীভৎস ঘটনার একদিন পরে তিনদিনের সফরে খাগড়াছড়ি ১১ এপ্রিল পৌছেন, কিন্তু সেনাবাহিনী তাদের লোগাং গাঁয়ে যেতে দেয়নি সঙ্গত সরকারী নির্দেশে ও স্বার্থেই। এরাও ফিরে এসে ১৮ এপ্রিল একটি সস্বাক্ষর বিবৃতি প্রচার করেছেন।

তাদের বিবৃতির একটি অংশ এই খাগড়াছড়িতে বহুসংখ্যক প্রত্যক্ষদর্শী এবং ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। কর্তৃপক্ষীয় বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গেও এ নিয়ে আমাদের কথা হয়। এ সব কিছু থেকে আমরা এই স্পষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, লোগাং গ্রামে একটি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। গ্রাম প্রতিরক্ষা দল, আনসার বাহিনী কিছু বাঙালি দুষ্কৃতিকারীর সহযোগিতায় (লোগাং গ্রামে)। চারশ’র বেশি ঘর সেখানে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়, এবং শিশু-নারী বৃদ্ধসহ দু’শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়”।

বিবৃতিদানকারীদের প্রায় সবাই ঢাকা শহরের বিভিন্ন মহলে সুপরিচিত ব্যক্তি। বিবৃতি শেষে এরা এ সম্পর্কে ছয়টি দাবীও পেশ করেছেন, অবশ্য নীতিনিষ্ঠ সরকারের বধির কর্ণে এগুলো কখনো প্রবেশ পথ পাবে না। সরকারের চোখ-কান-মন-মত ও হাত কেবল সরকারের স্বার্থেই ব্যবহৃত হয়। এ-ই সরকারী নীতি ও নিয়ম। তাই আমরা বিবেকের তাড়নায়, নিন্দায়, ধিক্কারে আমাদের অন্তরের মানবিক ঘৃণা পরিব্যক্ত করেই বয়ান শেষ করলাম। তবে জিজ্ঞাসু ও কৌতুহলী বিবেকবান ব্যক্তির জিজ্ঞাসা ও কৌতুহল নিবারণের জন্যে ১৯৯২ সনের মার্চ মাসে Chittagong Hill Tracts Commission প্রকাশিত `Life is not Ours' : Land and Human Rights in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh' নামে প্রকাশিত শোষণ,পীড়ন, বঞ্চনা, লাঞ্ছনার তথ্য সম্বলিত An up to date of May 1991 Report পড়ে দেখতে পারেন।

[সৌজন্য : সাপ্তাহিক খবরের কাগজ ৭ মে ১৯৯২]

সূত্র: রাডার লোগাঙ গণহত্যা সংখ্যা



সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments