সাজেক (রাঙামাটি), সিএইচটি নিউজ
রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
ছাত্রনেতা রমেল চাকমাকে সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্মম হত্যাকাণ্ডের ৯ম বার্ষিকীতে
বাঘাইছড়ির সাজেকে প্রদীপ প্রজ্বলন করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ
(পিসিপি), বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখা।
আজ রবিবার (১৯ এপ্রিল ২০২৬) সন্ধ্যায় সাজেকের উজোবাজার এলাকার গঙ্গারাম
মুখ ব্রীজে শহীদ রমেল চাকমার স্মরণে এ প্রদীপ প্রজ্বলন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
প্রদীপ প্রজ্বলন শুরুতে রমেল চাকমা ও পূর্ণস্বায়ত্বশাসন লড়াইয়ে সকল শহীদের
স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
এরপর রমেল চাকমার স্মরণে প্রদীপ জ্বালানো হয়। এতে বক্তব্য দেন বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি মিশুক
চাকমা।
রমেল চাকমার হত্যার বিবরণ দিয়ে মিশুক চাকমা বলেন, সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে রাঙামাটির নান্যাচর কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও তৎকালীন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নান্যাচর থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক ছাত্রনেতা রমেল চাকমা’র মৃত্যুর ৯ বছর পূর্ণ হলো। ২০১৭ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
সেদিন ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল তারিখে পরীক্ষা না থাকায় তিনি নান্যাচর বাজারে
(সাপ্তাহিক হাট-বাজার ছিল) তরকারি ও প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গিয়েছিলেন। আনুমানিক সকাল
১০ টার দিকে বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে বাসার উদ্দেশ্যে ফেরার পথে হায়েনারূপী একদল
সেনা সদস্য তাকে আটক করে। এরপর তাঁকে বেধড়ক মারধর করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় তাদের
আস্তানা নান্যাচর সেনা জোনে। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর উপর চালানো হয়েছিল মধ্যযুগীয়
বর্বর নির্যাতন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে তাকে আঘাত করা হয়। এতে তিনি গুরুতর অসুস্থ ও
অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
এরপর সন্ধ্যার দিকে সেনারা বিনা চিকিৎসায় তাঁকে থানায় হস্তান্তর করতে
নিয়ে যায়। কিন্তু রমেল চাকমার শারীরিক অবস্থা বেগতিক দেখে থানা কর্তৃপক্ষ তাঁকে গ্রহণ
করেনি। সেনারা অসুস্থ রমেলকে নিয়ে যায় উপজেলা হাসপাতালে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তাঁর
অবস্থা দেখে ভর্তি নাখোশ করে। কারণ তাঁর অবস্থা ছিল মুমুর্ষ। এরপর সেদিন রাতেই সেনাবাহিনী
রমেলকে নিয়ে যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তাদের নজরদারি ও পুলিশের
পাহারায় গাফিলতি করে চিকিৎসা চলতে থাকে। এভাবে দুই সপ্তাহ ধরে চিকিৎসা চলার পর রমেল
চাকমার অবস্থা আরও খারাপ হয়। তিনি বলেন, নির্যাতনের ফলে রমেল চাকমার কিডনি অকেজো হয়ে
গিয়েছিলো। ফলে সর্বশেষ তাকে কিডনি চিকিৎসা করানো হয়। কিডনি রোগ বিভাগের ১৮নং ওয়ার্ডেই
১৯ এপ্রিল’ দুপুরে তিনি মারা যান।
রমেল চাকমার পিতা কান্তি চাকমা ছেলেকে আটকের পর অমানুষিক নির্যাতনের বিচার
চেয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের নিকট একটি লিখিত আবেদন জানিয়েছিলেন।
এতে তিনি তার ছেলের জীবন সংকটাবস্থার কথা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু মানবাধিকার কমিশন এ
বিষয়ে কোন প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
মিশুক চাকমা আরো বলেন, নান্যাচর সেনা জোনের তৎসময়ের জোন কমাণ্ডার বাহালুল
আলম ও রাঙামাটি রিজিয়নের জি-টু মেজর তানভীর-এর নেতৃত্বে ও তাদের নির্দেশে সেনা সদস্যরা
সেদিন রমেল চাকমাকে বেপরোয়াভাবে নির্যাতন চালিয়েছিল। তাদের বর্বর নির্যাতনের কারণেই
রমেল চাকমা’র এই অকাল মৃত্যু হয়েছে। রমেল চাকমার মৃত্যুর পরও সেনাবাহিনী ক্ষান্ত থাকেনি।
তারা শেষ পর্যন্ত রমেল চাকমার মরদেহটিও ছিনতাই করেছিলো। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনকে
রমেলের মরা মুখটিও দেখতে দেয়নি। সামাজিক রীতি-নীতি তোয়াক্কা না করে, পরিবারের সদস্যদের
উপস্থিতি ছাড়াই নিজেদের মতো করে পেট্রোল ঢেলে
পুড়িয়ে ফেলেছিল মরদেহটি। এর চেয়ে
নির্মম, নিষ্ঠুর আর কী হতে পারে?
তিনি অবিলম্বে রমেল চাকমার চিহ্নিত হত্যাকারী মেজর তানভীর ও বাহালুল আলম
গঙদের বিচার কার্যকরের দাবী জানিয়ে বলেন, রমেল চাকমা’র মৃত্যু কোন স্বাভাবিক মৃত্যু
ছিল না। সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর শরীরের নানা স্থানে
ছিল আঘাতের অসংখ্য ক্ষত চিহ্ন। সুতরাং, কালক্ষেপন না করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে রমেল
চাকমার হত্যার বিচার করতে হবে।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।



