""

আমার শিক্ষাগুরু অনন্ত বিহারী খীসা : রূপায়ণ দেওয়ান

[শিক্ষাবিদ এবি খীসা (অনন্ত বিহারী খীসা)-এর প্রয়াণ হয় ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে। এরপর তাঁর প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকী (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২) উপলক্ষে ‘পাইওনিয়ার’ নামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। উক্ত স্মরণিকায় তাঁর গুণমুগ্ধ ছাত্র ও অনুরাগী-অনুসারীগণ তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন। সেইসব স্মৃতিচারণমূলক লেখা থেকে ইতোমধ্যে ধারাবাহিকভাবে কয়েকজনের লেখা এখানে প্রকাশ করা হয়েছে। 

আজ (২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) এবি খীসার ৫ম প্রয়াণ বার্ষিকী উপলক্ষে “পাইওনিয়ার” স্মরণিকায় তাঁকে নিয়ে লেখা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য রূপায়ণ দেওয়ানের  স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি তুলে ধরা হলো- সম্পাদকমন্ডলী]

----------------------------------------


আমার শিক্ষাগুরু অনন্ত বিহারী খীসা

রূপায়ণ দেওয়ান*

খাগড়াছড়ি হাইস্কুলে অগনিত ছাত্র-ছাত্রীর মতো আমিও প্রয়াত অনন্ত বিহারী খীসার একজন গুণমৃদ্ধ ছাত্র ছিলাম। এ বি খীসা নামে তাঁর ছিল সমধিক পরিচিতি। তখন তিনি ছিলেন এই স্কুলের সহকারি প্রধান শিক্ষক। তিনি খাগড়াছড়ি হাইস্কুলে যোগদান করেন ১৯৬০ সনে। কয়েকশত বছর পুরানো চেঙ্গী উপত্যকার মুবাছড়ির জন্মজয় বাবঅ আদাম নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর জন্ম ১৯৩৭ সনের ৫ নভেম্বর। এটির বর্তমান নাম খুলারাম পাড়া। পিতামহ খুলারাম খীসার নামানুসারে তিনি এই গ্রামের নাম প্রথমে রাখেন খুলারামপুর। তাঁর পিতা সুরেন্দ্র নাথ খীসা চেগ গজা বোগল্যা গোষ্ঠীর একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। ১৯৬০ সনে কাপ্তাই বাঁধের জলে আমাদের পারিবারিক সর্বস্ব ডুবে গেলে কর্ণফুলী ভ্যালী বা বড়গাঙ কূলের বাসিন্দা হয়েও হাজার হাজার মানুষের মতো আমাদের পরিবারকেও বৃহৎ-স্থানচ্যুতি বরণ করতে হয় এবং চেঙ্গী উপত্যকার উত্তর ভাগের এই খাগড়াছড়ি এলাকার এক প্রত্যন্ত মারমা পাড়ায় আমার পিতা-মাতাকে বসতি করতে হয়। সেখানের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণি সমাপ্ত করে খাগড়াছড়ি হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলে এবি খীসার সংস্পর্শে আসার পরম সৌভাগ্য হয় আমার।

আমার পড়ালেখা চলাকালে খাগড়াছড়ি হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্রয়াত নবীন কুমার ত্রিপুরা। এই স্কুলের আরো একজন উচ্চমার্গীয় সহকারি শিক্ষক ছিলেন, নাম অশোক কুমার দেওয়ান। এর পূর্বে তিনি অবশ্য এই স্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন। মূলত এই ৩ জন জ্ঞানী শিক্ষককে ঘিরেই তৎকালীন খাগড়াছড়ি হাইস্কুল। তাঁরাই তখন ছিলেন এই স্কুলের প্রধান স্তম্ভ। এই ত্রিরত্নের সংস্পর্শে আসতে পারাটা আমার জীবনের এক পরম সৌভাগ্যের বিষয়। তাঁরা সকলেই এই এলাকারই অধিবাসী। অবশ্য, নবীন কুমার ত্রিপুরার জন্মস্থান হচ্ছে লতিবান মৌজার কুরাদিয়া ছড়া নামক গ্রামে, চেঙ্গী ভ্যালীর উত্তর প্রান্তে। তাঁর পিতা এই লতিবান মৌজার হেডম্যান ছিলেন। অশোক কুমার দেওয়ানের জন্মস্থান হচ্ছে কর্ণফুলী উপত্যকার বড়াদম মৌজায়। প্রভাবশালী ধাবেঙঅ গজা পীড়াভাঙা গোষ্ঠীর অত্যন্ত প্রভাবশালী ত্রিলোচন দেওয়ান হচ্ছেন তাঁর পিতামহ। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম প্রজন্মের রাজনীতিবিদ এবং ১৯৫৬ সনের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রয়াত কামিনী মোহন দেওয়ানের অব্যবহিত অনুজ মদন মোহন দেওয়ান হচ্ছেন তাঁর পিতা। কাপ্তাই বাঁধের কারণে তাঁর গ্রাম ও এলাকা জলমগ্ন হলে তিনিও খাগড়াছড়ি এলাকার খবংপজ্যা নামক গ্রামে বসতি করেন। তিনি পরবর্তীতে জিয়া সরকারের উদ্যোগে রাঙ্গামাটি শহরে স্থাপিত পার্বত্য চট্টগ্রামের কালচারাল ইন্সটিটিউট এর পরিচালক হন।

এবি খীসা ছিলেন মিতভাষী ও মৃদুভাষী এবং অত্যন্ত শান্ত মেজাজের একজন সাদামনের মানুষ। ছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের একজন আরাধ্য শিক্ষক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধুর সরকার জেলা গভর্নর প্রথা চালু করে এবং তাঁকে খাগড়াছড়ি জেলার সেক্রেটারী নিয়োগ দেয়া হলে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁকে সমবেত হয়ে অনুরোধ জানান, যাতে তিনি স্কুল ছেড়ে চলে না যান। কী প্রচন্ড রকমের আরাধ্য শিক্ষক ছিলেন, এই ঘটনা তাই বলে। তাই তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের আশ্বস্ত করে বলেন, যদি সেক্রেটারি পদের জন্য শিক্ষকতা ত্যাগ করতে হয়, তাহলে তিনি বাকশাল ছেড়ে দেবেন। ছাত্র-ছাত্রীদের শাসন করতে তাঁকে কোনদিন বেত্র হাতে নিতে দেখিনি বা শুনিনি। সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করেও ছিলেন অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন। সম্ভবত তাঁর রাজনীতিতে যোগদান না করার অন্যতম কারণ ছিল তাঁর ভগ্নস্বাস্থ্য। তাঁর ছিল বিভিন্ন পুস্তক, গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও পেপার কাটিং এর সংগ্রহশালা। প্রগতিশীল আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন আজীবন। ছাত্রাবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান হিল স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন বা পূর্ব পাকিস্তান পাহাড়ি ছাত্র সমিতির একজন প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে এই ছাত্র সংগঠনটি “পাহাড়ী ছাত্র সমিতি” নামে নামকরণকৃত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান আমলের শেষ প্রান্তে এবং বাংলাদেশের জন্মলাভের অব্যবহিত পরে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রলম্বিত আন্দোলনে এই সমিতির নেতৃবৃন্দ ও কর্মীবৃন্দ প্রধান ভূমিকা রাখে। ১৯৬৬ সনে তাঁর পৌরাহিতো ও সন্তু লারমার সক্রিয় ভূমিকায় তাঁর নিবাসে জন্মলাভ করে ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন', যেটি সংক্ষেপে কল্যান সমিতি নামে পরিচিত ছিল। এই সমিতির মূল সদস্য ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের হাইস্কুল ও জুনিয়র হাইস্কুলের পাহাড়ি শিক্ষকবৃন্দ। এটি ছিল আধা রাজনৈতিক সংগঠন। সরকারের দমন-পীড়ন হতে সুরক্ষিত রাখতে এটিকে লাইম লাইটে আনা হয়নি।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী হিসেবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে গ্রেফতার করা হলে রাঙ্গামাটি জেলখানায় বন্দী ছিলেন মাস দুয়েক। তাঁকে জেলখানা হতে মুক্তিদানকালে আমিও উপস্থিত ছিলাম। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর সরকার জেলা গভর্নর প্রথা চালু করলে তাঁকে খাগড়াছড়ি জেলা গভর্নরের সেক্রেটারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় এবং গভর্নর করা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের উপজাতীয় বিষয়ক উপদেষ্টা মংরাজা মমপ্রু সাইন-কে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদ সদস্য হিসেবে এম এন লারমা গণপরিষদে কী ধরণের দাবী উত্থাপন করবেন এবং তার রূপরেখা কী হবে- এ বিষয়ে মতামত বা পরামর্শ নিতে এম এন লারমা খাগড়াছড়ি সফর করেন। এই সফরে আমি ছিলাম তাঁর সহযোগী ও সফরসঙ্গী। তখন আমি পাহাড়ী ছাত্র সমিতির সাধারণ সম্পাদক। আমরা আতিথ্য গ্রহণ করি এবি খীসা ও তাঁর স্ত্রী চঞ্চলা খীসার। আমি তাঁদের উষ্ণ আতিথ্যে এক সপ্তাহ ছিলাম। মূলত বিকেল বেলায় তাঁদের বর্তমান বাসভবনের উঠানে চলতো আলোচনা। এই পরামর্শ সভায় উপস্থিত থাকতেন প্রাক্তন এমএলএ বীরেন্দ্র কিশোর রোয়াজা, শিক্ষক অশোক কুমার দেওয়ান, খাগড়াছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান বা সমাজপতি খুলারাম চাকমা ও অনন্ত বিহারী খীসা এবং আমি। এমএন লারমা ছিলেন প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন দাবীর পক্ষে। অশোক কুমার দেওয়ান ছিলেন আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে এ পরামর্শ সভায় চলতো তুমুল যুক্তি-পাল্টাযুক্তি। পরামর্শ সভায় শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন দাবীতে ঐক্যমত্য হয়। মূলত এই পরামর্শ সভায় ঐক্যমত্য হওয়া সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করেই প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে মংরাজা মমপ্রু সাইন, এমএন লারমা, কামিনী মোহন দেওয়ানসহ ১৭ জন বিশিষ্ট নেতার স্বাক্ষর সম্বলিত স্মারকলিপি ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ সনে প্রদান করা হয়। এই স্মারকলিপির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ২৪ এপ্রিল ১৯৭২ সংবিধান প্রণয়ন কমিটির নিকট এমএন লারমা মেমোরেন্ডাম এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন দাবী করেন এবং গণপরিষদে জোর দাবী উত্থাপন করে সারা দেশে পরিচিতি পান। আমি একদিকে এই পরামর্শ সভায় অংশ গ্রহণ করতাম, অপরদিকে এবি খীসার ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার পেপার কাটিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ দিয়ে আমার অবিকশিত জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করতে চেষ্টা করতাম।

এমএন লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজা-প্রজার সম্মিলনে গঠিত ঐতিহাসিক শক্তিশালী প্রতিনিধি দলের একজন হয়ে এবি খীসা ১৯৭২ সনের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় গিয়েছিলেন আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবী জানাতে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নানের বেইলি রোডস্থ' সরকারী বাসভবনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের শক্তিশালী ডেলিগেশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে আমরা দুজন ছাত্র-শিক্ষক পাশাপাশি বসেছিলাম। আরো আমার পাশে ছিলেন প্রয়াত উপেন্দ্র লাল চাকমা। জাসদের টিকেটে তিনি ২৯৯ পার্বত্য চট্টগ্রাম- ১ আসনে (বর্তমান ২৯৮ খাগড়াছড়ি) ২য় সংসদে (১৯৭৯-৮২) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ৭ম শ্রেণিতে পৌরনীতি বিষয়ে রুশ বিপ্লবের উপর আমাদের একটা পাঠ ছিল। শিক্ষক এবি খীসা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এটি পড়াতেন। পাঠের বাইরে গিয়ে তিনি রুশ বিপ্লবের ঘটনাপ্রবাহের উপর আলোকপাত করতেন। পৌরনীতির এই পাঠ ও তাঁর লেকচার হতে আমার পরিচয় হয় বলশেভিক, মেনশেভিক, ভুমা প্রভৃতি শব্দ ও এসবের মর্মার্থ এবং রুশ বিপ্লব বিষয়ে। তাঁর এই পাঠদান হতে রুশ বিপ্লব ও সমাজতন্ত্র বিষয়ে সৃষ্টি হওয়া গভীর আগ্রহ পরবর্তী জীবনে এ বিষয়ে অধিকতর গভীরে যেতে ইচ্ছা জাগায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘুণে ধরা সামন্ত সমাজের শৃঙ্খল ভাঙার পথে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে।

ছাত্র হিসেবে আমি এবি খীসার প্রিয় ছিলাম। তিনি ক্লাশে পাঠের উপর আমাকে প্রশ্ন ধরতেন- যা ছিল একটা অবধারিত বিষয়। তাঁর আঙুলটা পুরো ক্লাশ ঘুরে এসে প্রায়ই সময় আমার দিকেই নির্দেশিত হতো। তখন তিনি স্কুল লাগোয়া স্কুল-আবাসনে থাকতেন পরিবারসহ। তিনি এক সময় বেশ কয়েকদিনের জন্য ছুটিতে ছিলেন; তাঁর পরিবারসহ। তখন তাঁর পুরো বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে যান আমার উপর। তখন আমি দশম শ্রেণির সমাপ্তি পর্বের ছাত্র এবং ছিলাম স্কুল হোস্টেলের আবাসিক। এবি খীসা ছিলেন সহকর্মী বা সহকর্মী-অনুসারীদের প্রতিও অতি দায়িত্ববান। তাঁর একজন জুনিয়র মারমা সহকর্মী-শিক্ষকের প্রণয়ঘটিত সম্পর্কের পরিসমাপ্তি ঘটে তাঁরই বর্তমান আবাসে, তাঁরই প্রধান পৃষ্ঠপোষকতায়। এটি ছিল শুধুমাত্র সমমনাদের ও সীমিত পরিসরের অনুষ্ঠান। এই বিবাহের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন এবি খীসা, কালী মাধব চাকমা, সন্তু লারমা প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। এ বিবাহ অনুষ্ঠানে একমাত্র আমিই ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ ও ছাত্র। তখন কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা, বিশেষ করে একজন শিক্ষকের সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক খাগড়াছড়ি থানার ডিএসবি কর্মকর্তার আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল।

প্রলম্বিত আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লে আমার এই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সঙ্গ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পরবর্তী সময়ে তাঁর দর্শনলাভের সুযোগ আসলেও দলীয় শৃঙ্খলার কারণে বা নিশ্চিত দলীয় কোপানলের আতঙ্কে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। উল্লেখ্য, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শান্তিচুক্তি এবং জেএসএস বিরোধী রাজনীতির প্রধান নেতা হয়ে গেলে জেএসএস এবি খীসা হতে সম্পূর্ণভাবে সরে যায়। তবে ২০১০ সনের দিকে আমার এই প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হলে আমি একবার তাঁর দর্শনে যাই। তাঁর স্ত্রী উত্তম জলযোগের ব্যবস্থা করে এক ফাঁকে অতি আগ্রহ ভরে তাঁর ড্রয়িং রুমে আমাকে দেখতে আসেন এবং আত্মীয়তার একটা শব্দ উচ্ছারণ করে প্রায় ৪০ বৎসরের জমানো আন্তরিকতাভরা আগ্রহ নিয়ে আমার কুশলাদি জেনে যান। তাঁর ছোট বোন- চপলা খীসা ও ননদ- নিপুণিকা খীসা আমার স্কুল জীবনের সহপাঠী। সুদীর্ঘ বছর তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হলেও তাঁদের আন্তরিকতার ছোঁয়া আমি এখনো অনুভব করতে পারি।

বিশেষত চেঙ্গী উপত্যকার উত্তরাংশের বিপদগ্রস্থ মানুষ এবি খীসার কাছে সদপরামর্শের জন্য ছুটে যেতেন। তিনি ছিলেন বিভিন্ন জনের বিপদ-আপদের সুপরামর্শদাতা। ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন সুপরিচিত বুদ্ধিজীবী এবং স্থানীয় সরকারী প্রশাসনের কাছে একজন সন্মানিত ব্যক্তি। তিনি পার্বত্য সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিশ্বাসী ও আগ্রহী ছিলেন বিধায় সরকার ও জেএসএস এর শান্তিসংলাপ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে লিয়াজোঁ কমিটিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। সরকার ও জেএসএস এর মধ্যে দূতিয়ালীর একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন জুম্ম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। তিনি রাজনীতি সচেতন ছিলেন বিধায় তাঁর দু সন্তানও রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। একজন পূর্ণমাত্রায় রাজনীতিক এবং তিনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাজনীতির পথকেই বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অন্যজন নিজেকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেননি। তবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতির উপর একটা সৃজনশীল বই লিখে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন এবং অনেক গবেষক ও পাঠমনস্ক এবং পার্বত্য রাজনীতি-অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছেন। আমার বিশ্বাস, তিনি অবসরে গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর আরো সৃজনশীল কর্মে নিজেকে ব্যাপৃত করবেন। নিজের সন্তান জেএসএস বিরোধী রাজনীতিতে গেলেও এবি খীসা অধিকার আদায়ের স্বার্থে উভয় দলের মধ্যে অন্তত রণকৌশলগত ঐক্যের পক্ষে ছিলেন।

আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরুর প্রথম প্রয়াণ বার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রকাশিতব্য প্রকাশনায় একটা লেখা জমা দেয়ার আহবানের প্রেক্ষিতে আমার এ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন। তিনি একজন অতি উঁচু মাপের মানুষ। তাই, এ লেখাটি আমার তাঁর উপর ধৃষ্টতা প্রদর্শন হিসেবে বিবেচিত করতে তাঁর পরিবার, আত্মীয়-পরিজন ও গুণগ্রাহী সকলের কাছে সবিশেষ অনুরোধ থাকলো।

*রূপায়ণ দেওয়ান, সদস্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ।

# লেখা সৌজন্যে: ‘পাইওনিয়ার’ (অনন্ত বিহারী খীসার ১ম মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণিকা)


আরও পড়ুন:

>> শিক্ষাবিদ অনন্ত বিহারী খীসা’র ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

>> অনন্ত স্যার নিজেই একজন ‘Pioneer’ : যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা

>> আমার দেখা অনন্ত বিহারী খীসা : জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা

>> শিক্ষক ও অন্তরালের কারিগর এবি খীসা (১৯৩৭-২০২১)

 


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।







0/Post a Comment/Comments