১)
এক ভদ্রলোকের মন্তব্য দেখেছি অনেকের পোস্টে, 'বাংলাদেশের জমিনে বাংলাদেশের
মানুষকে স্যাটেলার বলার সাহস হয় কেমনে?' প্রথম আমি সেরকম গুরুত্ব দিইনি কেননা এইরকম
বালখ্যিল্য কথা আমাকে অনেকবার শুনতে হয়েছে এবং বাংলাদেশে একদল লোক আছে যারা এইরকম কথা
সবসময়ই বলতে যাবে। কেউ একজন আমাকে বললেন এই ভদ্রলোক নাকি নজরুল ইন্সটিটিউট বা সেরকম
কোন একটা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে নিযুক্ত হয়েছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার কর্তৃক।
এটাও বললেন যে তিনি নাকি কবি লেখক গীতিকার ইত্যাদি। এইগুলি শুনে তো এই ভদ্রলোকের কথাকে
গুরুত্ব দিতেই হয়।
দেখেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার যারা ওদেরকে সেটেলার বললে যদি আপনার
গোসা হয় তাইলে মেহেরবানী করে বলে দেন তাইলে ওদেরকে আমরা কি নামে সনাক্ত করবো। কেননা
পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসকল মানুষকে আমরা সেটেলার বলছি ওরা তো আসলেই সেটেলার এবং সেটেলার
হিসাবেই সরকারের নথিপত্রে ওদেরকে উল্লেখ করা হয়। তাইলে ওদেরকে সেটেলার বলবো না কেন?
আর এইসব কথা বলার আগে একটু জেনে তো নিবেন যে কেন ওদেরকে সেটেলার বলা হয়। নাকি?
আন্দাজি মন্তব্য করা তো কোন কাজের কথা না আরকি, জেনে বলতে হবে তো।
এটা সত্যি কথা যে দেশের মধ্যেই এক জেলা থেকে আরেক জেলায় গিয়ে বা এক শহর
থেকে আরেক শহরে দিয়ে যদি একজন বসবাস শুরু করে তাকে তো আপনি সেটেলার বলবেন না। ধরেন
আমার একজন চাকমা বন্ধু যদি ঢাকায় একটা এপার্টমেন্ট কিনে বসবাস করতে থাকে তাকে কি আমি
সেটেলার বলবো? না বলব না। এমনকি রাঙামাটিতে বা খাগড়াছড়িতে যেসকল বাঙালী স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়
গিয়ে বসবাস করে আসছে ওদেরকেও তো আমরা সেটেলার বলি না। যে কোন দেশের অভ্যন্তরেই কিছু
মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এক জায়গা থেকে গিয়ে আরেক জায়গায় ভাগ্য অন্বেষণ করে, বসবাস করতে
থাকে। এটা খুবই স্বাভাবিক।
(২)
কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের সেটেলাররা সেইরকম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়
গিয়ে সেখানে বসবাস করা শুরু করেনি। ওদেরকে সমতল থেকে সরকারী উদ্যোগে দল বেঁধে নিয়ে
যাওয়া হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে, সেখানে সরকার ওদেরকে জমি বরাদ্দ দিয়েছে, নগদ টাকা
দিয়েছে, সরকার ওদেরকে এখনো পর্যন্ত ফ্রি রেশন দেয়। কাজটা জিয়াউর রহমান শুরু করেছে,
পরেও চলেছে। সরকারই ওদেরকে সেখানে নিয়ে বসিয়েছে বা সেটেল করিয়েছে। এই ধরণের একটা জনগোষ্ঠী
যাদেরকে একটা পরিকল্পনার অংশ হিসাবে কৃত্রিমভাবে একটা অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে সেটেল করা হয়েছে
ওদেরকে তো ইংরেজি ভাষায় অভিধান অনুযায়ীই সেটেলার বলা হবে।
সরকারী ভাষ্যেও তাই এরাও সেটেলার। না, যারা স্বাভাবিক মাইগ্রেশনের প্রক্রিয়ায়
পাহাড়ে গিয়ে বসবাস করছে ওদেরকে তো কেউ সেটেলার বলে না। পুরনো বাঙালী বাসিন্দা যারা,
ওরা তো পাহাড়ে মিলেমিশে থাকে। আপনি হয়তো জেনে অবাক হবেন এই পুরনো বাঙালী বাসিন্দাদের
মধ্যে কেউ কেউ পাহাড়ে হেডম্যানও নিযুক্ত হয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই। আমার যতটুকু মনে
পড়ে এমনকি বাঁধের আগেও রাঙামাটি জেলায় বাঙালী হেডম্যান ছিল। অর্থাৎ, বাঙালী হলেই
কেউ সেটেলার হয় না, পাহাড়ে যাদেরকে জিয়াউর রহমান (বা পরবর্তী কোন সরকার) নিয়ে গিয়ে
সেটেল করিয়েছে ওরাই সেটেলার।
এইখানে আরও একটা কথা বলি। সেটেলারদের প্রতিও সাধারণভাবে পাহাড়িরা কখনো
খুব একটা বিদ্বেষ প্রদর্শন করেনি বা ওদেরকে ছোট করা বা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা সেসব করেনি।
তাইলে বৈরিতা যে একটা তৈরি হয়েছে- সেটা কেন হয়েছে? বৈরিতা তৈরি করেছে সেটেলাররাই। হেন
কোন উৎপাত নাই যেটা
সেটেলাররা আদিবাসীদের উপর চালায়নি। সরকার ও সরকারী বাহিনীগুলি ওদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে
আর সেটেলাররা আদিবাসীদের ভূমি দখল থেকে শুরু করে নারী নির্যাতন, গণহত্যা, মাঝে মাঝেই
ঝুথবদ্ধ হয়ে হামলা এইসব করেই যাচ্ছে। সেইসব বিস্তারিত আপনারা কিছু জানেন নিশ্চয়ই।
(৩)
সম্প্রতি যে উৎপাতটা সেটেলাররা নতুন করে শুরু করেছে সেটা
তো আপনারা দেখেছেন। খাগড়াছড়িতে একটা সেটেলার যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে সেটেলাররাই-
নিহত যুবকের স্ত্রী থানায় মামলা করে লিখিতভাবে ওদের নাম জানিয়েছে যারা ওর স্বামীকে
ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে- ওরা সকলেই বাঙালী এবং দৃশ্যত সেটেলার। এরপর এইটাকে ছুতা
করে হামলা চালিয়েছে দীঘিনালায়, খাগড়াছড়ির অন্যত এবং রাঙামাটিতে। কতজন পাহাড়ি আদিবাসী
নিহত হয়েছে এই হামলায় সেই পূর্ণ সংখ্যা এখনো জানিনা। খাগড়াছড়িতে যারা নিহত হয়েছে ওদের
বেশিরভাগই মারা গেছে গুলিতে। কে গুলি করেছে সেটা আপনিই বলুন।
এই যে ঘটনাগুলি ঘটলো খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটিতে সেটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা
বললে ভুল করবেন। আর যারা বলে যে বাইরের কেউ এইসব ঘটাচ্ছে ওরা তো বাজে কথা বলছেন আরকি।
আমি তো দেখতে পাচ্ছি পুরো ঘটনাটা ঘটানো হয়েছে পরিকল্পনা করে। পাহাড়ে সেটেলারদের অধিকার
পরিষদ ইত্যাদি নামে সংগঠন আছে, সেইসবও সংগঠনের নেতাদেরকে দেখা গেছে ঢাকায় জুলাই আগস্টের
আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলির নেতাদের সাথে। খুঁজলে আপনি ঐসব ছবি পাবেন
এখনো। আমার অনুমান হচ্ছে সেই আন্দোলনের যে মুল ডিজাইন, সেই ডিজাইনের অংশ এটাও ছিল।
সময় গেলে আরও বিস্তারিত জানতে পারবো নিশ্চয়ই।
আরেকটা কথা এখানেই বলে রাখি, পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রিয়াশীল কোন রাজনৈতিক
দলই পার্বত্য জেলাগুলির স্বাধীনতা বা বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া সেরকম কিছুই চায়
না। যারা বলছেন যে পাহাড়িরা আলাদা হয়ে যেতে চায়, এটা মিথ্যা কথা। এটা নিয়ে পরে লিখব।
* লেখাটি ইমতিয়াজ মাহমুদ-এর ফেসবুক থেকে সংগৃহিত।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।