""

ধর্ষণের শাস্তি ৪০ হাজার টাকা জরিমানা, নেপথ্যের কারণ কী?

ধর্ষণে অভিযুক্ত মো. জামাল হোসেন গলায় জুতার মালা পরিয়ে পাড়া ঘোরানো হয়।


বান্দরবান, সিএইচটি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫

বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার খামতাং পাড়া এলাকায় মো. জামাল হোসেন নামে এক ব্যক্তি কর্তৃক মানসিক প্রতিবন্ধী এক খেয়াং কিশোরীকে (১৬) ধর্ষণের ঘটনায় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা ও গলায় জুতার মালা পরিয়ে সাত বার পাড়ায় ঘোরানোর মাধ্যমে সামাজিকভাবে ধর্ষকের বিচার সম্পন্ন করার অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে মামলা ও বিচার না হওয়ায় নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

মঙ্গলবার (১১ মার্চ) খামতাং পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে পাড়ার কারবারীসহ অন্যান্য বাসিন্দারা সামাজিকভাবে এ বিচার কাজ সম্পাদনের লিখিত একটি কাগজে (যার শিরোনাম ‘আপোষনামা পত্র’) ৮ জন গণ্যমান্য ব্যক্তির স্বাক্ষর রয়েছে।

অভিযুক্ত জামাল হোসেনের পিতা নাম মো. নজরুল ইসলাম। তার বাড়ি বরিশালের দশমিনা উপজেলার দক্ষিণ দাশপাড়া গ্রামে। সে রোয়াংছড়ি-রুমা সড়ক নির্মাণের কাজে নিয়োজিত শ্রমিক বলে জানা গেছে।  

বিচার কাজ সম্পাদনের ওই কাগজে লেখা হয়, ‍“...আসামি জামাল খামতাং পাড়া গ্রামে জনসম্মুখে একজন প্রতিবন্ধী মহিলাকে ধর্ষণ করার অপচেষ্টা করার কারণ বশত: আসামী মো. জামালকে জাতীয় রীতি নীতি বিধানের মত ৪০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য্য করা হয়। সাথে তাকে জুতার মামলা গলায় পরিহিত করে  অত্র গ্রামে সাত পাকে ঘুরানোর শাস্তি প্রদান করা হইল। উক্ত বিষয়ের আলোকে শাস্তি ভোগ করিলে উল্লেখিত ধর্ষণের মামলা এলাকাবাসী ও ধর্ষিত মহিলার আত্মীয় স্বজন এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ আপিলি করিব না।”

ধর্ষণের ঘটনায় সামাজিক বিচার সংক্রান্ত কাগজ। সংগৃহিত

তবে এই বিচারের নেপথ্যের কারণ হিসেবে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় খামতাং পাড়া সেনা ক্যাম্পের কমাণ্ডার মেজর সরোয়ার ধর্ষককে রক্ষায় গ্রামবাসীদের এ ধরনের সামাজিক বিচার করতে প্রভাবিত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের তথ্য মতে জানা গেছে, খামতাং ক্যাম্পের মেজর সরোয়ার  গ্রামের কারবারিকে সামাজিক রীতিনীতি ও অর্থদণ্ডের মাধ্যমে ঘটনাটি মীমাংসা করে দেয়ার জন্য চাপ দেন।  মেজরের কথা মত গ্রামবাসীরা বিচার সভা করে  ২ লক্ষ টাকা জরিমানা ধার্য্য করার সিদ্ধান্ত নেন।  কিন্তু মেজর আবারো এই অর্থদণ্ড শিথিল করার জন্য বলেন। তাঁর কথা মত গ্রামবাসীরা জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এতেও মেজর সরোয়ার আপত্তি জানালে  শেষ পার্যয়ে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করে বিচার কার্য সম্পাদন করা হয়। সেই ৪০ হাজার টাকা জরিমানাও নাকি নগদ প্রদান করা হয়নি।

এমতাবস্থায় ভুক্তভোগী মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা আর মামলা করতে পারেনি।  

তবে পুলিশ অভিযুক্ত জামাল হোসেনকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করেছে বলে জানা গেছে।

এদিকে গতকাল (বুধবার) বান্দরবান জেলা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ধর্ষকদের কঠোর শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করা হয়েছে।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ‘ধর্ষকের কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই। ধর্ষণের মূল্য ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা আইনের পরিপন্থি। এই ধরনের সামাজিক বিচারের নামে মীমাংসা চুক্তি দেশের আইনের অবমাননা। আমরা দ্রুত অভিযুক্ত ও বিচার কমিটির সদস্যদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’

তারা বলেন, ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে সামাজিক বিচারের নামে যে মীমাংসার প্রচেষ্টা চলছে, তা অনৈতিক ও বেআইনি।

উল্লেখ্য, গত ১০ মার্চ রোয়াংছড়ি উপজেলার খামতাং পাড়া এলাকায় রাস্তার কাজে নিয়োজিত শ্রমিক জামাল হোসেন মানসিক প্রতিবন্ধী এক খেয়াং কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। এ ঘটনার পরদিন (১১ মার্চ) অপরাপর শ্রমিকরা অভিযুক্ত জামালকে ধরে পাড়াবাসীদের নিকট তুলে দেয়ার পর উক্ত সামাজিক বিচারের ঘটনাটি ঘটে।


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।








Post a Comment